কিকিরা কিছু বললেন না।
খানিকক্ষণ কেউ আর কোনো কথা বলল না।
লালাবাবু উঠে পড়লেন। “বসুন আপনারা, আমি একবার গুরুচরণের খোঁজ করে আসি। দেখি, রান্নাবান্নার কতদূর এগুলো!”
উঠে গেলেন লালাবাবু।
কিকিরা সিগারেট চাইলেন তারাপদর কাছে।
সিগারেট ধরানো হয়ে গেলে হঠাৎ একটু হেসে কিকিরা বললেন, “তারাবাবু, ধাঁধাটা কেমন লাগছে? কোনো দিশে পাচ্ছ?”
“না।”
“ তা হলে তো ব্যাক ওয়াকিং করতে হয়।”
“মানে?”
“পশ্চাৎগমন। পৃষ্ঠ প্রদর্শনও বলতে পারো।”
“সে আপনার ইচ্ছে। তবে স্যারকে এতদিন ধরে দেখছি তো, আপনি কি ইজিলি ব্যাক শো করবেন?” ঠাট্টা করেই বলল তারাপদ।
সিগারেট ফুঁকতে-ফুঁকতে হালকা ভাবেই কিকিরা বললেন, “দেখো হে, আমি একটা ম্যাজিশিয়ান। স্টেজে ভূত নাচাতেও পারি। কিন্তু এই রক্তমাংসের ভূতকে কেমন করে ধরব! আমিও বোকা হয়ে আছি। … বেচু দত্ত বলত, ছিপ ফেলার আগে পুকুরটা দেখে নেবে। ঠিক কথাই বলত, তারাবাবু! এ পুকুরের কোথায় যে মাছ তলিয়ে আছে বুঝতে পারছি না।”
“আপনি কি ছিপ উঠিয়ে নিতে চান?”
“ওঠাবার কথা উঠছে কোথায়? এখনো কি ছিপ ফেলেছি।”
“তা হলে এসেছেন কেন?”
“ফিফটিন থাউজেন্ডের লোভে। লোভে পড়ে হে! মানুষ মাত্রেই লোভের দাস। যাবৎ লোভং তাবৎ জীবনং…”
তারাপদ হেসে উঠল হো-হো করে। “এই স্যাংসক্রিটটা কি গীতায় আছে?”
কিকিরা গম্ভীর হয়ে বললেন, “রামায়ণে আছে। মহাভারতেও…।” বলতে বলতে থেমে গেলেন। কান পেতে যেন কোনো শব্দ শোনার চেষ্টা করলেন। বারান্দার দিকে কেউ কি এসেছে? ইশারা করলেন তারাপদকে।
তারাপদ উঠে গেল। দরজার কাছে গিয়ে দেখল বারান্দাটা। অন্ধকার বারান্দা। একটা কুকুর কখন এসে উঠেছে বারান্দায়।
ফিরে এল তারাপদ। “একটা কুকুর। বৃষ্টিতে গা বাঁচাচ্ছে।
“যা বলছিলাম, লোভ! লোভে পড়ে রাবণবেটা গেল, গেল দুযুধন!”
“দুযুধন!”
“আরে বাবা, সব কথাতেই খুঁত ধরো কেন? ছেলেবেলায় বাণী অপেরার যাত্রা দেখেছি। একজন ফেমাস অ্যাক্টার ছিল অপেরায়, ফটিক কয়াল। মেয়ের পার্ট করত! মা-ঠাকুমার। তো সেই ফটিক কয়াল কখনও দুর্যোধন বলত না, বলত দুযুধন। নিজ পাপে মজিলি রে বাছা দুযুধন…।”
তারাপদ হাসির দমক সামলাতে না পেরে বিছানায় বসে পড়ল।
হাসি-তামাশার মধ্যেই কিকিরা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। উঠে পড়ে খোলা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, ফেলে দিলেন সিগারেটের টুকরো, বাইরের অন্ধকার আর বৃষ্টি দেখলেন যেন, তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, “সহদেব আমাকে ভাবাচ্ছে, তারাপদ। রত্নেশ্বরবাবুর কাছে সে-ই কি সেদিন এসেছিল? যদি এসে থাকে, কেন এসেছিল? ঘাটশিলায় সে এল কবে? সেই দিন? না, আগেই এসেছিল? যদি আগেই এসে থাকে, ছিল কোথায়? কবে সে ঘাটশিলা ছেড়ে পালাল? কে-কে তাকে দেখেছে? প্রশ্ন অনেক।”
তারাপদ বলল, “আগে আসার দরকার কী? যদি জামশেদপুর বা ঝাড়গ্রাম থেকে এসে থাকে–তবে সেইদিনই এসেছে। চলেও গেছে সেইদিন। আসা-যাওয়ার গাড়ি পেতে তো তার অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।”
“হতে পারে। যাই হোক সেটা কাল স্টেশনে গিয়ে লখিন্দরকে নিয়ে খোঁজখবর করলেই জানা যাবে।”
“আপনি টুমহারাজকে বলবেন না কিছু?”
