চন্দন বলল, “আর না, চলুন।”
বাইরের ঘরে এসে চন্দন বলল, “উনি বোধ হয় এই অবস্থাতেও আপনাকে আন্দাজ করতে পারছিলেন সহদেববাবু, উত্তেজিত হয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন…।”
সহদেব কিছুই বলল না। তাকে বড় হতাশ, বিমর্ষ দেখাচ্ছিল।
হরিশ মুখার্জির বাড়ির বসার ঘরে সকলেই রয়েছে তখন। আলো জ্বলছে। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর সহদেব বলল, “দেখুন, আমার যা বলার, বলব। আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। মিথ্যে কথা বলে আমার লাভ নেই। আমি খুন করিনি।”
একটু থেমে আবার বলল সহদেব, “গোড়া থেকেই সব বলি আপনাদের। তবে আগাগোড়া সব কথা কি বলা যাবে। আপনারা বুঝে নেবেন।
“আমার আর আমার দাদার সম্পর্ক রক্তের নয়। আমার দাদা পালিত পুত্র। আমি মা বাবার একমাত্র সন্তান। মা-বাবার কোনো সন্তান ছিল না বলে একসময় দাদাকে ওঁরা পালিত পুত্র হিসেবে নিয়েছিলেন। আট বছর পরে আমার জন্ম। আমি আসার পরও মা বাবা দাদাকে অনাদর, অবহেলা করেননি। বাড়ির বড় ছেলের মতনই সে থাকত।
“বাবা মারা যাওয়ার সময় দাদার বয়েস ছিল বাইকে আমার চোদ্দ। দাদা তখন থেকেই বেয়াড়া। মাঝে-মাঝেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেত। কোথায়-কোথায় ঘুরত, কী করত, কেউ জানে না। তবে দাদার টাকা-পয়সার ওপর টান ছিল, লোভ ছিল। মায়ের গয়নাগাটি সে চুরিচামারি করেছে। ধরাও পড়েছে। গ্রাহ্য করেনি।
“মা মারা গেলেন দাদার বয়েস যখন তিরিশ। আমি বাইশ বছরের। মা মারা যাওয়ার পর আমাদের মাথার ওপর আর কেউ থাকল না। দাদা হল মুরুব্বি। আমাদের বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে গোলমাল শুরু করে দিল দাদা। তার চেয়েও বড় কথা, ওই যে মহারাজ’ কথাটা, ওটা কথার কথা নয়। মুসলমান বাদশাদের আমলে মহারাজ মান সিংকে–আমাদের পূর্বপুরুষ সাহায্য করেছিলেন রসদ আর লোকজন দিয়ে। মান সিংয়ের দয়ায় আমরা বিস্তর জমিজায়গার জমিদারি পাই, সেইসঙ্গে পাই ওই উপাধি “রাখাওয়া রাজা’। রাখাওয়া শব্দটা পরে বাদ দিয়ে মহারাজই বলা হত। ওটা আমাদের বংশগত উপাধি। বংশের জ্যেষ্ঠ সন্তানই উপাধিটা ব্যবহার করতে পারবে–অন্য কেউ নয়। উপাধি যার, সে-ই বিষয়-সম্পত্তির বড় ভাগিদার, তার কথাই প্রজারা মানবে। তার অধিকার আর সুবিধে অনেক বেশি।
“দাদার সঙ্গে আমার গোলমাল শুরু হয়ে যায় তখন থেকেই। দাদা এত নীচ, ইতর যে, আমাকে পড়াশোনা শেষ করতে দেয়নি। নয়ত আমি পাটনা থেকে ল’ পাশ করতাম কবে!
