ইশারায় তারাপদকে এগোতে বলে বগলা সদরের দিকে চলে গেল।
তারাপদ কিকিরার বসার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বার-দুই কাশল। মানে সাড়া দিল। তারপর পা বাড়াল।
ঘরে ঢুকে তারাপদ অবাক! কিকিরা একা। তাঁর সেই রাজসিংহাসনে বসে আছেন জোব্বা চাপিয়ে। হাতে একটা কাচের গ্লাস। গ্লাসটা তাঁর মুখের সামনে।
যেন আকাশ থেকে পড়েছে তারাপদ, অবাক হয়ে বলল, “এ কী! আপনি একা। আমি ভাবলাম কারও সঙ্গে কথা বলছেন! বগলাদাও আমাকে আচ্ছা জব্দ করল তো।”
কিকিরা হাসলেন।
“আপনি কি যাত্রা থিয়েটার করছিলেন, স্যার?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “না হে তারাবাবু, প্র্যাকটিস করছিলাম। সব ভুলে যাচ্ছি। চচা না থাকলে কি আর পারা যায়!”
“কিসের চর্চা করছিলেন?”
“ভেনট্রো…।”
“ভেনট্রো! সে আবার কোন পদার্থ?”
“ভেট্রিলোকুইজম। শর্ট করে ভেট্রো। আজকাল তো তোমাদের সবই শর্ট। ক্যালি, ফ্যান্টা, কত কী?”
তারাপদ রগড় করে বলল, “তা হঠাৎ এই দু-নম্বরি গলা করার চেষ্টা কেন, স্যার? আপনার গলা তো বেশ ভাল! রামপ্রসাদী থেকে নিধুবাবু–সবই গাইতে পারেন।”
কিকিরা হাতের গ্লাসটা জোব্বার পকেটে ঢুকিয়ে অন্য একটা ছোট মোটা গ্লাস আরেক পকেট থেকে বের করে নিলেন। নিয়ে মুখের সামনে ধরলেন। দু-চারবার চেষ্টা করার পর অন্যরকম এক গলা শোনা গেল। শোনা গেল কে যেন বলছে, “তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক টাকার। যখন চাইব তখনি তোমায়। দিতে হবে। না দিলে কী হবে–তুমি ভাল করেই জানো।”
তারাপদ বুঝতে পারল, কিকিরা চেষ্টা করেও পুরোপুরি গলার স্বর পালটাতে পারছেন না। সেটাই স্বাভাবিক। অনভ্যাসে এরকমই হওয়ার কথা। তারাপদ হাসিমুখে বলল, “স্যার, আপনি কি কাউকে ব্ল্যাকমেল করবেন ঠিক করেছেন?”
কিকিরা মুখের সামনে থেকে কাচের গ্লাস সরিয়ে নিলেন। বললেন, “তারা, সেই ভুজঙ্গ কাপালিকের কথা মনে আছে! সেঁয়াশ! ভুজঙ্গ একেবারে এক্সপার্ট ছিল এ ব্যাপারে। আমি ঠিক পারছি না। অভ্যেস নেই।”
“ও, এক্সপার্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন নাকি?”
“ওই একটু-আধটু।” কিকিরা গ্লাস রেখে দিলেন। বললেন, “ওই–ওই যে–ওখানে বুকসেফের মাথায় একটা ভাঁজকরা খবরের কাগজ রয়েছে, ওটা নিয়ে এসো।”
তারাপদ কিছুই বুঝল না, তবু এগিয়ে গিয়ে খবরের কাগজটা নিয়ে এল।
“বোসো,” কিকিরা বললেন, “পাতা ওলটাতে হবে না। ওই পাতাতেই দাগ দেওয়া আছে একটা জায়গায়। সেটা পড়ো।”
তারাপদ বসল। কাগজে দাগ দেওয়া জায়গাটাও দেখতে পেল। খানিকটা জায়গা জুড়ে বড়বড় অক্ষরে কিসের যেন বিজ্ঞপ্তি। পড়তে গিয়ে বুঝল, ঠিক বিজ্ঞপ্তি নয়, শোকপ্রকাশ। অর্থাৎ কেউ মারা গিয়েছিল, তার স্মৃতির উদ্দেশে মৃতের ঘনিষ্ঠজন শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। কাগজে আজকাল হামেশাই এসব দেখা যায়। তবে বেশির ভাগ সময়েই তার আকারটা হয় ছোট। এটা সে-তুলনায় বড়।
কিকিরা বললেন, “পড়লে?”
