“বাড়িতেই।”
“হ্যাঁ। আমার চোখের সামনে।”
কিকিরা অল্পক্ষণ চুপ করে থাকলেন। আরও কিছু কথা জানার আছে। কিন্তু তিনি তো আর পুলিশের লোক নন। প্রাইভেট কোনো গোয়েন্দা অফিসেরও অফিসার নন, কাজেই খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে সাত-সতেরো প্রশ্ন করা যায় না। ডাক্তারবাবু সন্দেহ করবেন। এমনিতেই তো তিনি প্রথমে কথা বলতে চাননি। কেন বলবেন? অজানা অচেনা একজন লোকের সঙ্গে নিজের মৃত এক রোগীর বিষয় নিয়ে কথা বলতে কোন ডাক্তারই বা চায়! কিকিরা এসব জানতেন। কাজেই গোড়াতেই মিথ্যে পরিচয় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তিনি একটা জমিজমা সংক্রান্ত কারবারের একজন কর্মচারী। ধরণীমোহনের কিছু জমি ছিল তাঁদের হাতে। তিনি মারা যাওয়ার পর সেই জমির ভাগীদার নিয়ে কোম্পানি খোঁজখবর করছে। তার আগে কিছু সাধারণ মালি কাগজ কলমের কাজ থাকে। কিকিরা সেই কাজ সারতে ডাক্তারবাবুর কাছে এসেছেন। রুটিন ওয়ার্ক বলতে যা বোঝায় এটাও তাই।
ডাক্তারবাবুর মেজাজ বুঝে কিকিরা এবার বললেন, “আচ্ছা ডাক্তারবাবু, ওঁর কোনো ভারি অসুখ ছিল?”।
“না। এই বয়েসে যা হয়, সামান্য হার্টের গোলমাল। নেগলিজেবল। তবে অ্যাজমা ছিল বছরে দু-একবার করে পড়তেন বিছানায়। আর অসুখ বলতে ব্লাড সুগার বাড়ত মাঝে-মাঝে। বেশি বাড়ত না। খাবারদাবার ধরাকাটা করে সেটা ম্যানেজ করা যেত। “
“তবে তো ভয় পাওয়ার মতন ..”
“না, না, একেবারেই নয়। … একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি ধরণীবাবুর দুটি বদ অভ্যাস ছিল। অকারণ আজেবাজে ওষুধ খেতেন। অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট আর মাথা ধরার ওষুধ তো মুড়ি-মুড়কির মতন খেতেন। দরকার নেই, তবু খেতেন। মনের বাতিক। কতবার বারণ করেছি–শুনতেন না। বলতেন, আরে এগুলো তো ইনোসেন্ট, এতে আর ক্ষতি কী হবে।.. বুঝলেন মশাই, উনি যেদিন মারা যান, সেদিনও আমি এসে দেখি-ধরণীবাবুর মাথার কাছে অ্যান্টাসিডের পাতা। পাতা প্রায় শেষ। পর পর কত যে খেয়েছেন, ঠিক নেই।”
কিকিরা আর কথা বাড়ালেন না। সুতো বেশি টানলে ছিঁড়ে যেতে পারে।
“ডাক্তারবাবু, এবার অন্য একটা কথা।”
“বলুন?”
“ধরণীবাবুর ওয়ারিশান বলতে দুই ভাগ্নে।”
“হ্যাঁ। ধীরাজ আর শেখর।”
“আপনি চেনেন?”
“চিনি। তবে কম। ধীরাজ চাবাগানে থাকে। কলকাতায় কমই আসত। মামার কাজের সময় এসেছিল।”
“শেখর?”
“তাকে দেখেছি। কাজের সময়ও দেখেছি। ওই ছোকরা ভাল নয়। রাফিয়ান টাইপের। ভদ্রঘরের ছেলে হয়েও অতি অসভ্য, রুড। অপদার্থ ছেলে!”
“যদিও আমাদের জানার কথা নয়, তবু একটা কথা জিজ্ঞেস করি। ধরণীবাবু কি ভাগ্নেদের সম্পর্কে কিছু বলতেন আপনাকে বন্ধু হিসেবে?”