“আইনসম্মতভাবে আমিই তো সব পাওয়ার যোগ্য। দাদা তো পালিত পুত্র। কিন্তু দাদা বছরের পর বছর আমাকে ধোঁকা দিয়েছে, আমাকে ঠকিয়েছে, আমাকে অন্যদের শত্রু করে তুলেছে। দুর্নাম রটিয়েছে আমার। এমনকি খুন করার চেষ্টাও করেছে। পারেনি।”
“শেষপর্যন্ত দাদা চালাকি করে আমাকে ডাকাতি আর রাহাজানি মামলায় ফাঁসাবার চেষ্টা করেছিল। হাত ফসকে আমি বেরিয়ে আসি।
“তখন থেকে আমি রুজি-রোজগারের চেষ্টায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। শেষপর্যন্ত কলকাতায় আমার ওই দোকান নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। আমার যে কী কষ্টে দিন কেটেছে, আপনারা জানেন না। এখনো আমি গরিব। আর আমার দাদা, যার ভিখিরি হওয়ার কথা, সে মহারাজ। আমার কী ভাগ্য!”
সহদেব চুপ করল। করে অন্যমনস্কভাবে পকেট থেকে সস্তা সিগারেট বার করে ধরাল।
অল্পক্ষণ চুপচাপ থাকার পর সহদেব কী বলতে যাচ্ছিল, কিকিরা বাধা দিয়ে বললেন, “নটুমহারাজের সঙ্গে আপনার সম্পত্তি আর টাকা পয়সা নিয়ে বিরোধ চলছিল?”
“চলছিল। তবে আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাস শেষে যখন শুনলাম–দাদা আমার মায়ের চিতার জমিও এক হোটেলঅলাকে বিক্রি করে দিয়েছে, তখন”।
“মায়ের চিতার জমি?”
“ওই জমিটাতে আমার মায়ের সৎকার করা হয়েছিল। ওটা আমাদের জমি।”
লালাবাবু বললেন, “কে বলল! ও জমি তো অন্য লোকের। আমি দলিল দেখেছি হালে। “
“আপনি জানেন না। দাদা বেনামি করে রেখেছে অনেক জমি। ওই জমি এক বিহারি বাবুর নামে বেনামি করা ছিল। মাঘ সিং।”
লালাবাবু অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ। ঠিক।”
কিকিরা বললেন, “আপনি কি ওই জমি…?”
সহদেব বলল, “দাদাকে আমি লিখলাম, তুমি একা সর্বস্ব লুট করে খাচ্ছ। আমি ভিখিরির মতন একপাশে পড়ে আছি। যদি তুমি আমাকে আমার প্রাপ্যর কিছু অন্তত না দাও, তবে এবার আমি তোমাকে ছাড়ব না। তোমাকে আমি সাবধান করে দিলাম।”
“তারপর?”
“দাদা দরাদরি করতে নামল।”
“চিঠি লিখে?”
“না, লোক মারফত।”
“কোন লোক?”
“গোকুল।”
“আমি সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নামলাম।”
“নটুমহারাজ রাজি হলেন?”
“হ্যাঁ। রাজি হবে না কেন? আমি তো আট-দশ লাখও চাইতে পারতাম। পারিবারিক গয়নাগাটিই কি কিছু কম আছে! তার ওপর জমি-জায়গা।”
কিকিরা বললেন, “আপনি কি সেদিন টাকা আনতে…?”
“টাকা আনতেই গিয়েছিলাম। এবার আর গোকুলের মুখের কথায় যাইনি। দাদাকে চিরকুট লিখে দিতে হয়েছিল। সেই চিরকুট আমার কাছে আছে।”
কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন।
তারাপদ বলল, “আপনাকে সেদিন টাকা আনতে যেতে বলেছিলেন নটুমহারাজ?”
“হ্যাঁ। লিখেছিল–ওই সময়ে দাদা একা বসার ঘরে থাকবে; অপেক্ষা করবে আমার।”
“কিন্তু ওই বাড়ি যে রত্নেশ্বরবাবুদের ভাড়া দেওয়া ছিল?”,০
“সে-খবরও পেয়েছিলাম। তবে বসার ঘরে দাদা থাকবে ধরে নিয়েছিলাম। এমন তো হয়, একটা ঘর দাদা নিজের জন্যে রেখে দিয়েছিল?”
