কিকিরা আর তারাপদ কেমন যেন হতবাক!
নটুমহারাজ সামান্য সময় বসে থেকে বললেন, “আমার সন্দেহের আর-একটা জিনিস দেখাই। একটু বসুন।” বলতে বলতে উঠে গেলেন তিনি।
“কিকিরা?” তারাপদ অবাক গলায় বলল।
কিকিরা বললেন, “মিস্টিরিয়াস হে তারাবাবু! হলুদ পালকের তীর। মানে, তীরের পেছনে হলুদ পালক! বুঝতে পারছি না।”
সামান্য পরেই ফিরে এলেন নটুমহারাজ। তাঁর গায়ে সাদা চাদর, উড়নি ধরনের। চাদরের আড়াল থেকে হাত বার করে কী একটা এগিয়ে দিলেন। “দেখুন! এটা আমি তিন-চারদিন পরে বাড়ির বাইরে ঘুরতে-ঘুরতে আকন্দঝোপের তলায় পেয়েছি।”
কিকিরা জিনিসটা নিলেন। অবাক হয়ে বললেন, “গ্লাভস্। তবে একটা। এ তো সার্জিক্যাল গ্লাভস নয়। কমার্শিয়াল। কলকাতার চাঁদনি বাজারে পাওয়া যায়। মোটা রাবারের দস্তানা। একটা আঙুল আবার নেই। অনামিকা কাটা। কেটে আঙুলটা ফেলে দিয়ে-মুখটা আবার জোড়া হয়েছে। এ তো বাঁ হাতের। “
নটুমহারাজ বললেন, “এবার আপনি ভেবে দেখুন। আমি আমার সন্দেহের তিনটে কারণ বললাম : উটকো লোক, হলুদ পালক লাগানো তীর গায়েব, চার-আঙুলের দস্তানা।”
কিকিরা দস্তানা হাতে বসে থাকলেন।
খানিকটা বেলা হয়ে গিয়েছিল। কিকিরারা সবাই সেই বসার ঘরে জড়ো হয়েছেন। এই ঘরেই রত্নেশ্বরকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল।
ঘরটা নজর করে করে দেখছিলেন কিকিরা।
তারাপদ সামান্য সরে গিয়ে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে চারপাশ নজর করছিল। ঘরে লালাবাবু রয়েছেন, রয়েছেন টুমহারাজ।
ঘটনা ঘটেছে অনেকদিন আগে। মাসখানেক হতে চলল। এই ঘরে, সন্ধেবেলায় বসে কাগজপত্র দেখতে দেখতেই রত্নেশ্বর চেয়ার সমেত মাটিতে পড়ে যান। তখন-তখনই জ্ঞান হারান। পরে একসময় চেতনা ফিরে এলেও সেই ঘটনার পর থেকেই তাঁর আর স্বাভাবিক জীবনের কোনো লক্ষণই আর নেই। হ্যাঁ, বেঁচে আছেন এখনও। কিন্তু অক্ষম, পঙ্গু, অথর্ব। মানুষটা কোনো রকমে শরীরে টিকে আছেন, অন্যথায় মৃত বললেও বলা চলে। বড় কষ্টের এই বেঁচে থাকা।
একমাস আগে একদিন কী ঘটেছিল সে অন্য প্রশ্ন। আপাতত কিকিরা ওই ঘরটাই দেখছেন যেখানে রত্নেশ্বর শেষবার টেবিল চেয়ারে বসে কাগজপত্র ঘেঁটেছেন।
তারাপদ বা কিকিরা কেউই বিশ্বাস করেন না, একমাস আগে যখন ঘটনাটা ঘটে তখন ঘরের প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি ঠিক যেভাবে রাখা ছিল–আজও তা থাকতে পারে। সেটা সম্ভব নয়। তবে হ্যাঁ, নটুমহারাজ যতদূর সম্ভব ঘরটার জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে দেননি। তালা বন্ধ করে রেখে দিয়েছেন ঘরটা।
কিকিরা ঘর দেখছিলেন। তারাপদও।
বসার ঘর হিসেবে ভালই। মাঝারি ঘর মোটামুটি। জানলা চারটি। একটা ভারী টেবিল। গোটা তিনেক চেয়ার। একপাশে পিঠঅলা বেঞ্চি। দেওয়ালে কয়েকটা পুরনো ছবি। হরিণের মাথা, ক্যালেন্ডার একটা। সেই তীর রাখা কাঠের বোর্ড।
কিকিরা বললেন, “ঘরের জিনিসপত্র নাড়াচাড়া হয়েছে নিশ্চয়।”
নটুমহারাজ বললেন, “খানিকটা তো হয়েছে। তখন কে বুঝেছিল…।”
“ওই টেবিলের সামনে রত্নেশ্বর বসে ছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“ওই চেয়ারে?”
