“আমি দেখেছি।” নটুমহারাজ বললেন। “প্রথমে ওদিকে তাকাবার কথা মনে হয়নি আমার। তখন কী অবস্থা বুঝতেই পারছেন। রত্নেশ্বরবাবু চেয়ার উলটে মাটিতে পড়ে আছেন। অজ্ঞান। ওঁকে নিয়েই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি। পরে যখন দেখি, চোখে পড়ল, হলুদ পালক লাগানো তীরের কটা ছেঁড়া পালকের টুকরো মাটিতে পড়ে আছে। তখনই আমার নজর গেল দেওয়ালের দিকে।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। বুঝতে পারছেন।
লালাবাবু কী বলতে যাচ্ছিলেন, কিকিরাই হঠাৎ বললেন, “মহারাজজি, এবার বলুন তো রত্নেশ্বরবাবু যে পড়ে গিয়েছিলেন, শরীরের কোথায়-কোথায় লেগেছিল? রক্তপাত?”
নটুমহারাজ বললেন, “ওঁর ভারী শরীর। ওইভাবে পড়েছেন আচমকা। কয়েক জায়গাতেই লেগেছিল। মাথায় লেগে একটা জায়গা ফুলে গিয়েছিল। নাকেও লেগেছিল। রক্ত পড়েছিল নাক থেকে। ঘাড়ের কাছে কালসিটে। কপাল কেটে গিয়েছিল অল্প।”
কিকিরা মন দিয়ে শুনলেন সব। তারপর বললেন, “ডাক্তার এসে সবই দেখেছিলেন?”।
“আজ্ঞে, হ্যাঁ।”
“কিছু বলেননি?”
“না, মানে উনি স্ট্রোক বলেই ধরে নিয়েছিলেন।”
কিকিরা চুপ করে থাকলেন সামান্য। পরে বললেন, “নটুবাবু, আপনি কি ডাক্তারবাবুকে আপনার সন্দেহের কথা বলেছিলেন?”
“না,” মাথা নাড়লেন নটুমহারাজ, “কী বলব বলুন! গোড়ায় তো আমার সন্দেহ হয়নি। পরে হয়েছে।”
“থানায় জানিয়েছেন কিছু?”
“আজ্ঞে না। থানায় কী জানাব বলুন! এ তো আমার সন্দেহ। প্রমাণ আমি কোথায় পাব?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। কথাটা ঠিকই। প্রমাণ কিছু নেই। একমাত্র বলা যায়, একটা অজানা, অচেনা লোক রত্নেশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল সন্ধেবেলায়, ঘটনার আগে। সে চলে যাওয়ার পরই রত্নেশ্বরকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
থানায় যদি জিজ্ঞেস করে, লোক এসেছিল তার প্রমাণ কী, মশাই? তাকে কেউ দেখেনি। দেখেছে একটা বাচ্চা মেয়ে। দেখেছে সে চলে যাওয়ার সময়। চেহারাও বলতে পারছে না, বলছে, ভূতের মতন দেখতে! বাচ্চা মেয়ের কথায় বিশ্বাস কী! সে তো ভুলও বলতে পারে, বা মিছে ভয় পেয়েও বলতে পারে।
কিকিরা বললেন, “লালাবাবুকেই যা বলার বলেছেন তা হলে?”
লালাবাবু বললেন, “আমাকেই বলেছেন। খুঁচিয়েও যাচ্ছেন নটুমহারাজ। আমি রায়বাবু, এতসব বুঝি না। তবে নটুমহারাজ আমার পুরনো বন্ধু। আমিও তো কম বার রতনদার সঙ্গে এখানে আসিনি। রতনদা আমার দাদা হলেও বন্ধুর মতন ছিল। তাকে যদি কেউ সত্যি-সত্যি খুন করার চেষ্টা করে থাকে তবে আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।”
তারাপদ বলল, “অন্যরাও তো এতদিনে জেনে গিয়েছে যে, আপনি, আপনারা, এখন আর আগের মতন সেরিব্রাল স্ট্রোকের কথাই ভাবছেন না।”
লালাবাবু বললেন, “তা জেনেছে।”
“সকলেই?”
