ঘরে পা দিয়েই তারাপদ বলল, “স্যার, মলঙ্গা লেনের আশেপাশে খোঁজখবর করে দুটো হোটেল পেলাম। দুটোই তিন নম্বর ক্লাসের, চার নম্বরও বলতে পারেন। থার্ড ক্লাস! মামুলি। ওর মধ্যে একটা হোটেলে শেখরের খোঁজ পাওয়া গেল। ম্যানেজার আধবুড়ো, কানে কম শোনে, তবে ওস্তাদ লোক। প্রথমে মুখ খুলতে চায় না। অনেক ভজিয়ে-ভাজিয়ে, শেখরের খবর পেলাম। হোটেলের খাতার পাতা উলটে তার নামও বের করল ম্যানেজার। শেখর সপ্তাহ দুই আগেও ওই হোটেলে ছিল।”
কিকিরা বললেন, “মানে ক’দিন আগেও ছিল। পয়লা ফাল্গুনে যখন ওই শ্রদ্ধাঞ্জলি কাগজে বেরোয়, তখনো ছিল নাকি! আচ্ছা, শেখর কি ওই হোটেলে প্রথম আস্তানা গাড়ে?”
“না। ম্যানেজার বলল, পুরনো পার্টি। আর দু-একবার এসে থেকেছে। “
“হোটেলের খাতায় নিজের ঠিকানা কী দিত?”
“বালুরঘাট। বলত, বিজনেস করে, তাই মাঝে-মাঝে আসতে হয় কলকাতায়।”
“কিসের বিজনেস?”
“তা বলেনি।” বলে তারাপদ নিজের জায়গায় বসল। আবার বলল, “অফিস পালিয়ে সারা দুপুর আপনার কাজ করেছি, কিকিরা। কাল আমায় সেকশান-ইন-চার্জের দাবড়ানি খেতে হবে।”
কিকিরা কান দিলেন না কথাটায়। বললেন, “সিঁথি? সিঁথির খবরটার কী হল?”
“অফিসের এক বন্ধুকে বলেছি। হরিপদ। সিঁথিতেই থাকে, বেণী কলোনিতে। বলেছে খোঁজ এনে দেবে।”
“একটু তাড়াতাড়ি চাই হে, তারাপদ। দেরি করলে ক্যাচ করার অসুবিধে হবে।”
চন্দন বলল, “কেন?”
কিকিরা বললেন, “কেন? মহিমচন্দ্র যা বলছেন, তা যদি হয় তবে দিন দশেক আগে শেখর শেষ টাকা নিয়েছে। পয়লা ফাল্গনের আগে-আগেই। টাকাও নিয়েছে, আবার কাগজে শাসিয়ে রেখেছেও। এবারে নিয়েছে হাজার বারো। টাকা নেওয়ার পর মাস দেড়-দুই আর ও উৎপাত করে না। কাজেই শেখর আবার কবে টাকা চাইবে–তার জন্যে আমরা বসে থাকতে পারি না।”
চন্দন বলল, “কিন্তু একটা পাকাপাকি ঠিকানা ছাড়া শেখরকে পাবেন কেমন করে?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। কথাটা ঠিকই। তবে, অজানা অচেনা মানুষকে খুঁজে বের করতে হলে তো এইভাবেই খোঁজ নিয়ে নিয়ে বের করতে হবে। বললেন, “কলেজ স্ট্রিটে কোন্ চশমার দোকানে তাকে দেখা গিয়েছিল …!”
চন্দন বলল, “কিকিরা, কলেজ স্ট্রিটে কি একটা চশমার দোকান? কোন্ দোকানে সে গিয়েছিল, কেমন করে ধরব?”
“চেষ্টা করতে হবে।”
কথা ঘুরিয়ে চন্দন বলল, “আপনার প্রোগ্রেস কতদূর?”
“ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। কথাবার্তাও হয়েছে।” বলে কিকিরা ডাক্তার মুখার্জির কাছে যাওয়া এবং তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলার বিবরণ দিলেন। .
