“এগারো নম্বর শেতল সরকার লেন।” তারাপদ বলল।
কিকিরা বললেন, “দোকান আর বাসা। একই বাড়িতে। দোকানটা কিসের জানেন, লালাবাবু?”
“না।”
“বিষ বিক্রি হয়। সাপের।”
লালাবাবুর আর চোখের পাতা পড়ছিল না। বিশ্বাস করতেও পারছিলেন না। বললেন, “বলেন কি, সাপের বিষ বিক্রির দোকান আছে? আমি তো জন্মেও শুনিনি মশাই।”
কিকিরা বললেন, “ওষুধবিষুধের কাজে সাপের বিষ লাগে শুনেছি। এমনও শুনেছি, অনেকে সাপ পোষে বিষ বিক্রি করার জন্যে। আবার সাপ নিয়ে যেখানে গবেষণা হয়, তার ল্যাবরেটারিও আছে। আমি নিজে এ-সব দেখিনি। জানি না। একজনকেই শুধু জানি, কুণ্ডুজগৎ কুণ্ডু, সে কার্নিভালে সাপের খেলা দেখাত। মুখের মধ্যেও সাপের মুণ্ডু ঢুকিয়ে দিত দেখেছি। গা সিরসির করত আমার। কুণ্ডুর বাড়িতে নাকি সাপের খাঁচা ছিল।”
তারাপদ বলল, “সহদেবের নামে এখানে যা রটেছে, সাপের ধন্বন্তরি সে–সেটা গুজব। রটনা। একজন শুনেছে এক, বলেছে অন্য। সে আবার আরেক জনকে হয়ত বলেছে। এইভাবেই রটে গিয়েছে। তবে বোঝা যাচ্ছে, সহদেব সাপখোপ নিয়ে কোনো কারবার করে। সেটা কী–আমরা জানি না। জানতে হবে।”
লালাবাবু বললেন, “রায়বাবু, আমি ছাপোষা মানুষ, ঘরসংসার করে আর নিজের ছোট ব্যবসা নিয়ে পড়ে থাকি। জগতের বারো আনাই জানি না।
আমি তো বুঝতে পারছি না, কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে?”
কিকিরা বললেন, “আমিও বুঝছি না। দেখুন শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়!… একটা কথা, লালাবাবু?”
“বলুন?”
“রত্নেশ্বরবাবু কতদিন আগে এই জমি কিনেছিলেন?
বছর তিনেক। সঠিকভাবে জানতে চাইলে কলকাতায় ফিরে বলতে পারব। দলিলপত্র দেখে।”
“কার জমি?”
“তা বলতে পারব না।”
“যখন কেনেন, তখন তো উনি বাড়ি করার কথাই ভেবেছিলেন।”
“তাই বলত, রতনদা। বলত, কিনে তো রেখে দিই। পরে দেখা যাবে।”
“তিনি আর কিছু বলতেন?”
“আমি শুনিনি।”
“জমি নিয়ে কোনো মামলা-মোকদ্দমা হয়েছিল কখনো?”
“না। জানি না।”
“আর-একটা কথা। ওঁর কোনো ব্যবসায়িক শত্রু ছিল না তো!”
লালাবাবু মাথা নাড়লেন। “ব্যবসায় কম্পিটিশন থাকে রায়বাবু। সব ব্যবসাতেই থাকে। কম্পিটিশন থাকা মানে শত্রু থাকা নয়। রতনদার কোনো শত্রু ছিল বলে আমি জানি না।”
ইতস্তত করে কিকিরা বললেন, “ভাইয়ের সঙ্গে তো ভালই সম্পর্ক ছিল?”
“কী বলছেন আপনি! ভাই ছাড়া আর ছিল কে? ছোট ভাইয়ের স্ত্রী আর তার ছেলেমেয়েরাই ছিল প্রাণ।”
“তা ঠিক। ওই নিমাই ছেলেটি কেমন?”
