“তা হয়।”
“কিংবা দাদা সেদিন ওই ঘরেই বসে থাকবে আমার জন্যে এমন একটা ব্যবস্থা করেছিল।”
কিকিরা বললেন, “ঘরে ঢুকে আপনি নটুমহারাজকে দেখতে পেলেন না?”
“না। অন্য এক ভদ্রলোককে দেখলাম। আমি চিনি না। খালি গায়ে বসে নকশা কাগজপত্র দেখছিলেন। আমাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। আমি কে, কেন এসেছি জিজ্ঞেস করলেন। পালিয়ে আসতে পারছিলাম না। কাজেই মিথ্যে পরিচয় দিয়ে এ-কথা সেকথা বলছিলাম।”
“কী পরিচয় দিলেন?”
“যা মুখে এল তখন।… ততক্ষণে আমি বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম ইনিই সেই হোটেলওয়ালা, এখানে ভাড়া রয়েছেন। কাজেই কথা ঘোরাতে দেরি হল না।”
“এর পর কী হল আমি বলব?” তারাপদ বলল।
“বলুন।”
“আপনি যখন উঠে পড়েছেন চেয়ার ছেড়ে ফিরে আসার জন্যে”
“উনিও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, সহদেব বলল, “এমন সময় একটা কী হয়ে গেল। একটা তীর এসে তাঁর হাতের কাছে লাগল। উনি যন্ত্রণায় শব্দ করে– জায়গাটা হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। চেপে ধরে ঘষতে লাগলেন। তারপরই দেখি ভদ্রলোক টলছেন। আমি ভয় পেয়ে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। পালিয়ে গেলাম। পালিয়ে যাওয়ার সময় মনে হল উনি টলতে টলতে মাটিতে পড়ে গেলেন।”
লালাবাবু বললেন, “কী সর্বনাশ! কে তীর মারল?”
কিকিরা বললেন, “নটুমহারাজ। নটুমহারাজ তীরন্দাজ লোক। অবশ্য উনি যাকে মারতে গিয়েছিলেন সে-মানুষ রত্নেশ্বর নয়, সহদেব। পেছনের জানলা দিয়ে তীর ছোঁড়ার সময়, রত্নেশ্বর হঠাৎ উঠে পড়ায়, লক্ষ্য ভুল হয়ে যায়, রত্নেশ্বরের হাতে লাগে।”
“আমি তখন কিছুই আর দেখিনি, পালিয়ে এসেছি,” সহদেব বলল।
লালাবাবু বললেন, “তীরে বিষ ছিল?”
“অবশ্যই”, চন্দন বলল, “তীরের মুখে ভাল মতন বিষ ছিল, মারাত্নক বিষ, নয়ত এমন হয় না।”
“কী বিষ?” কিকিরা বললেন।
সহদেব নিজের থেকেই বলল, “আমি কমবিস্তর বিষের কথা জানি। কেননা, যারা বিষ খোঁজে, ল্যাবরেটারিতে কলেজের রিসার্চের কাজে, আমি বিষ-অলাদের কাছে নিয়ে যাই বা পাঠিয়ে দিই। একটা বিষ আছে সাধারণত বালির দেশে পাওয়া যায়। রাজপুতানায় পাওয়া যায় এটা আসলে সাপের বিষ নয়, বিছে ধরনের সাপের বিষ। Echis Carinatus গোত্রের এক ভাইপারের বিষের মতন। ভয়ঙ্কর বিষ। ভয়ঙ্কর। সিংভূমের নদী-পাহাড়েও এই বিছে সাপ পাওয়া যায়। বিষটা দু-চার মাসেও নষ্ট হয় না। রাখার নিয়ম আছে। এই বিষ শরীরের রক্তের পক্ষে ভীষণ খারাপ।”
চন্দন অবাক হয়ে সহদেবের দিকে তাকিয়ে থাকল।
একেবারে চুপচাপ সবাই। কেউ আর কথা বলতে পারছে না।
শেষে কিকিরা বললেন, “সহদেববাবু, নটুমহারাজের তো কেউ নেই। তবু উনি এমন লোভী হবেন কেন? অর্থ, অলঙ্কার, সম্পত্তি…?”