“হ্যাঁ।”
তারাপদ বলল, “কিকিরা, চেয়ার-টেবিল যেভাবে আছে তাতে চেয়ারে বসে সামনের দিকে মুখ তুললেই ঘরে ঢোকার দরজা চোখে পড়ে।”
লালাবাবু বললেন, “দরজার দিকটা পুব। রতনদার বসার চেয়ার-টেবিল ছিল পশ্চিমের দেওয়াল ঘেঁষে।”
“ওটা তবে দক্ষিণ? দু পাশে দুটো জানলা।“
“হ্যাঁ।”
“বারান্দার দিকে–মানে উত্তরেও একটা জানলা রয়েছে। আর পশ্চিমের দিকেও একটা।”
“হ্যাঁ।”
কিকিরা নটুমহারাজকে বললেন, “টেবিলে কী কী ছিল নটুবাবু?”
“কাগজপত্র। হোটেলের প্ল্যানের ড্রয়িং কাগজটা। হিসেবপত্রের একটা খাতা। টুকিটাকি রসিদের কাগজ। সব কি আর মনে আছে?”
“আর কী ছিল?”
“শরবতের গ্লাস, বরফজলের কুঁজো কাচের ছোট কুঁজো। পান আর জরদার কৌটো।”
“রত্নেশ্বরের হাতের কাছেই সব ছিল?”
“সেইরকমই থাকত।”
“টেবিলের বাতিটা কোথায় ছিল? কেরাসিনের বাতি তো!”
“বাতিটা একটু তফাতে সরানো ছিল। এ বাড়িতে ইলেকট্রিক নেই।”
“টেবিলের জিনিসগুলো তো আপনারা তুলে নিয়েছিলেন?”
“তা তো নিয়েইছি। তখন আর অন্য ভাবনা মাথায় আসেনি।”
“রত্নেশ্বরবাবুর মুখোমুখি টেবিলের এপাশে কি দুটো চেয়ারই ছিল? মনে আছে আপনার?”
“একজোড়া চেয়ারই বরাবর থাকত, লোকজন এলে বসার জন্যে।”
তারাপদ ঘরের মধ্যে নড়াচড়া করছিল। দেখছিল। পুবের জানলার পাশে, বাইরে করবী আর কলকে ফুলের ঝোপ। অন্য গাছও আছে। পশ্চিমের জানলার পেছনে মস্ত বাতাবি লেবুর গাছ। বাগানের পাঁচিলটা চোখে পড়ে না, ঝোপে আড়াল পড়েছে।
কিকিরা কিছু বলার আগেই লালাবাবু বললেন, “রায়বাবু, ঠিক এইখানটায় রতনদা পড়ে ছিল।” বলে টেবিলের পেছন দিকে ডানহাতি মেঝেটা দেখালেন।
কিকিরা নটুমহারাজের দিকে তাকালেন। লালাবাবু ঘটনার সময় এখানে ছিলেন না। তিনি পরে শুনেছেন। টুমহারাজ জানেন ঠিকঠাক। তা ছাড়া তিনিই প্রথম এ-ঘরে ঢুকে রত্নেশ্বরকে পড়ে থাকতে দেখেন।
নটুমহারাজ মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ, লালাবাবুর দেখানো জায়গাটাতেই রত্নেশ্বরকে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন তিনি।
কিকিরা কয়েক পা সরে গিয়ে তীর রাখা বোর্ডটার দিকে তাকালেন। দেখলেন। দেওয়াল-আলমারির পাল্লা খুললেন। দেখলেন ভেতরটা। পুরনো আবর্জনা জমানো আছে বললেও ভুল হয় না। নিচের দিকে ছেঁড়া বই, পাঁজি, রঙের ফাঁকা কৌটো, ব্রাশ, আরও কিছু কিছু। বললেন, “অন্য তীরগুলো ঠিক-ঠিক আছে?”
