সহদেব এগিয়ে এল। তিরিক্ষে গলায় বলল, “আপনি কে মশাই? কে আপনি? কী বলছেন? আমি বিষ বিক্রি করি। এটা বিষ বেচার দোকান? কে বলেছে আপনাকে–?”
কিকিরা মুখ টিপে হাসলেন। “গোকুল। ঘাটশিলার গোকুল…।”
সহদেব চমকে উঠল। বিশ্বাস হল না। মাথা নেড়ে বলল, “গোকুল। গোকুল বলল! সে কেমন করে বলল! আমি তো বিষের কারবার করি না। কে আপনি?”
“আপনি বিষ বেচেন না?”
“না। আমি নিজে বেচি না।”
“আমি শুনলাম…”
“ভুল শুনেছেন। এখানে দু-একটা ওষুধের কোম্পানি আছে। তাদের যখন বিষধর সাপের দরকার হয়, বিষটিষের জন্যে–আমায় জানালে আমি আমার চেনাজানা সাপুড়েদের খবর দি। …বিষ বেচার লোকও আছে। অন্য। তারা বেআইনি কারবার করে না।”
“তা হলে এগুলো?”
“এগুলো মামুলি সাপ। …কলেজের কাজে ব্যাঙ, ইঁদুর, গিনিপিগ, পোকামাকড় দরকার হলে আমি অডার নিয়ে সাপ্লাই করি।”
“ও! তা হলে আপনি আপনার দাদাকে বিষ সাপ্লাই করেননি?”
“দাদা! কে দাদা?”
“নটুমহারাজ।”
সহদেব যেন কেমন হতভম্ব হয়ে গেল। সে বোধ হয় ভাবতেও পারেনি–নটুমহারাজের নাম তাকে শুনতে হবে! অবাক, বিহ্বল, নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকল সহদেব।
কিকিরাও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। শেষে বললেন, “তা হলে আপনাকে সত্যি কথাটা বলি সহদেববাবু। আমি হলাম “কেটিসি গোয়েন্দা এজেন্সির লোক। আমাদের কোম্পানির আরও দু’জন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা একটা মামলা হাতে নিয়েছি। তদন্ত করছি। ঘাটশিলায় রত্নেশ্বরবাবু বলে এক ভদ্রলোককে খুন করার চেষ্টা হয়েছিল। নটুমহারাজের বাড়িতে। আপনি খুনের দিন সেখানে হাজির ছিলেন। সন্ধেবেলায়। আপনাকে অনেকেই দেখেছে।”
সহদেব কেমন যেন হয়ে গেল। “আমি খুন করেছি? কী বলছেন আপনি?”
“করেননি?”
“না, না। ধর্মত বলছি, না। বিশ্বাস করুন।”
“নটুমহাজকে বিষ জুগিয়ে দিয়েছিল কে?”
“আমি জানি না। “
“সহদেববাবু, আপনার বাঁ হাতটা আমি দেখতে পাচ্ছি। চারটে আঙুল।”
সহদেব নিজের বাঁ হাত তুলল। দেখল। দেখাল কিকিরাকে। বলল, “একটা আঙুল বাদ দিতে হয়েছে অপারেশন করে। বিষাক্ত একটা বিছে কামড়েছিল।”
“রত্নেশ্বরবাবুর ঘটনাটা ঘটার পর ওই বাড়ির বাইরে একটা কমাশিয়াল গ্লাভস পাওয়া যায়। বাঁ হাতের। চারটে মাত্র আঙুল।’
সহদেব এবার বসে পড়ল চেয়ারে। মাথা তুলতেও পারছিল না।
কিকিরা দু মুহূর্তের জন্য বেরিয়ে গেলেন। ফিরে এলেন আবার। চন্দন আর তারাপদ ভেতরে এসে দাঁড়াল।
শেষপর্যন্ত মুখ তুলল সহদেব। তাকিয়ে থাকল। দেখল তারাপদদের। তারপর বলল, “আমি খুন করিনি। বিশ্বাস করুন। দাদাকেও আমি বিষ জুগিয়ে দিইনি।”
“কিন্তু আপনি সেদিন ও-বাড়িতে গিয়েছিলেন।”
“হ্যাঁ।
“কেন?”
