“কিছুই বলেননি।”
কিকিরা লালাবাবুর দিকে তাকালেন। উনি মাথা নাড়লেন। তিনি জানেন না।
কী ভেবে কিকিরা নটুমহারাজকে বললেন, “মহারাজ, আপনি লালাবাবুকে কি আপনার সন্দেহের সব কথা বলেছেন?”
নটুমহারাজ মাথা নাড়লেন। বললেন, “কেমন করে বলব! আচমকা খবরটা ওঁকে লোক পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টেলিগ্রামের বিশ্বাস কী! তা ছাড়া এখান থেকে কলকাতা যাওয়া মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। লালাবাবু এলেন। আমরা ডাক্তারবদ্যি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তারপর উনি রত্নেশ্বরবাবুকে নিয়ে কলকাতায় চলে গেলেন। বউমারা গেল যজ্ঞেশ্বরের সঙ্গে ট্রেনে। তারপর কলকাতায় রত্নেশ্বরবাবুকে নিয়ে লালাবাবু ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। উনি তো আর এখানে আসেননি। আসা সম্ভব ছিল না।…আমি চিঠি লিখে-লিখে লালাবাবুকে আমার সন্দেহের কথা জানিয়েছি।”
“চিঠিতে তীর হারানো, দস্তানা পাওয়ার কথা লেখেননি?”
“না। চিঠিতে অত কথা লেখা যায় না। লিখলেও উনি বুঝতেন না। তবু আভাস দিয়েছি। লালাবাবুর আসার কথা ছিল এখানে। সাক্ষাতে সব বলতাম।”
মাথা নাড়লেন লালাবাবু। কিকিরাকে বললেন, “রায়বাবু, আমি প্রথম থেকেই আপনাকে বলেছি, এ-সব ব্যাপার আমার মাথায় ঢোকে না। একটা মানুষ মরতে চলেছে-তাকে নিয়ে আমি ব্যস্ত। নটুমহারাজ কী লিখতেন–তাও আমি ভাল করে পড়তে পারতাম না। বুঝতাম না।…তবে কাল রাত্তিরে ওঁতে-আমাতে যখন কথা হচ্ছিল–ওঁর কথা শুনেছি। “
তারাপদ ঘরের মধ্যেই পায়চারি করছিল যেন। হঠাৎ বলল, “কিকিরা, সেই লোকটা, যে কলকাতা থেকে এসেছিল, দেখা করে আবার চলে গেল, সেই লোকটার খোঁজ নেওয়া যায় কেমন করে?” বলে লালাবাবুর দিকে তাকাল। বলল, “আপনি কি এমন কাউকে চেনেন, যার বাঁ হাতে চারটে আঙুল?”
লালাবাবু মাথা নাড়লেন। “মনে করতে পারছি না”।
.
০৫.
তারাপদকে সঙ্গে নিয়ে দুটো দিন ঘোরাঘুরি করলেন কিকিরা। লালাবাবু বা নটুমহারাজকে সঙ্গে নিলেন না। ঘাটশিলা জায়গাটা বিরাট কোনো শহর নয়, হাজারটা গলিখুঁজি, রাস্তাও নেই; বাড়ি নেই শয়ে-শয়ে কাজেই এই ছোট শহরটায় ঘুরে বেড়াতে কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না। আর বাড়ি ঘরদোর কম-এমনকি কলকাতার ছোটখাট পাড়াতেও যত দোকানপসার থাকে–এখানে তাও চোখে পড়ে না। স্টেশনের দিকটাই যা জমজমাট।
কিকিরা তো ঘাটশিলায় বেড়াতে আসেননি, কাজেই হেলেদুলে গা এলিয়ে ঘুরে বেড়ানোর অবসর তাঁর ছিল না। উদ্দেশ্য নিয়েই ঘুরতেন। যদিও বুঝতে পারতেন না, এভাবে ঘুরে বেড়িয়ে কাজের কাজ কিছু হবে কী না!
