“হ্যাঁ।“
“কে করেছে? মানে কে ব্ল্যাকমেল করেছে?”
“শেখর গুহ বলে একটা লোক। মহিমচন্দ্র সেইরকম বলেন!”
“মানে? বলেন মানে! ব্ল্যাকমেল করে যে টাকা নিচ্ছে, তাকে মহিমচন্দ্র ধরতে পারেন না? টাকা দিচ্ছেন, অথচ! আমার মাথায় ঢুকছে না, কিকিরা।”
কিকিরা চুরুট টানলেন বারকয়েক। পরে বললেন, “শেখর গুহ লোকটাকে ভালই চেনেন মহিমচন্দ্র। হাড়ে-হাড়ে চেনেন। কিন্তু টাকা নেওয়ার সময় সে লোক-মারফত নিচ্ছে। নিজে হাজির থাকছে না। মহিমচন্দ্র তাই বললেন।”
“অদ্ভুত ব্যাপার তো!”
“আরও অদ্ভুত ব্যাপার আছে, তারা। ওই যে কাগজে যেটা পড়ল, সেটা কিন্তু মহিমচন্দ্র বা রাহা ব্রাদার্সের কর্মীদের কেউ ছাপতে দেয়নি।
তারাপদ যেন কেমন বোকা হয়ে গেল। কাগজে একটা স্মৃতিশ্রদ্ধার বিজ্ঞপ্তি ছাপা হল, অথচ যাদের নাম রয়েছে, তারা কেউ সেটা ছাপতে দেয়নি, এ কেমন করে হয়!
অবিশ্বাসের গলা করে তারাপদ বলল, “কী বলছেন আপনি?”
“আমি বলিনি, মহিমচন্দ্র বলছেন।”
“তিনি বলেন কেমন করে? ভূতে গিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে এল কাগজে?”
“মহিমচন্দ্র বলছেন, তিনি কাগজের অফিসে খোঁজ করেছেন লোক পাঠিয়ে। কাগজওয়ালারা বলেছে, একজন এসে নগদ টাকা দিয়ে ওটা ছাপতে দিয়ে গিয়েছিল। ওই বিজ্ঞপ্তিটায় আপত্তিকর তো কিছু নেই। বরং এসব ব্যক্তিগত বিজ্ঞপ্তির একটা সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু আছে। কাগজওয়ালারা ছেপেছে। বিজ্ঞপ্তি যে দিয়ে গিয়েছিল, তার নাম-ঠিকানাও খাতা আর রসিদ বইয়ের ডুপ্লিকেট দেখে দিয়ে দিয়েছে কাগজের অফিস।”
তারাপদ বলল, “কে দিয়েছিল?”
“যেই দিক, নামটা আসল নয়, নকল। ঠিকানাও ফলস। মহিমচন্দ্র খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, ওই ঠিকানা আর নাম দুটোই মিথ্যে।”
তারাপদ কোনো কথা বলল না। তার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। সবই কেমন গোলমেলে।
খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর তারাপদ বলল, “স্যার, কাগজে ঘটা করে ওই শোক জানানোর কী মানে? যারা জানাবার তারাই যখন জানাল না, বাইরের লোক লুকিয়ে তা জানাতে যাবে কেন?”
কিকিরা বললেন, “কেন তা বুঝতে পারলে না?”
“না।”
“মাথায় কী আছে হে!”
“গোবর।”
তামাশায় কান দিলেন না কিকিরা। “আমার মনে হয়,” উনি বললেন, “ওটা নিতান্ত বাৎসরিক শ্রদ্ধাশোক জানানো নয় হে, চালাকি করে একটা সন্দেহ জানিয়ে দেওয়া।”
“সন্দেহ!”
“হ্যাঁ, ওই যে লিখেছে মৃত্যু রহস্যের কোনো হদিস হল না! লিখেছে না?”
