চন্দন বলল, “তা হতে পারে। আমি খোঁজ করতে পারি। জুলজির লোকরা জানবে। ফিজিওলজির লোকরাও জানতে পারে।”
এমন সময় তারাপদ এল।
এসে বলল, “ভাল বৃষ্টি হচ্ছে, তবে এখনো রাস্তায় জল দাঁড়ায়নি। গাড়িঘোড়া চলছে। বৃষ্টিটা শুনলাম নর্থেই বেশি হয়েছে।”
কিকিরা বললেন, “তোমরা বসো, আমি তৈরি হয়ে নিই।”
তারাপদ বলল, “স্যার, আপনার সেই নাতি কুশি আসছে। মিনিবাসের কাশীর ভাই কুশি।”
“ওকে টাইম দেওয়া আছে। আসারই কথা।” কিকিরা বললেন।
.
হরিশ মুখার্জির বাড়ির বাইরের ঘরে বসে কিকিরা, তারাপদ আর যজ্ঞেশ্বর কথা বলছিলেন। যজ্ঞেশ্বরকে দেখলেই বোঝা যায়, নিরীহ ভিতু মানুষ। ব্যবসাদার বলে মনে হয় না, চোখেমুখে চালাকির চিহ্ন নেই, চটপটে স্বভাবেরও নয়। কথায়, বার্তায় বিনয়ী।
কোনোরকমে সময় কাটানোর মতন করে কথা হচ্ছিল। বৃষ্টি এখন নেই। তবে বাদলার ভাবটা এই প্রথম রাতেই বেশ ঘন হয়ে গিয়েছে।
আরও খানিকটা পরে চন্দন আর লালাবাবু ঘরে এলেন।
কিকিরা তাকালেন।
চন্দন সামান্য গম্ভীর।
“কেমন দেখলে?” কিকিরা বললেন।
“একই রকম।… একটা ব্যাপার মনে হল, রত্নেশ্বরবাবুর চোখ যেন একেবারে ভ্যাকান্ট নয়। উনি কী বলব, বোধ হয় বুঝতে পারছেন মানুষজন।”
লালাবাবু বললেন, “পায়ের আঙুলগুলো আরও বেশি নাড়াচ্ছে।”
কিকিরা বললেন চন্দনকে। “তোমায় যা বলেছিলাম…!”
“দেখেছি। গায়ে পুরু করে পাউডার মাখানো রয়েছে। তবু আমার মনে হল, হাত, পিঠ, বুকে আঁচড়ানোর দাগ আছে।”
লালাবাবু বললেন, “প্রথমে আরও বেশি ছিল। রতনদা এমনিতেই একটু গা, বুক, হাত চুলকোত, মানে আঁচড়াত। তার ওপর ঘাটশিলার গরমে গায়ে ঘামাচি হয়েছিল, গলা, বুক, পিঠ ভরে গিয়েছিল। আমরা যখন প্রথমে নিয়ে এলাম সারা গা আঁচড়ে আঁচড়ে দগদগে করে ফেলেছে। এখন তো আর হাত নাড়তে পারে না, অনবরত পাউডার দেওয়া হচ্ছে, পাখা চলছে।”
কিকিরা চন্দনকে বললেন, “কোথাও কোনো ক্ষত?”
চন্দন মাথা নাড়ল। বলল, “হ্যাঁ। আমার মনে হচ্ছে, ওঁর বাঁ দিকের হাতের ওপর কিছু ফুটেছিল, বা কেটে গিয়েছিল। জায়গাটা এখনো লালচে হয়ে আছে। সামান্য। ইরাপসান রয়েছে। কাটা জায়গায় চামড়া পড়েছে বটে নতুন, তবে চারপাশে হামের মতন ইরাপসান।”
কিকিরা শুনলেন। ভাবলেন কিছু। তারাপদকে বললেন, “তারাপদ, ঘাটশিলার বসার ঘরের পেছনের জানলাটা কোন দিকে ছিল? মানে, যে-চেয়ারে বসেছিলেন রত্নেশ্বরবাবু, তার কোন দিকে?”
“বাঁ দিকে।”
কিকিরা তখন আর কিছু বললেন না, ইশারা করলেন উঠে পড়ার।
বাইরে এসে কিকিরা বললেন, “একটা ট্যাক্সি ধরতে পারবে?”
“বাড়ি ফিরবেন তো?”
