“প্রথমটায় ঝঞ্ঝাট নেই, স্যার, দ্বিতীয়টায় আছে।”
“থাকবে না।”
“থাকবে না! কেমন করে?”
“একটা মতলব ভাবছি। নট ইয়েট ফাইনাল। পরে বলব!”
চন্দন ঠাট্টা করে বলল, “স্যার, আপনার খেলার এখন কোন্ রাউন্ড চলছে? সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন তো! তারপর না ফাইনাল!” বলে হাসতে লাগল।
.
০৫.
রাহা ব্রাদার্সের রঙ কারখানা ছোটই। তবে তুচ্ছ করার মতন নয়। এখানে চায়না ব্ল্যাক, প্রিমিয়ার, সাদা রঙচলতি কথায় যা বলা হয় সবই তৈরি হয়। সাদা, সবুজ, লাল, কালো–এই সব রঙ তৈরি হয় আর প্যাকিং হয়ে যায়। কারখানা ছোট হলেও একটা শৃঙ্খলতা আছে। কর্মচারী বেশি নেই।
রঙের কিছুই বোঝেন না কিকিরা। তারাপদ নয়। তবু বিকেলে কারখানাটা একবার দেখে কিকিরা মহিমচন্দ্রের ঘরে এলেন। তারাপদ থাকল বাইরে। কিকিরা বলেছেন, কর্মচারীদের সঙ্গে ভাবসাব জমিয়ে যদি কোনো খবর জোটাতে পারে সে।
মহিমচন্দ্র বললেন, “আসুন। কারখানা দেখা হল?”
মহিমের সামনের চেয়ারে বসতে বসতে কিকিরা খুশির গলায় বললেন, “মশাই, একটা কথা আছে জানেন তো? এক ফোঁটা মধু, এক কলসি গুড়ের জলের চেয়ে ভাল। আপনাদের কারখানা দেখে তাই মনে হল। কাজ অল্প, কিন্তু রঙটঙ ভাল। হাই ক্লাস। পরিবেশটাও নোংরা নয়।”
মহিমচন্দ্ৰ খুশি হয়ে বললেন, “এটাই আমাদের বিজনেস মটো। যা করব যত্ন করে করব। অনেক বড় কোম্পানিও আমাদের জিনিস কেনে। কিনে নিজেদের নামে চালায়।”
“কেন কিনবে না!… ভাল জিনিস পেলে কেউ ছাড়ে!”
“চা খাবেন? না কোল্ড ড্রিংকস?”
“চা।”
মহিমচন্দ্র ঘন্টি বাজিয়ে কাকে ডাকলেন। “চা নিয়ে এসো। ভাল করে আনবে। … আপনার শাগরেদটি কোথায়?”
“বাইরে ঘুরছে। আসবে এখুনি …।”
মহিমচন্দ্র কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই কিকিরা বললেন, “এটা আপনার অফিস?” বলতে বলতে ঘরটা দেখতে লাগলেন। একটা ঘর পার্টিশান করে দুটো ঘর করা হয়েছে। কাঠের পার্টিশান। চার ফুট মতন উঁচু, মাথায় ফুটখানেক কাঁচ। জানলা মাত্র দুটি। মহিমচন্দ্রের অফিসঘরটি সাধারণ ভাবেই সাজানো। লোহার আলমারি, ফাইল র্যাক, খুচরো কাগজপত্রর ভূপ। দু-চারটে রঙের টিন। দেওয়ালে রামকৃষ্ণ ঠাকুরের ক্যালেন্ডার। বাঁধানো দুটি ছবি-মহিমচন্দ্রের বাবার আর দাদার।
কাঠের পার্টিশানের একটি জায়গায় ফাঁক। টিকিটঘরের কাউন্টারের মতন। পাশেই মহিমচন্দ্রের টেবিল। টেবিলের ওপর টেলিফোন, ফাঁকা জায়গাটির পাশেই।
কিকিরা ধীরেসুস্থে নিজের চুরুট ধরালেন। বললেন, “আপনার পাশের ঘরটা কি ধরণীবাবুর অফিসঘর ছিল?”
“হ্যাঁ।“
“ওখানেই উনি বরাবর বসতেন বোধ হয়!”