সহদেব বলল, “একসময় দাদার সব ছিল, এখন নেই। আর লোভ মশাই আগুনের মতন, জ্বলতে শুরু করলে নিভতে চায় না। পুরাণে কী দেখেছেন? মহাভারতের কথাই ধরুন, দুর্যোধনের লোভ কি শেষদিন পর্যন্ত মিটেছিল! আপনাদের নটুমহারাজ যক্ষ হয়ে বেঁচে আছে। যক্ষ হয়েই মরবে।”
তারাপদ বলল, “মানুষ বড় অদ্ভূত হয়।”
কিকিরা বললেন, “তারাপদ, নটুমহারাজ চালাকি করে সহদেবকে খুনের আসামি করতে চেয়েছিলেন। উটকো লোক, চার আঙুলঅলা একটা গ্লাভস, হলুদ পালক দেওয়া তীর। কোনোটাই ধোপে টিকল না। উটকো লোক সহদেব আমাদের চোখের সামনে; চার আঙুলের দস্তানাটাও ধোঁকাবাজি। সহদেবের যে আঙুল নেই, দস্তানায় তার ভুল হয়েছে। সহদেবের নেই মধ্যমা, দস্তাদায় অনামিকার আঙুলটা ছিল না। নটু চালে ভুল করেছেন। আর তীরগুলো বসার ঘরে থাকার কোনো কারণই ছিল না। উনি পরে সেগুলো সাজিয়ে রেখেছেন।”
“কেমন করে জানলেন?”
“আমি দেওয়ালের পেরেক দেখেছি। ওগুলো, হুক-পেরেকগুলো বরাবর ছিল না। নতুন করে গাঁথা হয়েছিল। পেরেকগুলোর রং চকচক করছিল।”
লালাবাবু কিছু বলার আগেই যজ্ঞেশ্বর লাফিয়ে উঠে বলল, “নটুকে পুলিশে দেব। এতবড় শয়তান, ভণ্ড লোক! মাডারার।”
কিকিরা বললেন, “লালাবাবু, আমরা সবাই সহদেবকে নিয়ে ঘাটশিলায় যাব। এই শনিবারেই।” বলে সহদেবের দিকে তাকালেন। “নটুমহারাজের চিঠিটা আপনি সঙ্গে রাখবেন সহদেববাবু।”
তারাপদ বলল, “স্যার, রবিবার করুন। শনিবারেও আমার অফিস রয়েছে।”
২.৫ তুরুপের শেষ তাস
০১.
কিকিরার গলা শোনা যাচ্ছিল। কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন। তারাপদ ভেতরে গেল না। দাঁড়িয়ে থাকল। বগলা কাছেই ছিল; ইশারায় ডাকল তাকে। নিচু গলায় বলল, “কে বগলাদা?”
বগলা দেখল তারাপদকে। কী বলতে যাচ্ছিল, থেমে গিয়ে গম্ভীর মুখ করে বলল, “জানি না।”
“নতুন লোক?”
“যাও না, ভেতরে গিয়ে দেখো।”
ভেতরে যাওয়া উচিত হবে কি না তারাপদ বুঝতে পারছিল না। কিকিরার এই ফ্ল্যাটে আড়াইটে কি তিনটে ঘর। বগলাদার সরু-মতন ঘরটাকে আধখানা ধরলে আড়াই, নয়ত তিন। কিকিরার দুটো ঘর। একটা তাঁর শোওয়ার ঘর, অন্যটা বসার–মানে কিকিরা-মিউজিয়াম। বাকি যা থাকল তা রান্নাঘর আর বাথরুম।
তারাপদ হালকাভাবে বলল, “বগলাদা, তোমার কতাবাবুকে বলো না একটা অফিসঘর করতে। এ ভাবে চলে না। আমরা এসে দাঁড়িয়ে থাকব!”
বগলা বলল, “দাঁড়াবে কেন, চলে যাও ভেতরে। তোমাদের তো ফ্রি পাস।”
“ফ্রি পাস’ কথাটা শুনে তারাপদ হেসে ফেলল।
বগলার এখন দাঁড়াবার সময় নেই। হাতে একটা প্লাস্টিকের বালতি ব্যাগ, কিছু কেনাকাটা করতে বাইরে যাবে।
