কিকিরা কিছু বললেন না।
তারাপদ বলল, “চাঁদু কাল বলছিল, মহিম লোকটাই প্যাচালো। ওর কোনো মোটিভ আছে।”
“থাকতে পারে। খানিকটা না এগিয়ে কিছু বলা যাবে না।”
ততক্ষণে সেই লোকটা বাড়ির ভেতর থেকে ফিরে এসেছে। ফিরে এসে রীতিমত খাতির করেই কিকিরাদের ডাকল। “আসুন– বসবেন চলুন। বাবু আসছেন।”
নিচেই একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে কিকিরাদের বসাল লোকটা। ঘরের আলো জ্বেলে দিল। দরকার ছিল না, তবু জ্বালল। পাখাটাও চালিয়ে দিল। ধীরেই চলছিল পাখা।
এটা যে মহিমচন্দ্রের বসার ঘর বৈঠকখানা, বোঝা যায়। সেইভাবেই সাজানো। সোফা-সেটির সঙ্গে একটা ডিভানও আছে। বাড়তি কিছু চেয়ার। ঘরের দেওয়াল-আলমারিতে নানারকম সাজাবার জিনিস। দেওয়ালে দু-চারটে ছোটবড় ছবি। বড় করে বাঁধানো একটা ফোটোও ছিল। মহিমচন্দ্রের বাবারই বোধ হয়। কিকিরা ঘরটা দেখছিলেন। তারাপদও দেখছিল, তবে সে যেন খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
মহিমচন্দ্র এলেন।
ঘরে ঢুকে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারাপদকে দেখলেন। কিকিরা বললেন, “আপনি ফিরে এসেছেন! ভাবছিলাম, কী জানি আপনি হয়ত কারখানা থেকে এখনো ফেরেননি!” বলে একটু হাসলেন কিকিরা, তারাপদকে দেখালেন, “আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। এ হল তারাপদ জুনিয়ার। আমার শাগরেদ। আমার মশাই দুই জুনিয়ার শাগরেদ, একজনকে নিয়ে এলাম। আরেকজন হল ডাক্তার। চন্দন। তাকে আজ আনা হল না। পরে আপনার সঙ্গে চন্দনের আলাপ হবে। “
মহিমচন্দ্র ইতস্তত করে বললেন, “আপনার শাগরেদদের কথা জানতাম না। আগে কিছু বলেননি!”
কিকিরা হালকা ভাবেই বললেন, “কাল আপনি আর কিছুক্ষণ থাকলেই তারাপদকে দেখতে পেতেন। চন্দন অবশ্য অনেক পরে এসেছিল।”
এগিয়ে এসে মহিমচন্দ্র বসলেন, “এঁরা তবে আপনার লোক?”
“হ্যাঁ। আমরা একসঙ্গে কাজ করি। একা সবদিকে চোখ রাখা যায় না।.. আপনি আমার সামনে যা বলতে পারেন, এদের কাছেও তা বিশ্বাস করে বলতে পারেন।”
“ও! কিন্তু….”
“কিন্তুর কিছু নেই, মহিমবাবু। আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন। তা ছাড়া কালই আমি এদের কাছে আপনার কথা বলেছি।”
“বলে ফেলেছেন?”
কিকিরা মাথা হেলালেন। না বললে কাজ করব কেমন করে? আপনার যদি আপত্তি থাকে, তা হলে আমার পক্ষে
“না, না, তা নয়। আমি তো আপনার সাহায্য চেয়েছি।”
“তা হলে নির্ভাবনায় থাকুন।“
মহিমচন্দ্র গলা তুলে ডাকলেন, “অনাদি, অনাদি।”
সেই লোকটি আবার এল।
অনাদিকে চায়ের ব্যবস্থা করতে বললেন মহিমচন্দ্র। অনাদি চলে গেল।
কিকিরা অল্পক্ষণ অপেক্ষা করে বললেন, “মহিমবাবু, কাল তো সব কথা হয়নি। সময় হয়ে ওঠেনি। আপনার ব্যাপারটাই ভাবছিলাম কাল। আরও কিছু কথা যে জানা দরকার।”
মহিমচন্দ্র বললেন, “বলুন, কী জানতে চান?”
