কিকিরা বললেন, “সেটা খুব স্বাভাবিক। মহিমবাবুকে সন্দেহ হতেই পারে। কিন্তু তারাপদ, আমি বুঝতে পারছি না, ভদ্রলোক যদি পাপকর্ম করেই থাকবেন তবে আমার কাছে আসবেন কেন? ক্রিমিন্যালরা নিজেদের বাঁচাবার জন্যে উকিল ধরে। উকিল সব জেনেশুনেও তার মক্কেলকে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বাঁচাবার চেষ্টা করে। আমি তো বাবা পুলিশ কোটে ক্রিমিন্যালদের হয়ে ওকালতি করি না! আমার কাছে কেন!”
তারাপদ বা চন্দন কেউই সেটা বুঝতে পারছিল না। মহিমচন্দ্র শেখরকে টাকা দিচ্ছেন বারবার, অথচ পুলিশকে জানাচ্ছেন না। আবার তিনিই এসেছেন কিকিরার কাছে সাহায্য চাইতে। অদ্ভুত ব্যাপার!
কিকিরা এবার উঠে পড়লেন দু হাত মাথার ওপর তুলে, দু পাশে ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙলেন। ক্লান্তি লাগছিল বোধ হয়। হাই তুললেন। তারপর বললেন, “এখন থাক। পরে ডাকব। দাও, একটা ফুঁ দাও তোমাদের।”
“ফুঁ’ মানে সিগারেট। চন্দন সিগারেট দিল।
তারাপদ বলল, “কিকিরা, আপনি বলেছিলেন–দু-এক হপ্তার মধ্যে বেড়াতে বেরোবেন। বিষ্ণুপুর যাবেন! কী হল?”
“গেলেই হয়। চাঁদু দিন ঠিক করুক।”
“আমি ঠিক করছি,” তারাপদ বলল, “এপ্রিলের গোড়ায় চলুন। না হয়। মার্চের কুড়ি-বাইশ…”।
কিকিরা বললেন, “মন্দ নয়। তার আগে একবার পালিত লেন-এ যেতে হবে।”
“পালিত লেন? সেটা কোথায়?”
“আনন্দ পালিত নয়, এ হল হেম পালিত। শিয়ালদার দিকে।”
“সেখানে কী?”
“মহিমচন্দ্রের বাড়ি। তিনি আমায় যেতে বলে গিয়েছেন।”
“ও!..তার মানে, আপনি এখন মহিম নিয়ে ফেঁসে গেলেন! বিষ্ণুপুর হচ্ছে।?”
“কেন হবে না! মহিম-কেসটা যদি মিটে যায় হে, প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে চলে যাব।”
“আচ্ছা! কত টাকা দেবেন মহিম?”
“সে কাজের খাটুনি বুঝে। তা পাঁচ-সাত হাজারের কম তো নয়।”
তারাপদ উঠে পড়ল, ইশারা করল চন্দনকে, অর্থাৎ, নে উঠে পড়, আর নয়।
কিকিরা মানুষটি বিচিত্র। তিনি যে লাখ টাকার মালিক তা নন। সামান্য টাকাপয়সা তাঁর আছে ব্যাঙ্কে। তা বলে এত পয়সা নেই যে, পায়ের ওপর পা তুলে বছরের পর বছর কাটাতে পারেন। যারা তাঁর কাছে আসে, সাহায্য চায়–তাদের কাছ থেকে তিনি অনায়াসেই দশ বারো হাজার নিতে পারেন। কিন্তু নেন না। যে যা দিল, তাতেই খুশি। ফলে দু-চার হাজারের বেশি আয় হয় না। অথচ টাকা কিকিরার দরকার।
চন্দনও উঠে পড়েছিল।
তারাপদ বলল, “শুনুন কিকিরা, একটা সাফ কথা বলে দিচ্ছি! মহিমচন্দ্র একজন ব্ল্যাকমেলারকে বছরে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা গুনে দিচ্ছেন। আপনাকে যদি তিনি পাঁচ হাজার অ্যাডভান্স না করেন, আমরা এতে নেই।”
কিকিরা বললেন, “ওহে তারাবাবু, আমি ব্ল্যাক নই, হোয়াইট। পাঁচ কেন হে, পনেরোও নিতে পারি, তবে কাজ বুঝে। আগে কাজটা দেখি–তবে না টাকাপয়সার কথা!”
