“ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে নোজ কলিং করছ, আবার বলছ ঘুমোওনি। নাও, উঠে পড়ো।”
হাই তুলতে-তুলতে উঠে বসল তারাপদ। বলল, “এই দুপুরে শুয়ে থাকলে কোনো ক্ষতি ছিল স্যার?”
“চলো, ওই ঘরটা একবার দেখব।”
“কোন ঘর?”
“বসার ঘর। চাবি তো তোমার কাছে।”
চাবিটা চেয়ে নিয়ে রেখে দিয়েছিলেন কিকিরা। বিছানা ছেড়ে উঠে তারাপদ জল খেল। মাটির কুঁজোয় রাখা জল ঠাণ্ডা। জল খেয়ে বলল তারাপদ, “চলুন।”
নিজেদের ঘর থেকে বাইরে এসে তারাপদ দেখল, দুপুর শেষ হয়ে এলেও রোদ যেন গনগন করছে তখনও। তাকানো যায় না বেশিক্ষণ। বাতাস গরম। সকালের সেই টুকরো মেঘগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। গরম বাতাসের ঝাঁপটায় গাছের পাতা ঝরছে মাঝে-মাঝে, শুকনো পাতা।
বারান্দা পেরিয়ে বসার ঘর।
তারাপদ তালা খুলল। আজ কদিনই কিকিরার কথা মতন ঘরটার তালা-চাবি তারাপদই রাখছে।
কিকিরা ঘরের জানলাগুলো খুলতে-খুলতে বললেন, “তারা, এই ঘরটার ছবি তোমার মনে থাকবে? মানে যেমনটি যা আছে–
বাধা দিয়ে তারাপদ বলল, “এতবার দেখলাম, মনে থাকবে না!”
“থাকলেই ভাল।”
“আপনি এখন হঠাৎ কী মনে করে ঘরটা দেখতে এলেন আবার?”
“ঘর দেখতে আসিনি। এসেছি তীরগুলো দেখতে।”
“তীর!…আগেও দেখেছেন, স্যার।”
“দেখেছি। আবার দেখব। ভাল করে।”
“কেন?”
“এই তীরগুলো একেবারে মামুলি ব্যাপার নয় মনে হচ্ছে। তা ছাড়া, নটুমহারাজ বলছেন, রত্নেশ্বর যেখানে পড়ে গিয়েছিলেন মাটিতে, সেখানে হলুদ পালক লাগানো তীরের দু-একটা হলুদ পালকের ছেঁড়া টুকরো পাওয়া গিয়েছিল। মনে পড়ছে?”
“হ্যাঁ। তীরটাও আর পাওয়া যায়নি। গায়েব হয়ে গিয়েছিল।”
“ইয়েস!… এখন বাপু বলো তো, হলুদ পালকের তীরের ওই পালকের টুকরো কেন রত্নেশ্বরবাবুর গায়ের কাছে পড়ে থাকবে। আর কেনই বা তীরটা হাপিশ হয়ে যাবে?”
“নটুমহারাজও তো সেই কথাই বলেছেন।”
“বলেছেন বইকি! বলেছেন বলেছেন–”বলতে বলতে কিকিরা দেওয়াল থেকে তীর-রাখা ঝোলানো বোর্ডটা নামিয়ে নিলেন। পাতলা কাঠের বোর্ড, মাঝখানে সামান্য গর্ত, লম্বা করে গর্ত করা, এক-একটা তীর সেই গর্তের মধ্যে বসানো ছিল। দুটো তীর এখনো আছে, তৃতীয়টা নেই–হলুদ পালক লাগানো তীরটা।
কিকিরা টেবিলের ওপর বোর্ডটা রাখলেন। বার করে নিলেন দুটো তীর।
তীর-ধনুকের তীর সচরাচর যতটা লম্বা হওয়ার কথা–এই তীরগুলো তত লম্বা নয়। হাতখানেক লম্বা বড়জোর। এর গা বাঁশ কঞ্চির নয়, কাঠ জাতীয় জিনিসেরও নয়, কোনোরকম পাকা বেতেরও নয়। লোহার। এমন লোহা, যাতে মরচে ধরে না। স্টিল ধরনের জিনিস, হয়ত মিশেল আছে ধাতুর। মুখের ফলা স্টিলের। বেশ ধারালো। তীক্ষ্ণ। আর পালকগুলো পাখিরই। কালো পালকঅলা তীরের পালকগুলোয় ধুলো জমেছে। যা স্বাভাবিক। লাল পালক দেওয়া তীরের পালকগুলো মোরগের বলে মনে হল। কালোগুলো হয়ত কাকের। বাকি যেটা ছিল, হলুদ আর সবুজ পালক দেওয়া সেই তীরটা নেই।
তীরগুলো দেখতে-দেখতে কিকিরা বললেন, “তারাপদ, তোমার কী মনে হয়?”