“পড়লাম।”
“আবার পড়ো। জোরে-জোরে। “
তারাপদ পড়ল : “আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় মেজোবাবু ও রাহা ব্রাদার্সের অন্যতম মালিক ধরণীমোহন সেন গতবছর (পয়লা ফাল্গুন) ঠিক আজকের দিনটিতে–অকস্মাৎ আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর মৃত্যুদিনটি আমাদের পক্ষে মহা শোকের দিন। ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর মানুষের হাত নেই। তবু, দুঃখ হয় এই ভেবে যে, মেজোবাবুর মৃত্যু বড় রহস্যময়। এই রহস্যের কোনো হদিস আজ পর্যন্ত করা গেল না। মেজোবাবুর মৃত্যুদিনে তাঁর আত্মার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানাই। মহিমচন্দ্র রাহা ও রাহা ব্রাদার্সের কর্মিবৃন্দ। ১ ফাল্গুন, ১৩৯৯। “
পড়া শেষ করে তারাপদ কিকিরার দিকে তাকাল।
কিকিরা সামান্য চুপচাপ থাকার পর বললেন, “কী মনে হল?”
“এটা কবেকার কাগজ?”
“গত হপ্তার। আজ ফাল্গুন মাসের আট তারিখ।”
“আপনি নিজে…।”
“না না, আমি মোটামুটি সবই দেখি; তবে ওই কাগজটা আমায় মহিমচন্দ্র রাহা দিয়ে গিয়েছেন।”
“মহিমচন্দ্র?”
“হ্যাঁ। নিজের হাতে দিয়ে গিয়েছেন।”
“আপনার চেনা?”
“না। আমার এক বন্ধুর মুখে আমার কথা শুনে দেখা করতে এসেছিলেন।”
“কবে?”
“আজই। তুমি আসার খানিকটা আগে চলে গেলেন।”
তারাপদ অন্যমনস্কভাবে হাতের ঘড়িটা দেখল। এখন সোয়া ছয়। ফাল্গুন মাস বলে এখনো আলো আছে। তবে ম্লান হয়ে এসেছে। মহিমচন্দ্ৰ হয়ত, সাড়ে পাঁচটা নাগাদ চলে গেছেন। তারাপদ খানিকটা আগে এলে ভদ্রলোককে দেখতে পেত।
তারাপদ বলল, “মহিমচন্দ্র কি আপনার নতুন ক্লায়েন্ট?”
“আমার নয়, আমাদের।”
“কেটিসি এজেন্সির?” তারাপদ হাসল।
কিকিরাও তামাশা করে বললেন, “এজেন্সি নয়, সার্ভিস। কেটিসি সার্ভিস। সার্ভিসের মধ্যে একটা সামাজিক কর্তব্যের ভাব আছে বুঝলে না!” বলে তিনি জামার নানা পকেট হাতড়ে নিজের চুরুট আর দেশলাই বের করলেন। “সোশ্যাল ব্যাপার তারাবাবু।”
তারাপদ ঠাট্টার গলায় বলল, “স্যার, এবার থেকে আপনার সোশ্যাল মক্কেলদের কাছ থেকে একটা এগ্রিমেন্ট সই করিয়ে নেবেন। আর অ্যাডভান্স পেমেন্ট নিয়ে নেবেন–হাজার পাঁচেক। সোশ্যাল ডোনেশান। নয়ত সার্ভিস চালু রাখা যাবে না।”
চুরুট ধরাতে ধরাতে কিকিরা বললেন, “হবে, হয়ে যাবে তারাবাবু। মহিমচন্দ্র গত এক বছরে হাজার চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা দান করেছেন। অবশ্য দান নয়, অনুদান। বা বলতে পারো, তাঁকে ব্ল্যাকমেল করা হয়েছে।”
তারাপদ যেন চমকে উঠল। টাকার অঙ্কটা মগজে গোলমাল পাকিয়ে ফেলছিল। গলার স্বর আটকে যাচ্ছিল। “চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা!”
