“কেন দেখবে না? মানুষ কি বাতাস বাবু যে মিলিয়ে যাবে!”
“ঠিক, একেবারে ঠিক কথা।”
তারাপদ বলল, “তখন কি কোনো ট্রেন ছিল?”
লখিন্দর বলল, “ছিল মশাই।”
“কলকাতার দিকের?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
কিকিরা আর তারাপদ একবার নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
লখিন্দর বলল, “আপনারা অ্যাত্ত খোঁজ করছেন কেন?”
“না, মানে একটা কথা জানতে চাইছিলাম। টুমহারাজ তো জানেনই না যে তাঁর ভাই এসেছিল।… আচ্ছা, লখিন্দর তুমি…মানে তুমি তো সহদেবকে ভালই চেনো! আগেও দেখেছ! ও কেমন দেখতে?
লখিন্দর বলল, “ডাকাতের মতন চেহারা বাবু! মাথায় আমার চেয়েও লম্বা। হাত-পা ইয়া-ইয়া-লোহার মতন। মুখটা একেবারে নেকড়ে বাঘের মতন। দেখলে ভয় হয়। গায়ের রং কুচকুচে কালো, ধরেন আমার রং।”
“হাত-পায়ে কোনো খুঁত আছে?”
“না।”
কিকিরা যেন খানিকটা হতাশ হয়ে তারাপদর দিকে তাকালেন। বাঁ হাতে তবে চারটে আঙুল নয়! গ্লাভস-এর কথাটা মাথায় ঘুরতে লাগল।
তারাপদ বলল, “এখানে কোনো আস্তানা আছে সহদেবের?”
“জানি না বাবু। অত খোঁজ রাখি না। সহদেববাবু তো এখানে আসেন না– আস্তানা থাকবে কেন?”
কিকিরা এবার ওঠার জন্য ব্যস্ত হলেন। লখিন্দরকে বললেন, “তোমায় তবে সত্যি কথাটা বলি লখিন্দর। কাউকে বলো না। আমরা দু’জন কলকাতা পুলিশে চাকরি করি। একটা বড়রকম ডাকাতি খুন রাহাজানির জন্যে একজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। শুনেছিলাম, সে ঘাটশিলায় পালিয়ে এসেছে গা-ঢাকা দিয়ে। তার খোঁজেই এখানে আসা। তুমি একটু সাহায্য করো। আমাদের একবার নিয়ে চলো সেই রিকশাঅলার কাছে। তারপর একবার স্টেশনে খোঁজ করব, বাজারেও। তুমি সঙ্গে থাকবে। সহদেবকে কে যে সেদিন দেখেছে, কখন কখন দেখেছে, কোথায় দেখেছে–জানতে হবে।” বলতে বলতে কিকিরা পকেট থেকে দুটো একশো টাকার নোট বার করে লখিন্দরের হাতে গুঁজে দিলেন।
লখিন্দর টাকা নেবে না। কলকাতার পুলিশের নাম শুনেই সে ভয় পেয়ে গিয়েছে। পুলিশ যেখানকারই হোক, তার ছোঁয়া বাঘের ছোঁয়ার চেয়ে দুগুণ। কী সর্বনাশ! এঁরা পুলিশের লোক। লখিন্দর যে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
টাকা ফেরত দেবার জন্য হাত-পা ধরে ফেলল কিকিরার।
কিকিরা বললেন, “তোমার ভয় নেই। কাজের জন্যে আমাদের কিছু খরচা করতেই হয়। তুমি টাকাটা রাখো। আর আমাদের একবার নিয়ে চলো রিকশাঅলার কাছে। স্টেশনে।”
লখিন্দর বাধ্য হয়ে বলল, “চলুন”।
.
০৭.
