কিকিরা বললেন, “কতদিন আগে সেটা?”
“তা… তা বাবু, সাত-আট বছর আগে। “
“কোথায় থাকে সে?”
“আমি সঠিক জানি না, বাবু।…কেউ বলে জামশেদপুরে থাকে, কেউ বলে ঝাড়গ্রাম। স্বভাব কি আর পালটেছে! শোনা তো যায় না। তবে কে যেন একবার বলছিল, সাপখোপের ধন্বন্তরি হয়েছে। শুনেছি, এখন পয়সাও কামায়।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “এখানে আসে না?”
“না। অনেককাল আগে একবার দেখেছিলাম। আর হালে একদিন দেখেছি।”
কিকিরা কৌতূহল বোধ করলেন। বললেন, “হালে মানে কতদিন আগে?”
লখিন্দর যেন মনে-মনে একটা হিসেব করছিল। বলল, “তা ধরুন মাস হতে চলল।”
কিকিরাও একটা হিসেব করে নিলেন। রত্নেশ্বরের অসুস্থতাও ওইরকম সময়ের ঘটনা। দু-পাঁচদিন আগে-পিছে হতে পারে। পরে ভাল করে মিলিয়ে নেবেন হিসেবটা। অবশ্য মহারাজের ভাইয়ের ঘাটশিলায় আসার ব্যাপারটা নিশ্চিত করে জানতে হবে। সময়টাও সঠিকভাবে না জানলে দুটো ঘটনাকে মেলানো যাবে না।
“তুমি কি মহারাজের ভাইকে তখন দেখেছ? মানে হালে যখন এসেছিল?”
“দেখেছি।…আজ্ঞে, আমি বললাম না–স্টেশনের কাছে আমার একটা ছোট মনিহারি দোকান আছে। আমি দোকানে বসে বিক্রিবাটার হিসেব করছিলাম, এক সময় চোখ তুলতেই নজর গেল, রাস্তায় একটা লোক রিকশা থেকে নামছে। প্রথমে খেয়াল করিনি, পরে আন্দাজ হল সহদেববাবু।”
“নটুমহারাজের ভাইয়ের নাম সহদেব?”
“আজ্ঞে।”
“কী করল সহদেব?”
“রেল স্টেশনের দিকে চলে গেল।”
“আর দেখনি?”
“না।” বলেই লখিন্দরের কেমন কৌতূহল হল। বলল, “আপনি এত কথা জানতে চাইছেন কেন, বাবু?”
কিকিরা বুঝলেন, আপাতত আর কৌতূহল জানানো উচিত নয়। একটু সময় নিয়ে এগুনোই ভাল। বললেন, “না, তোমার মুখে শুনলাম কি না, তাই। গল্প-গল্প লাগছিল।…তা লখিন্দর, তুমি কি এখন দোকানে যাচ্ছ?”
“সন্ধেকালে দোকানেই থাকি আমি।”
“বাঃ, ভালই হল। কাল যদি তোমার দোকানে যাই, দেখা পাব।”
“পাবেন। আমার নাম বললেই দোকান দেখিয়ে দেবে। দুগা ভাণ্ডার।” কিকিরা আর কিছু বললেন না।
.
০৬.
নিজেদের ঘরে বসে কথাবার্তা হচ্ছিল। রাত হয়েছে খানিকটা। সামান্য আগে বৃষ্টি এসেছে, বাইরে বৃষ্টির শব্দ, গাছপাতাও বাতাসে দুলছে, শব্দ হচ্ছিল। এই বৃষ্টি বেশ আরামের। ঘরের জানলার দুটো খোলা, একটা বন্ধ। খোলা জানলা দিয়ে জলের ছাট আসছিল না।
কিকিরা বললেন, “আপনি তা হলে জানেন না?”
লালাবাবু বললেন, “না।” বলে মাথা নাড়লেন। “আমি কথায় কথায় একবার শুনেছিলাম, নটুমহারাজের এক ভাই ছিল। তিনিই বলেছিলেন। সেই ভাই কোথায় থাকে, কী করে তা বলেননি। আমার তো মনে পড়ছে না।
ঘরে নটুমহারাজ ছিলেন না। ওঁরা তিনজনই শুধু আছেন, কিকিরা, তারাপদ আর লালাবাবু।
কিকিরা লালাবাবুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অপেক্ষা করে বললেন, “ভাল করে মনে করুন। ভাই সম্পর্কে কখনও কিছু বলেননি নটুমহারাজ?”
