কিকিরারা দাঁড়িয়ে থাকলেন।
লোকটা সাইকেল থেকে নেমে দেখল কিকিরাদের। তারপর হাত তুলে নমস্কার জানাল।
“বাবুরা ঘোরাফেরা করতে এসেছেন?”
কিকিরা লোকটাকে দেখছিলেন। মাথায় মাঝারি। গায়ে মেদ নেই, হাড়-হাড় চেহারা, লম্বা-লম্বা হাত, চেটালো হাড়। মুখ চৌকোনো, চোয়ালের হাড় ঠেলে উঠেছে। চোখ দুটো ঘোলাটে মতন। গালে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। গোঁফটি একেবারে কাঁচাপাকা।
কিকিরা বললেন, “হ্যাঁ, ঘুরতে-ফিরতে।”
“আমার নাম লখিন্দর দাস।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। এমনভাবে নাড়লেন যে নামটি তাঁর পছন্দ হয়েছে। বললেন, “এখানকার লোক?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। দেশবাড়ি তমলুক। এখানেই থাকি।”
“কী করা হয়?”
“আজ্ঞে, একটা ছোট দোকান আছে। স্টেশনের কাছেই। মনিহারি। আর জমি কেনাবেচা দেখি অল্পস্বল্প।”
কিকিরা বুঝতে পারলেন, লখিন্দর টুকটাক জমির দালালিও করে।
লখিন্দর নিজেই বলল, “এদিক পানে একটা কাজে এসেছিলাম। ওই পশ্চিম দিকে একটা জমি আছে। বেচার কথা চলছে।…তা এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় আপনাদের দেখলাম। আপনার কী জমি…?” কথাটা শেষ করল না সে।
কিকিরা সরাসরি না বললেন না। মাথা নাড়লেন না। তাঁর মনে হল, লোকটার সঙ্গে খানিকটা আলাপ জমানো যেতে পারে। স্থানীয় লোক। যদি কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়।
আলাপ জমাবার মতন করে কথা বলতে শুরু করলেন কিকিরা। না, ঠিক জমি কেনার মতলব নিয়ে এখানে ঘুরছেন না, এমনিই বেড়াতে বেড়িয়েছেন; তবে জায়গাটা যেমন ভাল লাগছে, ছিটেফোঁটা জমি হয়ত কিনতেও পারেন পরে। কেমন দামটাম এখানে? লোকে কিনছে? বাঙালি, না বিহারিরাই বেশি কিনছে?
তারাপদ চুপ করে কথাবার্তা শুনছিল কিকিরাদের।
লখিন্দর বলল, “জমিটমি এখনো এদিকে সস্তা বাবু। ওপারে অবশ্য বেশি। এধারে কম। আগে আর কে জমি কিনতে আসত এখানে? এখন কেনে। ঘরবাড়ি কত বেড়ে গেছে আগের তুলনায়।”
কিকিরা এবার আচমকা কথা ঘোরালেন। “এখানে–এই জায়গায় একটা হোটল হচ্ছিল জানো নাকি?”
“জানি।”
“বাবুকে চিনতে? হোটেল বাড়ি যিনি তৈরি করাচ্ছিলেন?”
মাথা হেলিয়ে লখিন্দর বলল, “চিনতাম। কলকাতার রতনবাবু।”
“জানাশোনা ছিল? নাকি এমনি চিনতে?”
“না না, ভালই চিনতাম। বাবুর কাছে গিয়েছি। এই কাজ যখন শুরু হল–এদিক পানে এলেবাবু যদি থাকতেন, কাছে এসে দাঁড়িয়েছি, কথা হয়েছে।”
“বাবুর কোনো খবর রাখ?”
“আজ্ঞে, শুনেছি বাবু হাসপাতালে আছেন। কলকাতায়।”
কিকিরা কী যেন ভেবে বললেন, “হাসপাতালে নয়, বাড়িতে ভাল নেই।”
লখিন্দর কৌতূহল বোধ করল। “আপনারা?”