“এখন নয়। একেবারে নয়। আগে দেখি।”
“নটুমহারাজ তাঁর ভাইয়ের কথা একবারও তোলেননি, কিকিরা।”
“দরকার হয়নি হয়ত। তা ছাড়া তিনি নিজের কথা খুব একটা বলেননি আমাদের।”
তারাপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। সামান্য পরে বলল, “কিকিরা, আমি কিন্তু এখনও ধাঁধায় আছি। সহদেবকেই যদি সন্দেহ করতে হয়–তবে বলব, সে কেন এখানে আসবে, কেনই বা রত্নেশ্বরবাবুকে খুন করার চেষ্টা করবে? তার কিসের স্বার্থ? তা ছাড়া রত্নেশ্বরবাবুকে খুন করার চেষ্টা হয়েছিল, একথা ডাক্তার-পুলিশ কেউ তো বলবে না। থানায় কোনো ডায়েরি নেই। ডাক্তারবাবুর মাথাতেও সে-চিন্তা আসেনি। শুধু নটুমহারাজের সন্দেহ থেকে…!”
কিকিরা বাধা দিলেন। বললেন, “দাঁড়াও, আরও দু-একটা দিন যাক। খোঁজখবর করি আগে।… আমি ভাবছি, সহদেব সাপের ধন্বন্তরি হয়েছে–এই কথাটা রটলো কেমন করে? কে রটাল? মানেই বা কী কথাটার?”
বারান্দায় পায়ের শব্দ পাওয়া গেল।
লালাবাবু ঘরে এলেন। বললেন, “চলুন রায়বাবু খাওয়াদাওয়াটা সেরে নেওয়া যাক। আজকের বৃষ্টিটা ভালই হচ্ছে। সারারাত চলতে পারে।”
কিকিরা বললেন, “চলুন। এখানকার জলটা ভাল। দু-চার ঘণ্টা অন্তর খিদে পাচ্ছে। চলুন।”
.
পরের দিন ঠিক সময়ে কিকিরারা লখিন্দরের দোকানে হাজির। সবে সন্ধে হয়েছে। লখিন্দর দোকানেই ছিল।
ওর দোকান ছোট। মনিহারি জিনিসপত্র বিক্রি হয়।
দোকানের মধ্যে জায়গা কম। একটা ছোট বেঞ্চি দোকানের বাইরে এনে রাখল লখিন্দর। বসতে বলল। চা আনতে দিল।
সাধারণ কথাবার্তা সারতে-সারতে চা এসে গেল।
চা খেতে-খেতে কিকিরা সাবধানে কথা তুললেন সহদেবের। বললেন, “লখিন্দর, একটা উপকার করো না আমাদের।”
“কী বাবু?”
“সহদেবের একটু খোঁজখবর করে দাও না।”
লখিন্দর অবাক হল! “সহদেববাবুর খোঁজখবর! কেন?”
“সে তোমায় পরে বলব।… তুমি সেদিন তাকে দেখেছিলে–এটা ঠিক তো?”
“নিশ্চয়।”
“সহদেব তোমায় দেখেছিল?”
“না, উনি ব্যস্ত ছিলেন। রিকশা থেকে নেমেই স্টেশনের দিকে চলে গেলেন।”
“কোন রিকশা, তোমার মনে আছে?”
“হ্যাঁ। মানিকের রিকশা।”
“সহদেবকে তা হলে রিকশাঅলা ছাড়াও বাজারের আরও কেউ-কেউ দেখেছে। তাই নয়? রেল স্টেশনের কেউ না কেউ দেখে থাকবে।”