লালাবাবু বললেন, “নিমাই আজ বারো-চোদ্দ বছর রতনদাদের বাড়িতে আছে। শান্তশিষ্ট স্বভাব। বিশ্বাসী। ওর ওপর বিশ্বাস আছে বলেই রতনদা হালে ওকে বেলেঘাটার কারবারটা একাই দেখতে দিয়েছিল। আর এখন নিমাই বেলেঘাটাতেই থাকে।”
কিকিরা কী মনে করে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। “চলুন, ঘরে যাওয়া যাক। গরম লাগছে।”
হাঁটতে হাঁটতে লালাবাবু বললেন, “কাল তা হলে আমরা কলকাতায় ফিরছি?”
“হ্যাঁ। একসঙ্গেই ফিরব।”
“এখানে কি গুরুচরণকে রেখে যাব? আবার যদি আসেন আপনারা?”
“না। আমি অন্তত আর আসব না–এটাই যেন মহারাজ জানেন।”
তারাপদ বলল, “কিন্তু স্যার, যদি দরকার হয়?” মাথা নাড়লেন কিকিরা। বললেন, “তারা, বনে পথ হারিয়ে গেলে বারবার ঘুরতে নেই। তাতে আরও নাজেহাল হতে হয়। তখন যে- কোনো একটা পথ বেছে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ভাল। মনে রেখো, কোনো না কোনো সময় তুমি ঠিকই বনের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে। কেননা বনের শেষ আছে।.. আমি আর এখানে পড়ে থাকার কারণ দেখছি না। কলকাতায় বরং বেশি দরকার আমাদের। এক নম্বর দরকার সহদেবকে, আর দুনম্বর দরকার চাঁদুকে।”
“চাঁদুকে?”
“হ্যাঁ; চাঁদুকে। চাঁদুকে দিয়ে একবার দেখাতে হবে রত্নেশ্বরবাবুকে। ভাল করে। সে নতুন ডাক্তার। তার যদি দরকার হয় চেনা কোনো বড় ডাক্তার নিয়ে আসবে। তিনি এসে দেখবেন রত্নেশ্বরবাবুকে।”
লালাবাবু বললেন, “রায়মশাই, রতনদাকে তো বাড়ির ডাক্তারবাবুই দেখেন। তিনিও বড় ডাক্তার এনেছিলেন।”
“সবই ঠিক লালাবাবু। কিন্তু আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে। এখান থেকে যখন আপনারা রত্নেশ্বরবাবুকে নিয়ে যান–তখন ভেবেছিলেন তাঁর স্ট্রোক হয়েছে। ডাক্তারবাবুও তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু কেউ কি অন্য সন্দেহ করে ওঁর শরীর ভাল করে পরীক্ষা করেছিলেন? করেননি। কলকাতার হাসপাতালেও যখন ভরতি করেছেন রোগীকে–স্ট্রোকের রোগী বলেই করেছেন। হাসপাতালও কি আর অন্য কিছু ভেবেছে, না, সন্দেহ করেছে।… সে যাই হোক, চাঁদুকে আমার দরকার।”
.
দুপুরে গুমোট লাগছিল।
কিকিরারা যে-ঘরে আছেন তার জানলাগুলো মাঝারি। দক্ষিণের জানলাগুলো খোলাই ছিল। ওপাশে, জানলা ঘেঁষে গাছপালা, করবীঝোপ, কাঁঠালচাঁপা। ছায়া রয়েছে জানলার গায়ে। অন্যদিকের জানলা বন্ধ। রোদ আসছে তখনো।
এই গুমোটে ঘুম আসার কথা নয়। ইলেকট্রিক পাখা তো নেই যে বনবন। করে মাথার ওপর ঘুরবে। মাঝে-মাঝে হাতপাখা নেড়েই গায়ের ঘাম শুকোবার চেষ্টা করছিলেন কিকিরা। তারাপদ ওরই মধ্যে দু-একবার তার ঘরে নাক ডেকে ফেলছিল।
শেষপর্যন্ত কিকিরা উঠে বসলেন বিছানায়। “ওহে, নোজ কলিং জেন্টুস।”
সাড়া নেই তারাপদর।
আবার ডাকলেন কিকিরা।
তন্দ্রা ভেঙে গেল তারাপদর।
“ইয়ং ম্যান তোমরা, এত ঘুমোও কেমন করে। এই গরমে।”
“ঘুমোইনি, চোখ লেগে গিয়েছিল।”