“আপাতত দু-একটা কথা বলুন। ধরণীমোহনের একটা অংশ তো আপনাদের রাহা ব্রাদার্সে আছে। নয় কী?”
“আছে। আমার দাদা অহীনচন্দ্র যখন রঙ কারখানা শুরু করেন তখন নিজেদের টাকাতেই করেছিলেন। বছর কয়েক পরে মেজোবাবু–মানে ধরণীদা আসেন। তাঁর টাকাপয়সা ছিল না। কিন্তু মাথা ছিল। অসম্ভব পরিশ্রমী ছিলেন। দাদার বন্ধু ধরণীদা। দাদা ওঁকে কোম্পানিতে নিয়ে নেন। ওয়ার্কিং পার্টনার হিসেবে। পরে তাকে অংশীদারও করে দেন কোস্পাানির।”
“সমান-সমান?”
“না। প্রথমে আমাদের বারো, ওঁর চার। পরে ওটা দশ-ছয় হয়। মানে ছয় ভাগের অংশীদার।”
“ধরণীবাবু লাভের অংশ পেতেন?”
“বরাবর। এই টাকা থেকে মেজোবাবু ছোট একটা ফ্ল্যাটও কিনেছিলেন বেলগাছিয়ার দিকে।”
“সেখানে কে-কে থাকত?”
“এখন কেউ থাকত না। একা মেজোবাবু থাকতেন। তবে ফ্ল্যাট তো হালে কিনেছেন, বছর তিন-চার আগে। এর আগে ভাড়াবাড়িতে থাকার সময়। এককালে সবাই থাকত, মেজোবাবু, মানুপিসি–মানে মেজোবাবুর বিধবা দিদি, দুই ভাগ্নে।“
মহিমচন্দ্র পুরনো কথাগুলো বুঝিয়ে বললেন। ধরণীমোহন একসময় বিধবা দিদি আর ভাগ্নেদের নিয়েই থাকতেন। মানুষও করেছেন ভাগ্নেদের–অন্তত আট-দশ বছর তাদের দায়-দায়িত্ব পালন করেছেন শেষের দিকে। বড় ভাগ্নে ধীরাজ স্বভাবে ভাল, বুদ্ধিমান। সে কাজকর্ম করতে করতে চা বাগানে চাকরি জুটিয়ে চলে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় মাকে। মা অবশ্য চা বাগানেই মারা যান। আর শেখর বরাবরই অবাধ্য, বদমাশ ধরনের। মেজোবাবু তার ছোট ভাগ্নেকে নানাভাবে শোধরাবার চেষ্টা করেন। এমন কি, তাকে রঙ কারখানাতে এনে কাজকর্ম শেখাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্বভাব মন্দ হলে যা হয়– শেখর কাজকর্ম তো শিখলই না, কোম্পানির টাকা মেরে পালিয়ে গেল। মেজোবাবু তখন থেকেই ছোট ভাগ্নের মুখদর্শন করতেন না। তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তারাপদ ধরণীমোহনের বৃত্তান্ত শুনতে-শুনতে মহিমচন্দ্রকে দেখছিল। মামুলি চেহারা, গোলগাল, আধ-ফরসা, মাথার চুল ছোট-ছোট, কোঁকড়ানো, চোখে চশমা। ভদ্রলোককে দেখলে বোঝা যায় না তিনি কোম্পানি চালানোর বুদ্ধি ধরেন। সাদামাঠা মনে হয়। তবে মুখ দেখে কি মানুষ চেনা যায়! মহিমচন্দ্রের চোখের মণির রঙ যেন খয়েরি, মাঝে-মাঝে চকচক করে ওঠে। ওইখানেই যা একটু অন্যরকম মনে হয়।
কিকিরা কথা বলছিলেন। বললেন, “শেখরের দাদার নাম কী বললেন যেন?”
“ধীরাজ।”
“বয়েস কত?”
“আমার চেয়ে অনেক ছোট। বছর আটত্রিশ।”
“শেখরের বয়েস বত্রিশ-তেত্রিশ হবে?”
