“কাকে বলছিলেন?”
“জানি না। … নাম বলেননি।”
“উনি কি অসুস্থ বোধ করছিলেন তখন?”
“খানিকটা তাই। মেজোবাবুর পকেটে, ড্রয়ারে সবসময় ওষুধ থাকে। এই মাথা ধরছে, এই অ্যাসিডিটি হচ্ছে। যখন-তখন ওষুধ খান।”
“আপনি ওঁকে ওষুধ খেতে দেখলেন?”
“হ্যাঁ। একটা ওষুধ আবার ফুরিয়ে গিয়েছিল। আনতে দেওয়া হল।”
“তারপর?”
“আমি মেজোবাবুকে বাড়ি যেতে বললাম। শরীর খারাপ লাগছে, অযথা . বসে থেকে কী লাভ!”
“উনি চলে গেলেন?”
“ওষুধটা এল। উনি একটা ট্যাবলেট খেলেন। তারপরও বসে থাকলেন খানিকক্ষণ। শেষে আমি জোরাজুরি করতে উঠে পড়লেন। চলে গেলেন।”
“কিসে?”
“ভ্যানগাড়িতে। আমাদের কোম্পানির একটা ভ্যানগাড়ি আছে। ডেলিভারির কাজে লাগে। ওই গাড়িতেই মেজোবাবু চলে গেলেন।”
“আপনার তো নিজের গাড়ি আছে। মেজোবাবুকে পৌঁছে দিতে গেলেন না কেন?”
“যেতে চেয়েছিলাম। উনি কিছুতেই রাজি হলেন না। জেদি মানুষ। বললেন, ব্র্যান্ড রোডের দোকান হয়ে বাড়ি যাবেন।”
কিকিরা সামান্য চুপ করে থাকলেন। চা শেষ হয়েছে। তারাপদও শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা রেখে দিল।
আরও খানিকটা অপেক্ষা করার পর কিকিরা বললেন, “ধরণীবাবু কি বাসে, ট্যাক্সিতে কারখানায় আসতেন?”
“না, বর্ধনবাবুর গাড়িতে। দু-পাঁচদিন বর্ধনবাবুর গাড়ি আমরা পাচ্ছিলাম। গাড়ির কাজ হচ্ছিল বলে অন্য গাড়ি ভাড়া নিতাম।”
“কার গাড়ি?”
“এক হিন্দুস্থানির।”
“চেনেন তাকে?”
“না, মুখে চিনি, এদিকেই ভাড়া খাটে। সেদিন তখন গাড়িটা ছিল না।”
কিকিরা এবার ওঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। উঠতে উঠতে বললেন, “মেজোবাবুর খবর আপনি কখন পান?”
“সন্ধেবেলায়।”
“তাঁর বাড়ি গিয়ে কী দেখেন?”
“মেজোবাবু মারা গিয়েছেন।”
কিকিরা হঠাৎ চুপ করে গেলেন। পরে বললেন, “আজ চলি মহিমবাবু। … কাল-পরশু একবার আসুন না আমার কাছে।”
“যাব। আমি মশাই বড় নাভার্স হয়ে পড়েছি।”
“অকারণ নার্ভাস হচ্ছেন কেন! দেখুন না, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। … ভাল কথা, কাগজে আমিও একটা বিজ্ঞাপন ছাপছি। আপনার নামে নয়। তবে ব্যাপারটা আপনাদের।”
মহিমচন্দ্র যেন আঁতকে উঠলেন। “আবার বিজ্ঞাপন!”
কিকিরা হেসে বললেন, “উপায় কী! কাঁটা দিয়ে কাঁটা ভোলা বলে একটা কথা আছে না! এ হল সেই প্রসেস।”
তারাপদও উঠে পড়েছিল।
কিকিরারা ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন।
মহিমচন্দ্র বললেন, “একটু পরে আমিও তো উঠব। একসঙ্গেই যাওয়া যেত আমার গাড়িতে।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। হেসে বললেন, “আজ নয় স্যার, অন্য একদিন যাব। আজ একটু কাজ আছে।”
.
কারখানার বাইরে এসে কিকিরা বললেন, “কী হে, সমাচার কী?”