“হ্যাঁ, বাড়ি। তোমাদের নামিয়ে দিয়ে যাব।”
“চলুন বড় রাস্তায়, দেখি…।”
এখন আর বৃষ্টি নেই। সারা বিকেলের বৃষ্টিতে আবহাওয়া ভিজে, স্যাঁতসেঁতে। বাতাস কেমন ভারী হয়ে আছে, আর্দ্র।
চন্দন বলল, “কী ভাবছেন কিকিরা?”
“ভাবছি, নটুমহারাজের কথাই হয়ত সত্যি।… তবে যতক্ষণ না সহদেবকে দেখছি বলতে পারছি না জোর করে।”
“আপনি বলছেন, এটা খুনের ঘটনা?”
“খুনের চেষ্টা। অ্যাটেমপ্ট।”
“কে করেছে?”
“সেটাই রহস্য! কে করেছে? কেন? কী তার স্বার্থ?”
“মানে মোটিভ?”
“হ্যাঁ। রত্নেশ্বরকে কে খুন করার চেষ্টা করবে? কেনই বা করবে!… শোনো চাঁদু, কাল আমি যেমন করে তোক সহদেবকে খুঁজে বার করব। তোমাদের পাব কখন?”
“বিকেলে।”
“একটু তাড়াতাড়ি করবে। নিমতলার দিকে গলিঘুজি খুঁজে বার করা। কষ্টের। তার ওপর যদি বৃষ্টিবাদলা হয়..।”
তারাপদ বলল, “অফিসে ওদিককার লোক আছে। শেতল সরকার লেনের খোঁজটা নিয়ে নেব আমি।”
“ভালই হবে। কাল চারটে সওয়া চারটে নাগাদ..”
“স্যার, আমার অফিস!”
“ছুটি নিয়ে নিয়ে ঘণ্টাখানেক আগে। বোলো, কিকিরাকে নিমতলায় নিয়ে যেতে হবে।”
চন্দন হেসে ফেলল।
তারাপদ পালটা ঠাট্টা করে বলল, “নিয়ে যাচ্ছি বলতে পারব না, স্যার; বলব– যেতে হবে আমাদের।”
.
০৯.
একপাশে, ঘুপচি মতন একটা জায়গায় বসে সহদেব কী যেন করছিল। পায়ের শব্দে মুখ তুলল।
কিকিরা সহদেবকে দেখছিলেন। লখিন্দরের কাছে যেমন বর্ণনা শুনেছিলেন, চেহারায় তার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। লখিন্দর খানিকটা বাড়িয়ে বলেছে, বা তার চোখ ভুল করেছে। সহদেব মাথায় অবশ্য খুবই লম্বা। কিন্তু তার চেহারা বিশাল নয়। গড়াপেটা, শক্ত। চেটালো হাড় হাতের। গায়ের রং কালো। মুখ ভোঁতা ধরনের। বড় বড় চোখ। মাথার চুল রুক্ষ।
“কী চাই?” সহদেব বলল।
কিকিরা চারপাশে তাকালেন। দোকানের মতনই সাজানো ঘর। একপাশে বড় অ্যাকুইরিয়ামে মাছ। আর একটা কাচের বাক্সে কিছু বিছে-পোকামাকড়। অন্যদিকে তারের জাল দেওয়া চৌকো খাঁচায় তিন-চারটে সাপ। বেজি গোছের একটা জন্তু কাঠের তাকের ওপর, যদিও মরা।
“কী চাই?”
“আপনিই সহদেববাবু!”
“হ্যাঁ।”
“এই যে দোকানটা বাইরে লেখা আছে “রেপটাইল এম্পোরিয়াম’–এটা আপনারই দোকান তো?”
“হ্যাঁ। তবে এটা মুদি-মশলার দোকান নয়, শাড়ির এম্পোরিয়াম নয়। এখানে অন্য ব্যাপার..”
হাসলেন কিকিরা। “জানি। আমি একটা জরুরি দরকারে এসেছি।”
“কী দরকার?”
“আমার একটু বিষ দরকার। ধরুন দশ মিলিগ্রাম বা এক চামচ।”
“বিষ।” সহদেব থতমত খেয়ে গেল। অবাক হয়ে দেখছিল কিকিরাকে। লোকটা বলে কী?
“এই ধরুন পাঁচশো টাকা পর্যন্ত দিতে পারি।”
