“বা! কিসের ব্ল্যাকমেল। তুই কি ঘুমোচ্ছিলি নাকি?”
“মন দিয়ে শুনিনি।”
“কেন, তোর মন কোথায়? হাসপাতালে রোগী মেরেছিস?”
“রাস্তায় একটা লোককে চড় কষিয়েছি। এমন বাজে লোক। পায়ে পা লাগিয়ে চেঁচাতে আসে!…যাক গে, কী কেস তোদের বল?”
তারাপদ আবার বলল।
সবটা অবশ্য বলতে হল না; চন্দনের কিছু কিছু মনে ছিল। মোটামুটি ব্যাপারটা সে বুঝে নিল।
“রাহা ব্রাদার্স-এর কিসের কারবার, কিকিরা?” চন্দন জানতে চাইল।
কিকিরা বললেন, “রঙের কারবার।”
“রঙ? কিসের রঙ?”
“পেন্টস! কারখানা আছে রঙের। বাজারে কিছু ছোটখাটো রঙের ব্যবসায়ী আছে; সবাই তো এক নম্বর রঙ কিনতে পারে না। দামে খানিকটা সস্তা পড়ে এমন রঙ চায়। ছাপোষা লোকদের কাজে দেয়। মফস্বলে ভালই চলে।”
“কোথায় কারখানা?”
“হাওড়া।”
চন্দন এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, “মহিমচন্দ্র আর ধরণীমোহন–একজন রাহা অন্যজন সেন–কোম্পানির নাম রাহা ব্রাদার্স-ভেতরের ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলবেন কিকিরা? ধরণীমোহন কে ছিলেন?”
কিকিরা বললেন, “ব্যাপার তেমন গোলমেলে নয়। পার্টনারশিপ বিজনেস। মহিমচন্দ্রের বড়দাদা ব্যবসাটা শুরু করেন। রাহা ব্রাদার্স নামে। পরে তাঁর বন্ধু ধরণীমোহন ব্যবসায় যোগ দেন। কোম্পানির নাম পালটানো হয়নি। মহিমচন্দ্রের বড়দাদা ছিলেন বড়বাবু। কারখানার লোক তাঁকে বড়বাবু বলে ডাকত। ধরণীমোহন আসার পর তিনি হলেন মেজোবাবু।”
“মহিমবাবু কি ছোটবাবু?”
“তা হবে।…যা বলছিলাম, বড়বাবু মারা গিয়েছেন বছর পাঁচেক আগে। তিনি মারা যাওয়ার পর মেজোবাবু–মানে ধরণীমোহন কোম্পানির মাথা ছিলেন। তাঁর পরামর্শ মতনই কোম্পানি চলত। তা তিনিও গত বছর মারা যান।”
“কেমন করে?”
“মহিমচন্দ্র বলছেন, হঠাৎ মারা যান। হার্ট ফেল।”
“হার্ট ফেল না করলে আর মারা যাবেন কেন? কিন্তু হঠাৎ হার্ট ফেলের কারণ? কোনো অসুখ ছিল হার্টের?”
“না, তেমন কিছু নয়। হাঁপানির একটা টেনডেনসি ছিল। মাঝে-সাঝে ব্রিদিং ট্রাল হত। সামান্য ব্লাড সুগার। তার বেশি কিছু ছিল বলে কেউ জানে না। “
চন্দন কী ভাবল, বলল, “কিকিরা, হার্টের ছোটখাটো গোলমাল বলে আমরা প্রথমে যা তেমন একটা পাত্তা দিই না, সেটা হয়ত আসলে কোনো বড় গোলমাল। আগে ঠিকমতন ধরতে না পারলে হঠাৎ বড় একটা কিছু হয়ে যেতেও পারে।”
তারাপদ বলল, “মানে তুই বলছিস, ধরণীমোহন স্বাভাবিকভাবেই মারা যেতে পারেন!”
“অবশ্যই পারেন। আমি তো তাঁকে দেখিনি, কেমন করে জানব তাঁর কী রোগ ছিল! যে-ডাক্তার দেখতেন ভদ্রলোককে, তিনি বলতে পারেন।”
কিকিরা বললেন, “সেটা আমরা খোঁজখবর করে জেনে নেব। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে, ধরণীবাবুর মারা-যাওয়াটা স্বাভাবিক নয়–এটা বলার কারণ কী? তাও আবার চালাকি করে কাগজে ছাপানোর ব্যবস্থা করা। এটা যদি শেখরই করে থাকে, কেন করেছে? শুধুমাত্র ধাপ্পা দিয়ে ব্ল্যাকমেল করা? আর মহিমচন্দ্ৰই বা ভয় পেয়ে টাকা জুগিয়ে যাচ্ছেন কেন?”