“সে অনেক কথা।”
“কী কথা?”
“এভাবে বলা যায় না। আপনারা বুঝবেন না।”
“আপনি কতকাল আগে ঘাটশিলা ছেড়ে চলে এসেছেন?”
“অনেকদিন।”
“কেন?”
“আমায় থাকতে দেয়নি।”
“আপনি ডাকাতির মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন?”
“না। ডাকাতির মামলায় আমাকে জড়ানো হয়েছিল।”
“কে জড়িয়েছিল?”
“দাদা।”
“কেন?”
“বলেছি তো, অনেক কথা। …ওই ভদ্রলোক কেমন আছেন?”
“আপনি জানেন না?”
“খোঁজ নিয়েছিলাম। শুনেছিলাম, ওঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে।”
“উনি বেঁচে না-থাকার মতনই।”
“ইস! …কার মরার কথা, আর কে মরে?”
কিকিরা চন্দনের দিকে তাকালেন, তারপর সহদেবকে বললেন, “আপনি কি আমাদের সব কথা বলবেন?”
“বলব! এখন পারছি না। আমার মাথা ঝিমঝিম করছে।”
“জল খান। বসুন খানিকক্ষণ।”
সহদেব উঠে গিয়ে জল গড়িয়ে খেল। কিকিরার ইশারায় চন্দন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করে এগিয়ে দিল সহদেবকে।
সিগারেট ধরাল সহদেব। কিকিরাও একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলেন।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
হঠাৎ সহদেব বলল, “কার পাপ কে বয়! পাপ করল আমার দাদা, আর তার দায় পড়ল আমার ঘাড়ে। জগতে এমনই হয়।”
কিকিরা বললেন, “সহদেববাবু, আপনি আমাদের সঙ্গে যাবেন?”
“কোথায়? থানায়?”
“না, না, থানায় নয়। এই কাছেই। হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটে। যেখানে রত্নেশ্বরবাবু আছেন। তাঁকে দেখবেন একবার। আমার মনে হয় ওঁকে দেখলে হয়ত আপনি নিজের থেকেই সব কথা বলতে চাইবেন।”
কী যেন ভাবল সহদেব। বলল, “যেতে পারি। কিন্তু আপনারা যদি আমায় থানায় নিয়ে যান।”
“না, যাব না। বিশ্বাস করতে পারেন।”
“নিয়ে গেলে আমি কিছু বলব না। আপনারা একটা কথাও আমার মুখ থেকে জানতে পারবেন না।”
তারাপদ কিছু বলল কিকিরাকে। কিকিরা মাথা নাড়লেন। সহদেবকে বললেন, “আপনি চলুন। থানা থেকে আমার আসিনি। আপনাকে নিয়েও যাব না থানায়। আমাদের যা জানার, সেটা জানলেই খুশি হব।”
“বেশ, তবে চলুন। এখন ক’টা বেজেছে?”
“ছ’টা, সোয়া ছ’টা।”
“দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে ফিরতে পারব?”
“পারবেন না কেন?”
“তা হলে চলুন।”
.
১০.
ঘরে সকলেই ছিলেন : লালাবাবু, কিকিরা, যজ্ঞেশ্বর। ছিল তারাপদ আর চন্দন।
সামান্য আগে সহদেব গিয়েছিল রত্নেশ্বরের ঘরে। সঙ্গে ছিলেন লালাবাবু আর চন্দন।
রত্নেশ্বর ঘুমিয়ে পড়েননি। যেমন থাকেন–অর্ধচেতনার মধ্যে– হুঁশ আছে কিন্তু সাড়া নেই- সেইভাবেই শুয়ে ছিলেন।
সহদেবকে তিনি চিনতে পারুন না-পারুন, তাকিয়ে থাকলেন। চোখ সামান্য যেন চঞ্চল হল, চোখের পাতা পড়ল বার কয়েক পায়ের আঙুলগুলো কাঁপতে লাগল। হাতের আঙুল বেঁকাবার চেষ্টাও যেন করলেন, পারলেন না।