চন্দন মন দিয়ে সব শুনল। ভাবছিল। পরে বলল, “ধরণীবাবুর তো দেখছি কমসম করেও অনেক রোগ ছিল : ব্লাড সুগার, হার্ট …”
“মুখার্জি ডাক্তার বললেন, ওগুলো নেগলিজি। বয়েস হয়েছিল ভদ্রলোকের, সামান্য গোলমাল তো থাকবেই।”
“তা ঠিকই।”
“তবে যেটা ঝামেলা করত সেটা অ্যাজমা!”
“অত অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট খেতেন কেন? অ্যাসিডিটির রোগ ছিল? আলসার …”
“তা কিছু বললেন না।”
“আর মাথা ধরার ওষুধ। সেটাই বা অত খেতেন কেন?”
“বাতিক হয়ত।”
“পকেটে সবসময় ওষুধ থাকত?”
“হ্যাঁ।”
“কী ট্যাবলেট, নাম জানতে চেয়েছিলেন?”
“না। সেটা বাড়াবাড়ি হত।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “কিকিরা স্যার, ডাক্তার মুখার্জি বলেছেন তিনি যখন রোগীকে দেখতে যান, তখনো বিছানার পাশে অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটের পাতা ছড়ানো ছিল। “
“তাই বলেছেন। দেদার ট্যাবলেটও খেয়ে ফেলেছিলেন ধরণীমোহন। হয়ত, বুকের ব্যথা ওঠায় ভেবেছিলেন গ্যাসের জন্যে ব্যথা হচ্ছে।”
চন্দন কী ভেবে বলল, “আপনি কি ডাক্তার মুখার্জিকে জিজ্ঞেস করেছেন, আপনি ওঁর কাছে যাওয়ার পর ধরণীমোহন শুধু বুকের কষ্টের কথা বলেছিলেন, না–এমন কিছু বলেছিলেন যাতে মনে হয়, কোনো ওষুধ-বিষুধ খেয়ে হঠাৎ তাঁর এই কষ্ট হতে শুরু করেছে?”
কিকিরা তাকালেন। মাথা নাড়লেন। বললেন, না, তিনি জিজ্ঞেস করেননি। তাঁর মাথাতেই আসেনি।
“তুমি হঠাৎ একথা বলছ কেন?” কিকিরা বললেন
“বলছি এইজন্যে যে, যদি কেউ তাঁকে এমন কোনো ট্যাবলেট খাইয়ে থাকে যেটা তাঁর পক্ষে ভীষণ ক্ষতিকর! এ কেস অব পয়জনিংও তো হতে পারে।”
কিকিরা শুনলেন। ভাবলেন। তারপর বললেন, “তা কেমন করে হবে! কে পয়জনিং করবে! তা ব্যাপারটা জানা কঠিন নয়। ওটা অবশ্য ডাক্তারবাবুকে ফোন করে বা একবার গিয়ে দেখা করে জেনে নেওয়া যেতে পারে।”
তারাপদ বলল, “স্যার, পয়জনিং! আরেব্বাস! এ তো ডেঞ্জারাস ব্যাপার! কে করবে পয়জনিং? কেন করবে? মহিমচন্দ্র কি এটা জানেন, বা অনুমান করেন?”
কিকিরা বললেন, “দাঁড়াও, অত হুড়োহুড়ি করে একটা ধারণা করে ফেলে লাভ নেই। মহিমবাবুর সঙ্গে আমরা কথা বলব। ধরণীবাবু মারা গিয়েছেন বাড়িতে। কারখানার অফিসে নয়। কাজেই মহিমকে ঝট করে চেপে ধরার অসুবিধে আছে। ধীরে ধীরে জট খুলতে হবে।”
তারাপদ আর কিছু বলল না।
বগলা চা দিয়ে গেল।
চা খেতে-খেতে কিকিরা বললেন, “তারাপদ, আমার মনে হয়–মহিমচন্দ্রদের, মানে রাহা ব্রাদার্সের রঙ কারখানায় একবার যাওয়া উচিত। সেখানে কিছু খোঁজখবর পাওয়া যেতে পারে। ধরণীমোহনের মারা যাওয়ার দিন সেখানে কিছু ঘটেছিল কি না, বা ওই কারখানায় মাঝেমধ্যে কোনো ঘটনা ঘটত কি না, খোঁজ নেওয়া দরকার। আর দরকার শেখরকে ক্যাচ করা।”