তারাপদ বলল, “খুব বেশি কিছু জোগাড় করতে পারলাম না। তবে দুটো জবর খবর পেয়েছি।”
“যেমন?”
“এই কারখানায় শেখরের দু-তিনজন ইয়ার দোস্ত আছে।”
“কে-কে?”
“একজন ড্রাইভার। ছোকরা। ভাল নাম জটিলেশ্বর। জটা বলে ডাকে সবাই। জটার বাড়ি বউবাজার।”
“অন্য দুজন?”
“কালী ঘটক। সে কারখানায় কাজ করে। থাকে বড়বাজারে।”
“তিন নম্বর?”
“ফণীশ্বর। ফণী বলে ডাকে লোকে। সে কিছুই করে না। নামে ইনচার্জ।”
কিকিরা বললেন, “এদের সঙ্গে শেখরের মেলামেশা হল কবে?”
“শেখর যখন এখানে কাজ করতে এসেছিল, তখন।”
কিকিরার মনে পড়ল, একসময় ধরণীমোহন তাঁর ছোট ভাগ্নেকে রঙ কারখানায় নিয়ে এসেছিলেন কাজকর্ম শেখার জন্য। কিন্তু সে কিছুই শেখেনি, শিখতে চায়নি। টাকা চুরি করে পালিয়ে গিয়েছিল।
তারাপদ বলল, “স্যার, একটা জিনিস লক্ষ করলাম। এই কারখানায় শেখরের দু-একজন হেভি সাপোর্টার আছে। মেজোবাবুর অ্যান্টি পার্টি। স্পষ্ট করে কিছু না বললেও বোঝা যায় তারা ধরণীবাবুর ওপর খুশি ছিল না।”
“কেন?”
“মেজোবাবু কড়া লোক ছিলেন। কাজের গোলমাল দেখলে গালমন্দ করতেন। চুরিচামারি ধরতে পারলে চোরের বারোটা বেজে যেত।”
“এরকম চোর কে?”
“একজনের কথা তো শুনলাম, জটা। জটিলেশ্বর।”
“তার কোনো শাস্তি হয়েছিল?”
“চাকরি চলে যাচ্ছিল, অনেক কষ্টে হাতেপায়ে ধরে চাকরিটা বজায় রেখেছে।”
“মহিমচন্দ্র সম্পর্কে কী শুনলে?”
“কাজকর্মে পাকা নয়, তবে মানিয়ে নেন সকলের সঙ্গে।”
কিকিরা অনেকটা হেঁটে এসেছিলেন। একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলেন রাস্তার মোড়ে। ট্যাক্সিটা ধরতে বললেন তারাপদকে।
ট্যাক্সিতে উঠে কিকিরা বললেন, “কলকাতা। ধর্মতলা।”
ট্যাক্সি চলতে শুরু করল।
একটা সিগারেট চাইলেন কিকিরা।
তারাপদ সিগারেট দিল।
সিগারেট ধরিয়ে কিকিরা বললেন, “তারা, শেখরকে আমাদের পাওয়া চাই।”
“কেমন করে?”
“চেষ্টা করলে একটা লোককে ধরতে পারব না, তা কী হয়! নিশ্চয়ই পারব। তুমি যাদের কথা বললে তারা কেউ-না-কেউ শেখরের খোঁজ দিতে পারে। কিন্তু এখন আমি সে-পথে যাব না। অন্য পথে তাকে টোপ গেলাব।”
“কেমন টোপ?”
“সম্পত্তির টোপ!”
“সম্পত্তির টোপ! কোথায় পাবেন সম্পত্তি?”
“সম্পত্তি পাব না। কিন্তু ডাক্তার মুখার্জিকে যেভাবে বাগিয়েছিলাম, শেখরকেও সেইভাবে বাগাতে চাই। দেখি কাজ হয় কি না!”
তারাপদ ভরসা পেল না, তবু বলল, “দেখুন!”
.
০৬.
মহিমচন্দ্র যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। রায়মশাই এ কী পাগলামি করেছেন। বললেন, “এ আবার কী করেছেন?”
কিকিরার ঘরে সন্ধেবেলায় চারজনই বসে আছেন : কিকিরা, মহিমচন্দ্র, তারাপদ আর চন্দন। চন্দনকে আজই প্রথম দেখলেন মহিমচন্দ্র।