রত্নেশ্বর যেখানে হোটেল করবেন বলে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছিলেন, কিকিরা সেই জায়গাটাতেও গিয়েছিলেন। অবশ্য লালাবাবুকে সঙ্গে করেই।
জায়গা এবং খোঁড়াখুঁড়ি দেখে কিকিরাদের মনে হয়েছিল, রত্নেশ্বর বড়সড় কোনো হোটেল তৈরির কাজে হাত দেননি। ছোট হোটেল। দোতলার ভিত করেছেন। ঘর ঠিক কতগুলো করতেন, নকশা না দেখলে বলা মুশকিল। হয়ত সাত-আটটা। দোতলার একপাশে নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করারও ইচ্ছে ছিল।
লালাবাবুর কথা শুনলে মনে হত, রত্নেশ্বর হোটেলটাকে আপাতত বরাবরের মতন চালাবার কথা ভাবেননি। পুজো থেকে শীতের শেষ–মাত্র চার-পাঁচ মাস–চালাবেন ভেবেছিলেন। ওই সময়টায় লোকজন আসে এখানে বেড়াতে। গরমে, বর্ষায় কে আর আসবে!
কাজটা শুরু করেছিলেন ভদ্রলোক, হয়ত একটু তাড়াহুড়ো ছিল–কিন্তু কী কপাল, শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটল যে, উনি আর কোনোদিন এটা শেষ করতে পারবেন না। প্রাণে বেঁচে থাকলেও হয়ত নয়। তা ছাড়া ওভাবে কতদিনই বা আর বাঁচবেন!
.
সেদিন শেষ বিকেলে তারাপদকে নিয়ে কিকিরা আবার হোটেলের জায়গাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
জায়গাটা ভাল। উঁচু জমির ওপর। খানিকটা তফাতে ঢল নেমেছে। তারপর এবড়ো-খেবড়ো জমি। জমি ঘুরলো কি পাথর ছোট, বড়। শেষে সুবর্ণরেখা নদী।
হোটেলটা যদি শেষ হত, চালু হয়ে যেত বছরখানেক কি দুয়েকের মধ্যে কিকিরার ধারণা, রত্নেশ্বর বোধ হয় ব্যবসাটা জমিয়ে তুলতে পারতেন। ছুটি কাটাবার মতনই জায়গা আর পরিবেশ।
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “তারাবাবু, সেই যে কথায় বলে, ম্যান প্রপোজেস গড ডিসপোজেস–এ হল তাই।” বলতে বলতে নিশ্বাস ফেললেন বড় করে।
তারাপদ বলল, “তা ঠিক।…তবে কি কিকিরা, আমার মনে হচ্ছে, গড় নয়–অন্য কেউ…”
তারাপদকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কিকিরা হাত বাড়িয়ে কী যেন দেখালেন। “ওই দেখো?”
“কী?”
“ভাল করে দেখো।”
হোটেলের ভিত খোঁড়ার পর তার গাঁথনির কাজও শেষ হয়েছিল মোটামুটি। পাশে একটা স্টোর, মানে মালপত্র রাখার গুদোম, যেমন হয় সচরাচর। এ-পাশে ও-পাশে ইটের পাঁজা, পাথরকুচি আর সাদা নুড়ির ভূপ, কিছু লোহালক্কড়, সুরকি। কাজকর্ম বন্ধ বলে দরোয়ান গোছের জনা দুয়েক আছে গুদোমের কাছেই চালার নিচে।
সাইকেলে করে একজন এগিয়ে আসছিল।
হোটেল তৈরির কাজকর্ম যাদের হাতে ছিল, কন্ট্রাক্টার সিংহি, মুনশি তেজনারায়ণ–এদের সঙ্গে আগেই আলাপ করেছেন কিকিরা। লালাবাবু আলাপ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের কোনো কথাই ভাঙা হয়নি। নিষেধ করেছিলেন কিকিরা। রত্নেশ্বর সাংঘাতিকভাবে অসুস্থ-মরাবাঁচার ঠিক নেই–এইটুকুই শুধু জানে তারা। অন্য কিছু নয়।
সাইকেল চালিয়ে যে আসছিল সে একেবারে কাছে এসে নেমে পড়ল। রোদে-পোড়া চেহারা, বয়েস বছর চল্লিশ হবে, পরনে মালকোঁচা-মারা ধুতি, গায়ে হাফশার্ট।