“বরাবর। আর এই যে ঘর, অফিস, চেয়ার, এখানে আমার দাদা বসতেন।”
“আপনি?”
“আমি তখন বেশিরভাগ সময় আমাদের স্ট্র্যান্ড রোডের দোকানে বসতাম। পার্টি আর জিনিসপত্র সাপ্লাই নিয়ে থাকতাম।”
“এখন ওখানে কে বসে?”
“আমাদের এক কর্মচারী, তবে আত্মীয়।”
“আত্মীয়! কেমন আত্মীয়?”
“দাদার শ্যালক। কান্তিলাল।”
দু-তিনটে ছোট-ছোট টান মারলেন কিকিরা চুরুটে। তারপর বললেন, “আচ্ছা, মহিমবাবু, আপনার আর ধরণীবাবুর অফিসের মধ্যে কাঠের পার্টিশান। আপনারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতেন কেমন করে?”
মহিমচন্দ্র হাসলেন, “একটু জোরে কথা বললেই শোনা যায়, পাঁচ ফুট, সাড়ে পাঁচ ফুটের পার্টিশানে কী কথা আটকায়! মাথার ওপর ফাঁকা। অবশ্য জরুরি কথা বলতে হলে ওঁর ঘরে যেতাম। উনিও আসতেন।”
“তা ঠিক। … ফোনও তো একটা দেখছি।”
“একটাতেই কাজ হয়ে যায়। পার্টিশানের এ-পারে ও-পারে আমাদের টেবিল। ফোনটা এখন আমার টেবিলে, ওটা ওই ফোকর দিয়ে ওঁর টেবিলে ঠেলে দিতাম দরকারে। উনিও দিতেন। অসুবিধে কিছু হচ্ছিল না। এ-অফিসে দুটো ফোন। একটা কারখানার স্টোর রুমে রাখতে হয়। আর কত ফোন রাখবে কোম্পানি?”
“তা ঠিক। তারপর আজকাল যা ফোনের হাল!…ইয়ে, আপনারা তা হলে যে যার ঘরে বসেই কথাবার্তা বলতে পারতেন। “
“হ্যাঁ। জরুরি কথা হলে ঘরে যেতাম।”
মহিমচন্দ্রের বেয়ারা চা নিয়ে এল। তিন কাপ। তারাপদ কিন্তু তখনো আসেনি।
“আপনার শাগরেদকে ডেকে পাঠাই?”
“পাঠান।” কিকিরা চায়ে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন, “একটা কথা বলুন তো মহিমবাবু, সেদিন কি এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল যাতে ধরণীবাবু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন?”
মহিমচন্দ্র কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন কিকিরার দিকে। পরে বললেন, “কেন, আপনাকে আগে বলিনি?”
“না। মনে পড়ছে না।”
“বলেছি। আপনার খেয়াল নেই। বা হয়ত আমারই ভুল হয়েছিল বলতে।” মহিমচন্দ্র বললেন, “দুপুরে একটা ফোন এসেছিল মেজোবাবুর। ওপাশে তিনি ফোন ধরেছিলেন, কী কথা হয়েছিল আমি বলতে পারব না। তবে মেজোবাবু যেরকম জোরে জোরে কথা বলছিলেন, তাতে বুঝলাম তিনি ভীষণ রেগে গিয়েছেন। গালিগালাজও করছিলেন।”
“কাকে করছিলেন আপনি জানেন না?”
ইতস্তত করলেন মহিমচন্দ্র। শেষে বললেন, “মনে হল শেখরকে।”
তারাপদ এল। বসল একপাশে। কিকিরা ইশারায় চায়ের কাপ দেখালেন। মানে, নাও, চা খাও।
সামান্য পরে কিকিরা বললেন, “পরে আপনি নিশ্চয় ধরণীবাবুর ঘরে যান। তাঁকে দেখতে।”
“হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।”
“খুব উত্তেজিত দেখলেন?”
“ভীষণ উত্তেজিত। মেজোবাবু বরাবরই একটু রগচটা, তবে সেদিন যেন রাগে ফেটে পড়ছিলেন।”
“আপনাকে কিছু বলেননি?”
“না। শুধু বলছিলেন, এত সাহস ওর, আমাকে ধমকায়। লোফার, রাসকেল…।”