আজ আর বৃষ্টি ছিল না। আকাশে রোদ ছিল, মেঘও ভাসছিল টুকরো-টুকরো। মেঘলা হয়ে আসছিল মাঝে-মাঝে।
বাড়ির বাইরে একটা বড় নিমগাছের তলায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন কিকিরা। পাশে লালাবাবু। তারাপদ পায়চারি করছিল কাছাকাছি। বেলা হয়েছে। দশটা বাজতে চলল।
লালাবাবু বললেন, “আমায় তো একবার কলকাতা যেতে হয়। নিজের কাজকর্মের কথা বাদ দিন, রতনদাকে ওদের হাতে ফেলে এসেছি, সবসময়েই দুশ্চিন্তা হয়।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। বললেন, “। আপনি ফিরবেন, আমরাও ফিরব। চলুন, কাল সকালের গাড়িতেই ফেরা যাক।”
“আপনারাও ফিরবেন?”
“এখানে আপাতত আর কোনো কাজ দেখতে পাচ্ছি না। কলকাতাতেই আমাদের কাজ।… আচ্ছা, লালাবাবুনটুমহারাজের এই ব্যাপারটার সম্পর্কে কী মনে হয় আপনার?”
“কোন ব্যাপার? ভাইয়ের কথা বলছেন?”
“হ্যাঁ। মহারাজের ভাই সহদেব সেদিন এখানে এসেছিল। আমরা কাল নানা জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। অন্তত চার-পাঁচজন তাকে দেখেছে। লখিন্দর, রিকশাঅলা মানিক, স্টেশনের এক টিকিট-চেকার আর একটা মুটে। তারা বলেছে, সহদেবকে তারা দেখেছে একদিন। সেই একদিনটা কিন্তু সেইদিনই–যেদিন টুমহারাজের বাড়িতে ঘটনাটা ঘটে। সহদেব সেদিন কেন এসেছিল এখানে? কেনই বা রাত্রের মধ্যেই পালিয়ে গেল?”
লালাবাবু খানিকটা আগে কিকিরাদের মুখে সব কথা শুনেছেন। শুনে তিনি কিছু বলেননি। শুধু অবাক হয়ে এলোমেলো কয়েকটা প্রশ্ন করেছেন। তাঁর কিছুই মাথায় ঢুকছিল না তো বলবেন কী!
কিকিরা বললেন, “সহদেব কেন এসেছিল? কার কাছে এসেছিল? নটুমহারাজ কি কিছু জানেন না? যদি না জানেন, তবে অন্য কথা। আর যদি জানেন, তবে কেন তিনি কথাটা লুকোবার চেষ্টা করছেন?”
লালাবাবু মাথা নাড়লেন। “আমিও বুঝতে পারছি না। তবে রায়মশাই, এই ঘটনার সঙ্গে যদি ভাইয়ের সম্পর্ক না থাকে, তিনি বলবেন কেন? অবশ্য আগে দেখতে হবে, ভাইয়ের আসার কথা সত্যিই তিনি জানেন কি না। তা আপনি নটুমহারাজকে জিজ্ঞেস করুন না সরাসরি।”
“ভাবছি। ভাবছি এখনই করব, না, কলকাতায় ফিরে গিয়ে আগে সহদেবের খোঁজ করে তারপর কথাটা তুলব কি না।”
তারাপদ কাছে এসে দাঁড়াল। কাল রাত্রে বাদলা পোকার কামড় খেয়ে তার গালের একটা জায়গা লাল হয়ে আছে।
লালাবাবু বললেন, “কলকাতায় সহদেবকে কি পাওয়া যাবে।”
“যেতে পারে। ওই যে ওই লোকটা কী নাম যেন তারাপদযার কাছে আমরা গেলাম, ওই তোমার বাজার ছাড়িয়ে একেবারে শেষে-পুরনো রাজবাড়ি…”।
“গোকুল। বাজারের লাস্ট পয়েন্টে থাকে-ওপাশটায়। রুপোর গয়নাটয়না বেচাকেনা করে। সুদে টাকা খাটায়।”
“হ্যাঁ। একমাত্র ও-ই সহদেবের ঠিকানা বলতে পারল। সে অবশ্য বলল, সহদেবের সঙ্গে এর মধ্যে তার দেখা হয়নি।”
“সহদেবের ঠিকানা সে জানল কেমন করে?”
“একবার কলকাতায় গিয়ে হঠাৎ দেখা হয়েছিল রাস্তায়। যোগাযোগ তখন থেকেই। গোকুল কলকাতায় গেলে সহদেবের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে আসে।”