“শেখরের নাম উচ্চারণ করতেন না বড়। ধীরাজকে ভালবাসতেন।”
কিকিরা এবার উঠতে-উঠতে বললেন, “শেখর থাকে কোথায়?”
“জানি না।”
“ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু, চলি–! আপনার অনেকটা সময়ষ্ট করলাম। কিছু মনে করবেন না। নমস্কার।”
মুখার্জি ডাক্তার মাথা হেলালেন, “নমস্কার।”
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে কিকিরা হঠাৎ বললেন, “ভাল কথা, এতক্ষণ কথা বললাম, আপনাকে তো একটা জরুরি জিনিস দেখানো হয়নি।” বলে পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা পুরনো খবরের কাগজ বের করলেন। করে এগিয়ে দিলেন। “এই দাগ দেওয়া জায়গাটা একবার পড়ন।”
ডাক্তার অবাক হয়েছিলেন। তবু কাগজটা নিয়ে পড়লেন দাগ-দেওয়া জায়গাটা। পড়া শেষ করে বললেন, “পড়লাম।”
“কিছু নজরে পড়ল?”
“না।”
“ওই যে লিখেছে, মৃত্যুরহস্য, মানে হঠাৎ মারা যাওয়ার পেছনে যে রহস্য আছে, তার কোনো কিনারা করা যায়নি। দেখেছেন?”
কাগজটা আবার দেখলেন মুখার্জি ডাক্তার। তারপর বললেন, “ননসেন্স। কোনো মানে হয় না। এসব বাজে কথা। শুনুন মশাই, একটা কথা পরিষ্কার বলি! ডাক্তার ভগবান নয়। অনেক লোকই হঠাৎ মারা যায়, অ্যাপারেন্ট কোনো রিজন থাকে না। কেন মারা গেল, তা বলা যায় না। হাজার কারণ থাকতে পারে! যাক গে, এ-সব বাজে কথার কোনো মানে নেই। নিন আপনার কাগজ।”
কিকিরা হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলেন। নমস্কার জানিয়ে চলে এলেন ঘর ছেড়ে।
রাস্তায় নেমে কেমন যেন হতাশ লাগছিল তাঁর। ডাক্তারবাবু মানুষটি ভাল। তিনি যে কিছু লুকোবেন, তাও মনে হল না। ধরণীমোহনের ডেথ সার্টিফিকেট তিনিই দিয়েছেন। কোনোরকম সন্দেহ হলে কখনোই তিনি সার্টিফিকেট দিতেন না। মুখার্জি ডাক্তার এমন মানুষ যে, তাঁকে দিয়ে জোর করে বা টাকা খাইয়ে মিথ্যে ডেথ সার্টিফিকেট লিখিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
তা হলে কেন ওই মৃত্যু রহস্যের কথা লেখা হয়েছে? কেন? কী উদ্দেশ্য নিয়ে? শুধুই কি মহিমচন্দ্রকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের জন্য। তাই বা হবে কেন? কোনো কারণ নেই, মিথ্যে একটা ধোঁকা দিয়ে টাকা আদায়! আর মহিমচন্দ্র সব জেনেশুনে, বুঝেও ধাপ্পাবাজের হাতে হাজার-হাজার টাকা খুঁজে দিচ্ছেন গত একটি বছর ধরে! আবার একথাও বলছেন যে, কেন তিনি দিতে বাধ্য হচ্ছেন তা বলতে পারবেন না। মানে, তিনি কারণটা গোপন রাখতে চাইছেন! অদ্ভুত!
কিকিরা কেমন যেন বিরক্ত হয়ে উঠলেন। মহিমচন্দ্রের ওপরই তাঁর রাগ হচ্ছিল। ভদ্রলোক চান, সাপ মরবে অথচ লাঠি ভাঙবে না। বা রে মজা।
.
সন্ধের মুখে-মুখে তারাপদ আর চন্দন একই সঙ্গে এল। চন্দনকে তার মেডিকেল মেস থেকেই ধরে এনেছে তারাপদ। সেইরকমই কথা ছিল।