“কিসের?”
“এই তীরগুলো দেখে।”
“ছোট। আসল তীর নয়।”
“আসল তীর হবে কেন! এগুলো তো প্রাইজ পাওয়া তীর। প্রাইজে যে মেডেল দেয় সেটি আসল না, নকল! প্রাইজটাই তো আসল-তাই না!”
তারাপদ মাথা নাড়ল। হেসে বলল, “আমি স্যার কোনোদিন মেডেল পাইনি। চোখে দেখেছি। আপনিই ভাল জানবেন। অনেক মেডেল পেয়েছেন!”
“থার্টি সিক্স! ছত্রিশ! কিকিরা দি গ্রেট ম্যাজিশিয়ানের টার্গেট ছিল একশো। অর্ধেকও হল না। হাতটাই বেজুত হয়ে গেল। আর হাত গেলে ম্যাজিশিয়ানের থাকল কী! আমাদের সময় হাতই ছিল আসল, এখন হয়েছে শুধুই চালাকি, বুদ্ধি। যার মগজে যত চালাকি বিদ্যে, সে তত বড় ম্যাজিশিয়ান।” বলতে বলতে কিকিরা কালো-পালক দেওয়া তীরের মুখটা খুলে ফেললেন। খুলে অবাক হয়ে বললেন, “ওহে তারা, দেখো, দেখো। এই ধারালো মুখটা প্যাঁচ-সিস্টেমে তীরের আগায় আটকানো। বাঃ! ফাইন। মুখটা আটকে তার ওপর শক্ত চামড়ার সরু ফিতে দিয়ে জড়ানো। ভেরি বিউটিফুল।”
তারাপদ বলল, “কী বিউটিফুল?”
“কায়দাটা।… আরও একটা জিনিস দেখো, ফলার মাঝখানের ডগাটা–মানে যেটা গিয়ে গিথবে সেটার মুখ কত সরু। মুখ একেবারে ইঞ্জেকশনের ছুঁচ যেন। তাই না!”
তারাপদ কিছু বলল না।
কিকিরা তীর দেখা শেষ করে বললেন, “তোমার কী মনে হয়?”
“কিসের?”
“নটুমহারাজ বলেছেন, তিনি ভাল তীরন্দাজ ছিলেন। ভাল কথা। ভেরি গুড। তিনটে তীর তিনি প্রাইজ পেয়েছেন। তিন বারে। ভেরি গুড। কিন্তু তারাবাবু, এ-সব তো পুরনো কথা। অনেক আগেই হয়েছে। এখনো তীরগুলো এত তকতকে থাকে কেমন করে! হাউ? আর এগুলো যদি এ-ঘরে এইভাবে খোলা পড়ে থাকবে দিনের পর দিন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর–তা হলে কত ময়লা জমা উচিত ছিল বলো! তেমন তো মনে হচ্ছে না।”
তারাপদ সন্দিগ্ধ হয়ে বলল, “আপনি কী বলতে চান?”
“সেটাই তো বলতে পারছি না। নটুমহারাজ কি আমাদের ধোঁকা দিচ্ছেন?”
“তিনি ধোঁকা দেবেন কেন? কাকে দেবেন? কেনই বা দেবেন? তিনি নিজে যদি জোর না করতেন লালাবাবু এইসব খুনখারাপির কথা ভাবতেন না।”
“আমিও তাই বলি। মহারাজ নিজেই সন্দেহটা জাগিয়েছেন। কিন্তু কেন? তাঁর কিসের স্বার্থ?”
“আমি তো…। স্যার, সহদেবের কথা শোনার পর থেকে আপনার মনে একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছে।”
“সন্দেহ? না, ধোঁকা?… সহদেব সম্পর্কে একটা কথাও তিনি বলেননি। কেন বলেননি? ভাইয়ের সঙ্গে বনিবনা নেই বলে? সম্পর্ক নেই বলে? সেদিন সহদেব এখানে এল আর গেল– তিনি কিছুই জানলেন না? সহদেব কোথায় এসেছিল! কার কাছে? রিকশাঅলা মানিকের কথা যদি সত্যি হয় তবে বলতে হবে- এই বাড়ির দিকেই কোথাও এসেছিল সহদেব। মানিক যেখান থেকে সহদেবকে রিকশায় তোলে, সেটা এদিকেরই কোনো জায়গা থেকে।