কিকিরা বললেন, “আমরা বাবুর চেনাজানা। ওঁর কলকাতার বাড়িতেও আসা যাওয়া রয়েছে। এখানে একটা দরকারি কাজে এসেছি। একবার জায়গাটা দেখতে এলাম। মানুষের কী কপাল বলল। কত সাধ করে এই হোটেল তিনি করতে এলেন, আর কী হল! সবই ভাগ্য।”
লখিন্দর মাথা নাড়ল। আফসোসের মতন করে বলল, “বাতে না থাকলে জমি বাড়ি সয় না। এ একেবারে সত্যি কথা, বাবু!…আপনারা উঠেছেন কোথায়?”
“ওই বাড়িতেই।”
“ওই বাড়িতে।”
“কেন?”
“না না, এমনি বললাম।…তা আপনারা কি শুনেছেন, এই জমিটমি, ভিত-সমেত নাকি বিক্রি করে দেবেন রতনবাবুর বাড়ির লোক?”
“কই, না।”
“তবে গুজব। শুনছিলাম, তাই বললাম।”
“গুজব তো রটেই লখিন্দর। তবে এখন যে বিক্রিবাটার কথা হয়েছে এমন শুনিনি। ভবিষ্যতে হতে পারে, জানি না। “
লখিন্দর এবার যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হল। “আমি যাই বাবু!”
“চলো, আমরাও যাই।”
কিকিরা ডাকলেন তারাপদকে।“চলো, ফেরা যাক।”
তিনজনে ফিরতে লাগলেন।
একথা সেকথার পর কিকিরা হঠাৎ বললেন, “লখিন্দর, এই জমি রতনবাবু যখন কেনেন তখন তুমি কোথায় থাকতে?”
“আজ্ঞে, এখানেই ছিলাম।”
“জমি কেনার কথা শুনেছিলে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। ..উনি নিজেই একদিন বলেছিলেন। তবে হোটেলের কথা বলেননি। বলেছিলেন, বাড়ি করবেন পরে। বড় করে।”
কিকিরা এবার একটা চুরুট ধরালেন। লখিন্দরকে দিতে গেলেন। নিল না সে। বলল, “সিগারেট, বিড়ি আমি খাই না বাবু। পান-জরদা খাই। দিনে তিন-চারটি।”
তারাপদ বুঝতে পারছিল, কিকিরার মতলব অন্যরকম। তিনি ফাঁকফোঁকর গুজছেন কোনো কথাবার্তা যদি জানতে পারেন।
হাঁটতে-হাঁটতে একসময় তারাপদই বলল, “হোটেল করার মতলবটা যে কেন এল রত্নেশ্বরবাবুর, কে জানে! ঠিক কি না কিকিরা! এখানে একটা বেড়াবার বাড়ি করলেই তো পারতেন। ওঁর তো পয়সার অভাব নেই। ব্যবসাদার মানুষ!”
কিকিরা একবার তারাপদকে দেখে নিলেন। বললেন, “সে ওঁর খেয়াল। তা বাড়িই করুন আর হোটেলই করুন, ভাগ্যে যা লেখা ছিল তা তো হতই। কী বলো লখিন্দর!”
লখিন্দর মাথা হেলিয়ে দিল। ঠিক কথা।
আরও একটু এগিয়ে এসে কিকিরা বললেন, “লখিন্দর, নটুমহারাজকে নিশ্চয় চেনো তুমি।”
লখিন্দর অবাক হয়ে বলল, “চিনব না? উনি এখানকার লোক।”
“এই জমিটা কি উনিই কিনিয়ে দিয়েছিলেন?”
“আমি জানি না, বাবু।”
“মহারাজজি মানুষটি বেশ। তাই না! রত্নেশ্বরবাবুর বন্ধু।”
লখিন্দর হঠাৎ বলল, “মানুষ ভাল। তবে ওঁর এক ভাই আছে। এখানে থাকে না। সে বড় খারাপ লোক। ভাইয়ে ভাইয়ে বনিবনা নেই অনেককাল। আগে এখানে থাকত। পরে মহারাজ তাকে তাড়িয়ে দেন। একবার পুজোর সময় ডাকাতি করেছিল। ধরা পড়েও কেমন করে ছাড়া পেয়ে যায়। তারপর থেকে আর আসে না এখানে।”
কিকিরা আর তারাপদ মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
