তারাপদ কিছুই বলল না।
তীর রাখা বোর্ডটা দেওয়ালে জায়গামতন ঝুলিয়ে রাখলেন কিকিরা। রাখার সময় দেওয়ালে হুক-পেরেকগুলো দেখলেন নজর করে। একটু যেন হাসলেন। বোর্ড রেখে ঘরের চারপাশে ঘুরে বেড়ালেন অন্যমনস্কভাবে।
“তারা, এই টেবিলে রত্নেশ্বর বসেছিলেন। তাই না!”
“হ্যাঁ।”
“তাঁর পিঠের দিকের জানলা খোলা ছিল নিশ্চয়। গরমের দিন। জানলা বন্ধ করে কেউ কি বসে?”
“না। মনে হয় না।”
“জানলার ওপাশে বাতাবিলেবুর গাছ। কত বড়। তাই না?
“হ্যাঁ।”
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “নটুমহারাজকে কি কলকাতায় নিয়ে যাওয়া যাবে? গেলে ভাল হত।”
তারাপদ বলল, “বলে দেখুন। “
.
০৮.
কলকাতায় ফিরে এসে চন্দনকে পাওয়া গেল। দিন দুই হল ফিরে এসেছে ও।
চন্দনের মেডিকাল মেসে এসে তারাপদ বলল, “ফিরে এসেছিস! বাঁচা গেল। তোর জন্যে ছুটতে ছুটতে এলাম।”
“তোরা কবে ফিরেছিস?”
“কাল।… আজ বিকেলে তোর ডাক পড়েছে। কিকিরা ওয়েট করছেন। … শোন, আমি এখন অফিসে যাচ্ছি। ক’দিন কামাই হয়ে গেল। বিকেলে আমি কিকিরার কাছে চলে যাব স্ট্রেট। তুই ওখানে চলে যাস।”
চন্দনের তাড়া ছিল। হাসপাতালে যেতে হবে। দেরি হয়ে গিয়েছে। খানিকটা। বলল, “আমি ফিরে এসেই খোঁজ করেছি। বগলাদা বলল, তোরা ফিরিসনি। এমনিতেই আজ আর-একবার খোঁজ করতে যেতাম। তা ব্যাপার কেমন দেখলি?”
“গোলমেলে। অনেক কথা। এখন আর সময় নেই। আমি চলি। তুই কিকিরার কাছে গেলেই শুনতে পাবি। চলি।”
তারাপদ আর দাঁড়াল না।
.
বিকেলে চন্দন যথারীতি কিকিরার কাছে হাজির। কলকাতাতেও বর্ষা নেমে গিয়েছে পাকাপাকিভাবে। রোজই দু-চার পশলা বৃষ্টি হচ্ছে।
বৃষ্টির মধ্যেই চন্দন এল। অল্পসল্প ভিজেছে। হাতের ছাতায় বৃষ্টির ছাট আটকায়নি।
কিকিরা একটা শুকনো তোয়ালে এগিয়ে দিলেন। “এসো, চাঁদু। নাও মুখ-হাত মুছে নাও। আমি তোমার অপেক্ষাতেই বসে আছি।”
হাত মুখ মুছে বসল চন্দন। বলল, “কেমন কাটল ঘাটশিলায়ক” বলে হাসল একটু।“মানে কী দেখলেন।”
“বসো আগে। চা খাও। বলছি।”
“তারা বলছিল, গোলমেলে ব্যাপার।”
“গোলমেলে তো হবেই। জগৎ সংসারে কোন্টা সোজা, বাবা? এই যে আমাদের চোখ, নাক, কান এগুলোই কি কম গোলমেলে! বাইরেটা সোজা, ভেতরটা জটিল। তুমি ডাক্তার, কত গোলমেলে অসুখ নিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যায় তোমাদের। তাই না?”
চন্দন হেসে বলল, “আপনাদের কথা বলুন। বাড়ি গিয়েও আমার শান্তি হচ্ছিল না।”
“কেমন করে হবে বলো! আমরা হলাম তিন চাকার গাড়ি। দু’চাকায় চলতে গেলে টলে যাই।”
চন্দন জোরে হেসে উঠল।
কিকিরা মজা করে বললেন, “থ্রি হুইলার টেম্পু!”