“তা হলে আপনি কাজ বুঝুন। আমরা চলি।”
“তা যাও। তবে কাল এখানে তুমি চলে আসবে, বিকেল-বিকেল আমরা পালিত লেন-এ যাব।”
তারাপদ কিছু বলল না।
.
০৩.
পালিত লেনকে ঠিক গলি বলা যায় না। রাস্তা খানিকটা চওড়া। তবে বেশিরভাগ ঘরবাড়ি সেই আদ্যিকালের। কোনো ছিরিছাঁদ নেই। ওরই মধ্যে দু-চারটে বাড়ি পুরনো হলেও পরে তার রকমফের হয়েছে। অন্যরকম দেখায় খানিকটা।
মহিমচন্দ্রদের বাড়িটা কিন্তু গলির মধ্যে বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতন। প্রথমে ধরা যায় না, দু-চার পা এগিয়ে গেলে বোঝা যায়, গলির গা ছুঁয়ে আট-দশ গজ প্যাসেজ। ফটকের মতন খানিকটা জায়গা; ভেতরের দিকে সামান্য ফাঁকা জমি। তার গায়ে বাড়ি। ফটক থেকে বিশ-পঁচিশ পা এগুলে দোতলা বাড়িটা চোখে পড়ে। পুরনো বাড়ি, কিন্তু সামনের দিকে ভেঙেচুরে নতুনভাবে সারিয়ে নেওয়া হয়েছে। রঙচঙ করা, হাল ফ্যাশানের গ্রিল, বাহারি ব্যালকনি। সামনের জমিতে অল্পস্বল্প বাগান, গাড়ি রাখার গ্যারাজ।
তারাপদ বলল, “স্যার, আপনার মক্কেল ধনী লোক। বাড়ির চেহারা দেখছেন না!”
কিকিরা বললেন, “রঙ কারখানার মালিক, গরিব হবে কোন দুঃখে!”
“তা হলে অ্যাডভান্সটা আজই চেয়ে নেবেন। নগদ।”
“তুমি তো বেশ মানিক্যাচার হয়ে পড়েছ?”
হেসে ফেলল তারাপদ। বলল, “মানিক্যাচার কী জিনিস, কিকিরা?”
“মানি ক্যাচিং যারা করে তারাই মানিক্যাচার। আগেকার রেল এঞ্জিনে কাউক্যাচার থাকত, দেখেছ?”।
“মনে করতে পারছি না, স্যার।”
“থাক, মনে করতে হবে না। ওই লোকটাকে ডাকো, বলো– মহিমচন্দ্রকে খবর দিতে।”
বারান্দার সিঁড়ির কাছে একটা লোক পঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিকিরাদের দেখছিল। তারাপদ তাকে ডাকল।
লোকটা কাছে এলে তারাপদ বলল, “মহিমবাবুকে খবর দাও, বলো রায়বাবু এসেছেন। তার আসার কথা ছিল।”
লোকটা দেখল কিকিরাকে, তারপর চলে গেল।
এখনো আলো আছে। বিকেল পড়ে যাওয়ার পরও এ-সময় আজকাল আলো থাকে। যদিও ফাঙ্গুন মাস, বসন্তকাল, তবু গরম পড়ে আসছে।
কিকিরা বললেন, “মহিমচন্দ্র বাড়িতেই। গাড়ি রয়েছে দেখছি।”
তারাপদ বলল, “স্যার, আপনি কি একটা জিনিস নজর করেছেন?”
“কী?”
“এই বাড়ির দু-চারটে বাড়ি আগে একটা ফার্নিচার পালিশের ছোট দোকান দেখলাম। দোকানের বাইরে একটা ছেলে স্কুটার দাঁড় করিয়ে রেখে আমাদের দেখছিল।”
কিকিরা বললেন, “দেখছিল তো কী হয়েছে! দেখতেই পারে। আমরাও তো রাস্তার লোক দেখি।”
“দেখা আর নজর করা এক জিনিস নয়। আমরা এ বাড়িতে ঢোকা পর্যন্ত ও নজর করেছে।”
