“হ্যাঁ।”
“শেখর যে এভাবে আপনার কাছ থেকে টাকা নেয়, আপনি তার দাদাকে জানিয়েছেন?”
“মহিমচন্দ্র একটু চুপ করে থেকে বললেন, “না।”
“নয় কেন?”
কোনো জবাব যেন মুখে এল না মহিমচন্দ্রের। শেষে অবশ্য বললেন, “জানাইনি, কারণ দুই ভাইয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আর নেই। সে তার ছোট ভাই সম্পর্কে কিছু জানতে চায় না। খোঁজখবরও রাখে না। মেজোবাবু যাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাকে সে ভাই বা আত্মীয় বলে মনে করে না।”
“ধরণীবাবুর ফ্ল্যাট, টাকাপয়সা, কোম্পানির লাভ থেকে পাওয়া অংশ, এসব কে পাবে? দুই ভাগেই তো?”
“না,” মাথা নাড়লেন মহিমচন্দ্র, শেখর কিছু পাবে না। মেজোবাবু সেটা লেখাপড়া করে গেছেন। ধীরাজ পাবে। ধীরাজ কলকাতার ফ্ল্যাট পাবে, আর বছরে কুড়ি হাজার টাকা। মেজোবাবুর পাওনা টাকা যা কোম্পানি থেকে পাওয়া যাবে, তার থেকে কুড়ি হাজার টাকা মাত্র। আর বাকি টাকা দেওয়া হবে সীতাপুরের কুষ্ঠাশ্রমকে।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “কুষ্ঠাশ্রমকে?”
“হ্যাঁ। মেজোবাবু বরাবরই ওই আশ্রমকে টাকা দিতেন।”
অনাদি ট্রে সাজিয়ে চা আনল। চা আর মিষ্টি।
“নিন রায়মশাই, একটু চা খান।”
চা দিয়ে অনাদি চলে গেল।
চা খেতে-খেতে মহিমচন্দ্র নিজেই বললেন, “আপনি আমায় কাল বলছিলেন, আমি কেন পুলিশকে খবর দিচ্ছি না!… দেখুন, ওটা তো সহজ কাজ। ওই কাজটা আমি করতে পারছি না কেন তা আমার পক্ষে আপনাকে বলা সম্ভব নয়। আগেই আমি সে কথা বলেছি। কিছু মনে করবেন না রায়মশাই, সংসারে এমন জিনিস থাকে যা অন্যকে বলা যায় না। যদি বলতে পারতাম, আমি বেঁচে যেতাম। আপনার কাছেও ছুটতে হত না।… আপনি পারলে আমাকে শেখরের হাত থেকে বাঁচান। নয়ত, নয়ত.” কথাটা আর শেষ করতে পারলেন না মহিমচন্দ্র।
তারাপদর যেন মনে হল, মহিমচন্দ্র কোনো শক্ত জালে জড়িয়ে পড়েছেন। বেরিয়ে আসার উপায় নেই।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তিনজনেই চা খেতে লাগলেন মুখ বুজে।
শেষে কিকিরা বললেন, “শেখরকে কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারেন?”
“না। ও যে কোথায় থাকে, আমি জানি না।”
“তবু?”
“আমি তার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি… তবে দু-তিনটে জায়গার কথা আমি বলতে পারি, সেখানে চেষ্টা করতে পারেন।”
“কোন-কোন জায়গা?”
“সিঁথির দিকে একটা বাড়িতে সে থাকত, সেখানে খোঁজ করতে পারেন। বাড়ির নম্বর আমি জানি না। শুনেছি, বাড়ির কাছাকাছি র্যাশন শপ আছে।”
“আর?”
“বউবাজারের মলঙ্গা লেন-এর আশেপাশে একটা সস্তা হোটেল আছে সেখানেও সে থাকত।”
“আর?”
“হ্যারিসন রোডে ওকে দেখা গিয়েছে। চশমার দোকানে।”
“শেখর কি চশমা পরে?”
“হ্যাঁ। ওর চোখ বেশ খারাপ।”
“ওর একটা ফোটো আমাদের দেখাতে পারেন?”