লালাবাবু মাথা নাড়লেন। “না। আমার খেয়াল হচ্ছে না। তবে যানটুমহারাজ এটুকু বলেছিলেন যে, ভাইয়ের কোনো খোঁজখবরই তিনি রাখেন না।”
তারাপদ বলল, “লালাবাবু, আপনার সঙ্গে টুমহারাজের জানাশোনা কতদিনের?”
“বছর তিন-চার। একবার রতনদার সঙ্গে এসে দিন পনেরো ছিলাম। এখনই পরিচয়।… আমি পরে আরও দু-তিনবার এখানে এসেছি রতনদার সঙ্গে; কিন্তু বেশিদিন থাকিনি। নটুমহারাজের সঙ্গে ওইভাবেই আলাপ-পরিচয়, বন্ধুত্ব। মানুষটিকে আমার ভাল লাগত।”
কিকিরা বললেন, “রত্নেশ্বরবাবুর সঙ্গে সহদেবের–মানে মহারাজের ভাইয়ের পরিচয় ছিল?”
“না। কেমন করে থাকবে! থাকলে কি রতনদা আমায় বলত না?”
তারাপদ কিকিরাকে বলল, “স্যার, রত্নেশ্বর এখানে আসছেন পাঁচ-ছ বছর। যদি তাই হয়, আর লখিন্দর যা বলল তা ঠিক হয়–তবে রত্নেশ্বর যখন থেকে আসছেন তার আগে থেকেই সহদেব এখান থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে। দু’জনের দেখাসাক্ষাৎ পরিচয় হওয়ার কথা নয়।”
কিকিরা কিছুই বললেন না।
লালাবাবু বললেন, “রায়বাবু, এ নিয়ে এত মাথা ঘামাবার কী আছে! নটুমহারাজকে জিজ্ঞেস করলেই হয়।”
কিকিরা বললেন, “তা করতে হবে শেষপর্যন্ত। এখন কিছু বলবেন না। কিন্তু একটু দেখেনি।…আচ্ছা, লালাবাবু, লখিন্দর বলল–সহদেব এখন সাপের ধন্বন্তরি হয়ে গিয়েছে। পয়সাও কামাচ্ছে। তার মানে কী? ও কি ওঝাগিরি করছে?”
লালাবাবু বললেন, “কেমন করে বলব! তবে ওঝাটঝার দিন চলে গিয়েছে বলে আমার মনে হয়। এখন কে আর ওঝাগিরিতে বিশ্বাস করে!… একেবারে গাঁ-গ্রামে, যেখানে ডাক্তারবদ্যি নেই, সেখানে হয়ত ওঝার ডাক পড়ে এখনো। নয়ত কে আর সাপ কামড়ালে ওঝা ডাকে আজকাল। বিশেষ করে সহদেব যদি জামশেদপুর কি ঝাড়গ্রাম শহরের মতন জায়গায় থাকে! হাসপাতাল পড়ে থাকতে ওঝা! আমার বিশ্বাস হয় না।”
তারাপদ বলল, “আমাদের ইন্টেরিয়ার গাঁ গ্রামে, জঙলি জায়গায় এখনো অনেক অদ্ভুত কাণ্ড হয়। কাগজে একবার পড়েছিলাম, কোথায় যেন ডাইনি ধরা হয়েছিল। এ সমস্ত জায়গায় ওঝাও থাকে হয়ত।“
কিকিরা অন্য কথা ভাবছিলেন। অন্যমনস্কভাবে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকলেন অল্পক্ষণ। তারপর বললেন, লালাবাবু, সহদেবের খোঁজটা কেমন করে পাওয়া যায় বলুন তো?”
“তাই তো ভাবছি! নটুমহারাজ ছাড়া…। তবে, তিনিও যদি না জানেন! আগে মশাই, এত জানতাম না, ভাবিওনি। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ভাইয়ে ভাইয়ে মুখ দেখাদেখি যখন নেই, উনিও কি কোনো খোঁজ রাখেন। সহদেবের! মনে তো হয় না।”