“হ্যাঁ। যজ্ঞেশ্বর, নিমাই, আনন্দ সবাই জেনেছে।”
“কী বলছে?”
“বিশ্বাস করছে না। বলছে, এমন হতেই পারে না।”
“আপনি নিজে এখন কী মনে করছেন?”
লালাবাবু কিকিরার দিকে তাকালেন। বললেন, “দেখুন, আগে আমার মনে হচ্ছিল নটুমহারাজ পাগলামি করছেন। এখন মনে হয়, ব্যাপারটা সত্যি হলেও হতে পারে। কেননা, যে-লোকটা সেদিন এসেছিল সে তো আর পরে এল না। রতনদা অসুস্থ হওয়ার পর ওই অবস্থায় এখানে দু দিন ছিল। কত লোক এসেছে খোঁজখবর নিতে। কিন্তু সেই লোকটা তো আর আসেনি।”
তারাপদ বলল, “আপনি কেমন করে জানলেন?”
লালাবাবু একটু যেন হাসলেন। বললেন, “সেই লোকটা যদি আসত-নিশ্চয় বলত, সেদিন সন্ধেবেলায় সে এসেছিল আর রতনদাকে সুস্থ অবস্থাতেই দেখেছে। সেটাই স্বাভাবিক হত। নয় কি?”
নটুমহারাজ বললেন, “অন্যরকমও যদি হত, তার চোখের সামনে রত্নেশ্বরবাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে চেয়ার থেকে পড়ে যেতেন, সে নিশ্চয় চেঁচিয়ে লোকজন জড়ো করত। কিন্তু সে কিছুই করেনি। পালিয়ে গেছে লুকিয়ে।”
তারাপদ বলল, “তা আপনি কেমন করে বুঝলেন। লোকটা চলে যাওয়ার পরও তো রত্নেশ্বরবাবু অসুস্থ হতে পারেন।”
“আমি প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে এসেছি।”
“অথচ লোকটিকে আপনি দেখতে পাননি?”
“না। আমি এসেছি বাড়ির পেছন দিক থেকে, আর সে সরাসরি এই ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে ফটক খুলে চলে গিয়েছে।”
লালাবাবু বললেন, “যতই যা বলুন, যে এসেছিল সে যদি ভাল লোকই হবে, তা হলে পরের দিন খবরটা যখন রটে গেল ঘাটশিলায়, নিশ্চয় একবার আসত এবাড়িতে। বলতে আসত যে, রতনদাকে সে একটু আগেই সুস্থ অবস্থায় দেখে গিয়েছিল।”
কিকিরা অস্বীকার করতে পারছিলেন না যুক্তিটা।
সামান্য পরে কিকিরা বললেন, “এই ঘাটশিলায় কেউ কি শত্রু আছে। রত্নেশ্বরবাবুর?”
“শত্রু?”
“হোটেল করা নিয়ে কারও সঙ্গে ঝগড়া বা রেষারেষি হয়েছে?”
“না; জানি না।”
“হোটেলটা কোথায় হচ্ছে?”
“এখান থেকে বেশি দূর নয়। নদীর কাছাকাছি।”
“জায়গাটা কতদিন আগে কেনা?”
“বছর তিন।“
“কোনো নতুন লোক, অচেনা কেউ কি আসত এখানে, হালে?”
নটুমহারাজ বললেন, “কন্ট্রাক্টর, মুনশি, অন্য দু-একজন যারা আসত–তাদের আমি চিনি। তারা পরেও এসেছে।”
“নতুন কাউকে দেখেননি?”
“না। মাত্র একজনকে একবার দেখেছি। “
“সে কে?”
“জানি না। তবে সে কলকাতা থেকে এসেছিল।…বেলায় এল একদিন, দেখা করল। চলে গেল। আর তাকে দেখিনি।”
“আপনি কেমন করে জানলেন কলকাতা থেকে এসেছিল?”
“রত্নেশ্বরবাবুই বলেছিলেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।”
“তার নামধাম?”