“পারি।”
“আর-একটা কথা মহিমবাবু! ধরণীমোহন কীভাবে মারা যান? মানে, ঠিক কীভাবে?”
“সে তো আগেই বলেছি।”
“হার্ট ফেলিওর বলেছেন। কিন্তু হঠাৎ হার্ট ফেলিওর কেন?”
“তা বলতে পারব না। ডাক্তার যা বলেছেন, তাই জানি।”
“ডাক্তার কি ধরণীবাবুর নিজের? ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান?”
“হ্যাঁ। ডাক্তার মুখার্জি। বিকাশ মুখার্জি।”
“ঠিকানা?”
মহিমচন্দ্র ঠিকানা বলতে পারলেন না, জায়গাটা বুঝিয়ে দিলেন।
কিকিরা এবার উঠলেন। বললেন, “আজ চলি।…. ও, ভাল কথা, শেখরের একটা ফোটো যদি এনে দেন?”
“খুঁজে বের করতে হবে। কাল আপনাকে পাঠিয়ে দেব।”
“তাই দেবেন।”
.
০৪.
ডাক্তার বিকাশ মুখার্জির বয়স হয়েছে। প্রবীণ মানুষ। তাঁর চেম্বার আর ডিসপেনসারি দেখলে মনে হবে, বেশ পুরনো। কোনো বাহার নেই। ম্যাড়মেড়ে। সাধারণ মানুষ, গরিব-গুরবোদেরই ভিড় বেশি সেখানে
ডিসপেনসারিতেই শেষপর্যন্ত বিকাশ ডাক্তারকে ধরলেন কিকিরা। মিথ্যে একটা পরিচয় দিয়ে। উপায় ছিল না। তা হোক-তবু অনেকটা বেলায় ধরতে পারলেন। একাই এসেছেন কিকিরা। তারাপ অফিসে, চন্দন তার হাসপাতালে।
ডাক্তারবাবু মানুষটি ভাল। তবে কথা বেশি বলেন। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি।
কিকিরা সবিনয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ধরণীমোহনের কথা তুলতেই বিকাশ ডাক্তার যেন মহাভারত খুলে বসলেন। হাজার কথা। ধরণীমোহন কেমন বিশ্বাস করতেন তাঁর ডাক্তারকে, কতটা মান্য করতেন তাঁকে–এ-সব কথা দিয়ে শুরু করে ধরণীমোহনের পুরনো কথা, এমন কি, বেলগাছিয়ায় ফ্ল্যাট কেনার পেছনেও যে ডাক্তারের বারো আনা উদ্যোগ ছিল, তাও বুঝিয়ে দিলেন।
মিনিট চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ ডাক্তারবাবুর একতরফা বক্তৃতা শোনার পর কিকিরা বললেন, “উনি মারা গেলেন কীভাবে?”
“হার্ট ফেল করে। সাম কাইন্ড অফ ব্লকিং … মশাই, সে কী বলব আপনাকে। সেদিন সন্ধেবেলা হঠাৎ ধরণীবাবুর বাড়ি থেকে লোক এল। কাজের লোক, জগন্নাথ। এসে বলল, বাবুর বুকে খুব কষ্ট হচ্ছে, ছটফট করছেন, আপনি তাড়াতাড়ি চলুন। … ব্যাগ আর কয়েকটা ইঞ্জেকশন হাতে ছুটলাম। এদিকে আবার সেদিন একটা মিনিবাস অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে হাঙ্গামা বেঁধে গিয়েছে… ছুটতে ছুটতে গিয়ে দেখি, ধরণীবাবু বিছানায় ছটফট করছেন, বমি করেছেন, বুকে অসহ্য কষ্ট, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার অবস্থা, স্প্যাম হচ্ছে। প্রেশার, হার্ট–সবই দেখলাম। একটা ইঞ্জেকশনও দিলাম। অক্সিজেনের জন্যে তোক পাঠালাম। ভাবলাম, এই মুহূর্তে হাসপাতালে পাঠাতে না পারলে তো পেশেন্টকে বাঁচানো যাবে না। … কিন্তু আমাদের অবস্থা বোঝেন। হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে করতে রোগী মারা গেলেন। “