ঘাটশিলার কথা শুরু করলেন কিকিরা। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। শব্দটা জোর নয়। জলো বাতাস আসছিল ঘরে। মন দিয়ে কিকিরার কথা শুনছিল চন্দন। মাঝে-মাঝে প্রশ্ন করছিল।
এরই মধ্যে চা এল।
চা খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরও খানিকক্ষণ কিকিরা চন্দনকে ঘাটশিলার ব্যাপারটা বোঝালেন। শেষে বললেন, “আজ তোমায় নিয়ে হরিশ মুখার্জিতে যাব। তারা আসুক। এলেই বেরিয়ে পড়ব।”
“আমি সেখানে গিয়ে—”
“রত্নেশ্বরবাবুকে ভাল করে দেখবে একবার। তাঁর অসুখের রিপোর্টগুলোও পড়বে।”
“স্যার, এটা কি ভাল হবে? ওঁকে অন্য ডাক্তাররা দেখেছেন, হাসপাতালেও ছিলেন উনি। সিনিয়ার ডাক্তাররাও নিশ্চয় দেখেছেন। আমি জুনিয়ার ডাক্তার। তা ছাড়া এইসব কেস আমি দেখিনি। আমার ঠিক এক্সপিরিয়ান্স নেই।”
“তবু একবার দেখবে।”
“আপনি যখন বলছেন, নিশ্চয় দেখব।”
“আমার যেটা জানার দরকার তোমায় বলি। তুমি ভাল করে দেখবে– ওঁর শরীরে কোনো ইনজুরি আছে কি না?”
চন্দন অবাক হল। বলল, “একটা লোক যদি আচমকা মাথা ঘুরে পড়ে যায়–তার ইনজুরি থাকতেই পারে। কম বা বেশি। তার ওপর আজ মাসখানেক পরে সেই ছোটখাট ইনজুরির কী পাব?”
“পাও না-পাও দেখবে।”
মাথা নাড়ল চন্দন। দেখব।
কিকিরা বললেন, “আরও একটা খবর জোগাড় করতে হবে। আজ সকালেই আমি বেরুচ্ছিলাম, বকা দত্ত এসে আমার কাজ পণ্ড করে দিল।”
“বকা দত্ত আবার কে?”
“শিপ মার্চেন্ট।”
“শি-প মার্চেন্ট! আরে বাব্বা, সে তো তবে কোটি কোটিপতি…?”
“আরে না না, এ শিপ জলে ভাসে না। জাহাজি ব্যাপার নয়। বকা দত্ত হল গুঁড়ো মশলার কারবারি। ওদের মশলার ট্রেড মার্ক, জাহাজ। একসময় নাকি জাহাজে করে মশলাপাতি আমদানি রপ্তানি হত এদেশে–তাই ওরা জাহাজকে ট্রেড মার্ক করেছে। আমি বকার নাম দিয়েছি শিপ মার্চেন্ট।”
চন্দন বেজায় জোরে হেসে উঠল।
কিকিরা বললেন, “বড্ড বকে। বক্কেশ্বর। তা সে এল। কিছুতেই ওঠাতে পারি না। যখন উঠল ততক্ষণে বেলা হয়ে গিয়েছে। আর তেড়ে বৃষ্টি এসে গেল। আটকে গেলাম। জরুরি কাজটা হল না।”
“কী কাজ?”
“তুমি বলতে পারবে। এই কলকাতা শহরে সাপখোপের বিষ নিয়ে কোথায় ব্যবসা হয় জানো?”
চন্দন ভীষণ অবাক! তার মাথায় ঢুকছিল না। বলল, “না। কেন?”
“শেতল সরকার লেন বলে একটা গলি আছে। শুনলাম গলিটা নাকি নিমতলার দিকে। সেখানে সহদেব থাকে। ওর কথা তো তোমায় বলেছি।”
চন্দন একটু আগেই শুনেছে সহদেবের কথা।
কিকিরা বললেন, “আমি এ ব্যাপারে কিস্যু জানি না, চাঁদু! তবে কোথায় যেন পড়েছি, বিষাক্ত পোকামাকড়, সাপ, বিছে-টিছে সাপ্লাই করার ব্যবসাও কেউ-কেউ করে। এগুলো নিয়ে নাকি গবেষণার কাজ হয়, ল্যাবরেটারির কাজে লাগে।