তারাপদর খেয়াল হল। “হ্যাঁ, লিখেছে।”
“তার মানে মহিমচন্দ্রদের ভয় দেখানো যে : বাপু, ধরণীমোহনের মারা যাওয়ার ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়, সেটা ভুলে যেয়ো না।” কিকিরা একটু থামলেন। আবার বললেন, “ওটা যে ছাপাবার ব্যবস্থা করেছে সে খুব বুদ্ধিমান, পাকা লোক। জানাচ্ছে শোক, কিন্তু তলায়-তলায় সন্দেহ বেশ পাকাপাকিভাবে জানিয়ে দিচ্ছে। একেবারে “পাবলিক করে দিয়েছে হে তারাপদ। মহিমচন্দ্র বা রাহা ব্রাদার্সের লোকরা শুধু নয়, যে দেখবে সেই অবাক হবে, ভাববে, ধরণীমোহনের মৃত্যুর রহস্যটা তা হলে, এমন কী যে, হদিস হল না।”
তারাপদ বুঝতে পারল মোটামুটি।
“মহিমচন্দ্ৰ বুঝি এইজন্য এসেছিলেন?” তারাপদ বলল।
“হ্যাঁ। তিনি এসেছিলেন এই কথা বলতে যে, ধরণীমোহন আচমকা মারা গেলেও সেটা যে স্বাভাবিক মৃত্যু নয়–সেই কথাটা জানিয়ে দেওয়ার জন্যে ওই লেখাগুলো ছাপানো হয়েছে। তার ফল হয়েছে এই যে, অনেকের ব্যাপারটা নজরে পড়েছে। কেউ-কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করছেন। মহিমচন্দ্র নিজেও ভীষণ অস্বস্তির মধ্যে পড়েছেন। তিনি কিছু জানালেন না, অথচ তাঁর আর রাহা। ব্রাদার্সের কর্মীদের নাম করে এইরকম একটা জিনিস ছাপিয়ে দেওয়া হল!”
তারাপদ বলল, “উনি কাকে সন্দেহ করছেন? মানে, কে এমন কাজ করতে পারে বলে ওঁর মনে হয়।”
“শেখর গুহ। “
“ও! শেখর গুহ ব্ল্যাকমেল করে টাকা নেয়, আবার কাগজে নোটিস ছাপিয়ে ভয়ও দেখায়।”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“ভয় না দেখালে মহিমচন্দ্রের কাছ থেকে টাকা পাওয়া যাবে না।”
“টাকা তো পাচ্ছে।”
“এ-পর্যন্ত পেয়েছে। কিন্তু আর যদি না পায়! ভয়টা মহিমের মনে সবসময় জাগিয়ে রাখতে পারলে টাকা পাওয়া যাবে।…আমার তাই মনে হয়।”
“শেখর যে টাকা চায়, কেমন করে চায়?”
“কীভাবে চায় বলছ? মহিমাচন্দ্রকে ফোন করে টাকা চায়। নিজে টাকা নিতে যায় না, অন্য কাউকে পাঠিয়ে দেয়।”
“স্যার, মহিমচন্দ্র কী ধরনের মানুষ? তিনি একটা লোককে এইভাবে টাকা দিয়ে যাচ্ছেন কেন? কেনই বা পুলিশকে জানাচ্ছেন না।”
কিকিরা বললেন, “সেটাই তো কথা তারাপদ, মহিমচন্দ্র কী ধরনের মানুষ! তাঁর অত ভয়ই বা কিসের? কাকেই বা ভয়!”
.
০২.
চন্দন খানিকটা দেরি করে এলেও তারাপদ তাকে আরাম করে বসতেও দিল না। তার আগেই মহিমচন্দ্র-সংবাদ শুনিয়ে দিল। পড়তে দিল কাগজটাও।
চন্দন এমনিতে শান্ত ভদ্র ছেলে, স্বভাবে একেবারেই রুক্ষ নয়; কিন্তু আজ রাস্তায় একটা লোকের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেল তুচ্ছ কারণে। দোষ চন্দনের নয়। এক-একজন থাকে যারা খানিকটা তেরিয়া গোছের। সামান্যতেই চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। সেইরকম এক লোকের সঙ্গে বৃথা ঝগড়া করে চন্দনের মেজাজ খারাপ হয়েছিল। মহিমচন্দ্রের ব্যাপারটা ও মন দিয়ে শুনল না।
চা খাওয়ার পর্ব মিটে যাওয়ার পর চন্দনের যেন খেয়াল হল। হঠাৎ বলল, “কিসের ব্ল্যাকমেল?”