তারাপদ হেসে হিন্দি করে বলল, “ডালমে কুছ কালা হ্যায়।”
চন্দন কিকিরাকে জিজ্ঞেস করল, “শেখরটা কে কিকিরা?”
“ধরণীমোহনের ছোট ভাগ্নে।”
“ভাগ্নে! ছেলেটেলে নয়?”
“না। ধরণীমোহন বিয়ে-থা করেননি। তাঁর সন্তান থাকার কথা নয়। দুই ভাগ্নে ছিল। বড় ভাগ্নে চা বাগানে কাজকর্ম করে, ডুয়ার্সে। ছোট ভাগে শেখর। সে নাকি বরাবরই বদ ধরনের ছেলে। মামাকে অনেক জ্বালিয়েছে। মামার কাছে থাকতও না আজকাল। আলাদা থাকত, সিঁথির দিকে। কী করত কেউ জানে না।”
“এখন সে কোথায় থাকে?”
“মহিমচন্দ্র তা বলতে পারলেন না। বললেন, খোঁজ করে বলতে হবে।”
“মহিমচন্দ্রের বয়স কত?”
“প্রায় পঞ্চাশ-টঞ্চাশ।”
“শেখরের?”
“তিরিশ বত্রিশ শুনলাম। মহিম বললেন।”
“ধরণীমোহনের বয়স কত ছিল?”
কিকিরা সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। খেয়াল হওয়ার পর বললেন, “মহিমচন্দ্রের চেয়ে বড় ছিলেন। উনি যখন মারা যান, তখন ওঁর বয়স আটান্ন-ঊনষাট।”
তারাপদ বলল, “চাঁদু, কিকিরাকে আমি বলছিলাম, মহিমচন্দ্র ছেলেমানুষ নন, বোকও নন, তিনি ব্যবসাদার মানুষ। শেখর তাঁকে ধাক্কা মেরে এক বছর ধরে টাকা নিচ্ছে, আর ভদ্রলোক পুলিশের কাছে যেতে পারছেন না! কারণটা কী? নিশ্চয়ই তাঁর কোনো গোলমাল আছে ভেতরে। নয় কি?”
চন্দন বলল, “আমারও তাই মনে হয়।” বলে কিকিরার দিকে তাকাল। “আচ্ছা কিকিরা, শেখর নাহয় অন্য লোক মারফত টাকা নেয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার আগে সে মহিমচন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেমন করে?”
“ফোনে।”
“ফোনে! কোত্থেকে ফোন করে?”
“যে-কোনো জায়গা থেকে। ফোন করার অসুবিধে কোথায়? পাবলিক ফোন আছে, দোকান আছে।”
“নিজের নাম বলে?”
“বলে। “
“কোথায় টাকা দিতে হবে, কাকে দিতে হবে, তাও বলে?”
“বলে। একই লোককে একবারের বেশি দুবার টাকা নিতে পাঠায় না।”
“যে টাকা নিতে আসে, তাকে মহিমচন্দ্ৰ চেনেন কেমন করে? শেখর কি কোনো চিঠি লিখে দেয়?”
“তুমি পাগল হয়েছ! চিঠি লিখে দেবে! শেখর একটা সাঁটের কথা, মানে চিহ্নের কথা বলে দেয়। যেমন হয়ত বলল, যে নিতে যাবে তার চোখের চশমার ফ্রেমটা হবে সোনালি, বা হয়ত বলল, অমুক লোকটার পকেটের রুমাল হবে খয়েরি, গলায় কালো টাই থাকবে, এইরকম আর কি।”
তারাপদ বলল, “এত জেনেও মহিমচন্দ্র পুলিশকে খবর দিচ্ছেন না। মানে, তিনি পুলিশ ডেকে ব্যাপারটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভয় পাচ্ছেন! তাঁর এই ভয় দেখেই মনে হয়, ভদ্রলোক কোনো গুরুতর ব্যাপার চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাপকর্ম করলে তো ভয় থাকবেই।”
