“চুয়ান্ন। চুয়ান্ন বছর দু-এক মাস হতে পারে।”
“আপনার সন্দেহের কারণটা বলুন!” কিকিরা বললেন।
নটুমহারাজ বললেন, “কারণ তো একটা নয়, রায়মশাই; কয়েকটা। এক-এক করে বলি তবে?”
কিকিরা মাথা হেলালেন। লালাবাবুর মুখ থেকে যা শুনেছেন তিনি, তার মধ্যে ছাড়-ছোড় থাকতে পারে। আসল লোকের কাছ থেকে শোনাই ভাল।
“আমার প্রথম সন্দেহ, সেই উটকো লোকটা। সে কে? সে কেন এসেছিল, কেনইবা পালিয়ে গেল লুকিয়ে?”।
তারাপদ বলল, “পালিয়ে গিয়েছিল তা কি আপনি চোখে দেখেছেন?”
“না, না। আমি যদি দেখতাম তবে তো চিনতেই পারতাম। আমি না দেখলেও তাকে একজন দেখেছে। সে বাচ্চা মেয়ে। রত্নেশ্বরবাবুর ভাইঝি। ও মিথ্যে কথা, বাজে কথা বলবে না। বাচ্চারা এসব ক্ষেত্রে বলে না। ও যা বলে–তাতে তো বোঝাই যায়–লোকটা পালিয়েই গিয়েছিল।”
“মেয়েটি তো বলে লোকটা ভূতের মতন দেখতে। আমাদের কি তাই বিশ্বাস করতে হবে?তারাপদই বলল।
“না। তবে আমাদের ভাবতে হবে, বেয়াড়া চেহারার কেউ যদি অন্ধকার জায়গা দিয়ে ছুটে পালিয়ে যায়–তাকে ভূত বলেই মনে কতে পারে বাচ্চারা। …চোর-ছ্যাঁচড়ও ভাবতে পারে। তবে এখানে ওই ঋকি বলছে ভূতের মতন দেখতে।”
কিকিরা স্বীকার করলেন কথাটা। তাঁরও ওইরকম ধারণা। বললেন, “উটকো লোকটা কে হতে পারে নটুবাবু? আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন?”
মাথা নাড়লেন টুমহারাজ। “আমার মাথায় আসছে না, উটকো লোকটা কে হতে পারে?”
“একটা উটকো লোক হঠাৎ এল আর পালিয়ে গেল কেন, এইটেই আপনার সন্দেহের প্রথম কারণ?”
“হ্যাঁ। তারপর আমি যখন ওই ঘরে গেলাম, দেখলাম রত্নেশ্বরবাবু চেয়ার সমেত উলটে মাটিতে পড়ে আছেন। জ্ঞান নেই।”
“ঘরে বাতি ছিল?”
“টেবিলের বাতিটা জ্বলছিল। কেরোসিন ল্যাম্প।”
“টেবিলের জিনিসপত্র অগোছালো খানিকটা।”
“ও! তারপর?”
“আরও একটা জিনিস চোখে পড়ল। অবশ্য পরে পড়েছে।”
“কী?”
“তীরের হলুদ পালক।”
“তীর?”
“তীর-ধনুকের তীর। অ্যারো। …দেওয়ালে ঝোলানো একটা বোর্ডের ওপর রাখা থাকত।”
কিকিরা আর তারাপদ অবাক হয়ে নটুমহারাজের কথা শুনছিল। লালাবাবুর মুখে তীরের কথা শোনেননি কিকিরা। তা না শুনুন, রত্নেশ্বরের অসুস্থতার সঙ্গে তীরের সম্পর্ক কোথায়? আর যদি রত্নেশ্বরকে কেউ খুন করার চেষ্টা করে থাকে, তার সঙ্গেও বা কী সম্পর্ক তীরের? কেউ কি আর তীর ছুঁড়ে তাঁকে মেরেছে? অসম্ভব।
কিকিরা বললেন, “বুঝতে পারছি না, মহারাজ? দেওয়ালে তীরই বা থাকবে কেন?”
নটুমহারাজ সামান্য চুপ করে থেমে বললেন, “রায়মশাই, বসার ঘরে একটা ছোট দেওয়াল-আলমারি থাকা, দু-চারটে ছবি টাঙানো থাকা নতুন তো নয়। বসার ঘরে, শোওয়ার ঘরে থাকে অনেকেরই। আলমারি না হোক, দেওয়াল থাক। …ওই ঘরটা তো একসময় আমারই বসার ঘর ছিল। সাজানোও ছিল সেভাবে। ওখান থেকে আমি আসবাবপত্র তেমন কিছু সরাইনি। পড়ে আছে, থাক। কোথায় সরাব! আমি এখন যে-ঘরে থাকি সেখানে ওগুলো রাখার জায়গা কই! …তা দেওয়াল-থাকায় পাল্লা দেওয়া ছিল, পাল্লার নিচের দিকটা কাঠ, ওপরে কাঁচ। ওর মধ্যে হাবিজাবি অনেক কিছু পড়ে ছিল। পুরনো। যেমন থাকে। আর দেওয়ালে একটা বোর্ড ঝোলানো ছিল একপাশে ছবিটবি যেমন থাকে। ওই বোর্ডে তিনটে তীরও রাখা ছিল পাশাপাশি। …আমি আলমারি থেকে নিজের হাতে দু একটা জিনিস বার করে নিলেও বাকি যেমন ছিল সব পড়েই থাকত। কেউ হাত দিত না। হাত দেওয়ার দরকার হত না।”
“তীরের ব্যাপারটা বলুন?”
“বলছি। তার আগে বলি, এবারে রত্নেশ্বরবাবু যখন হোটেল বাড়ি করবার মতলব নিয়ে এখানে এসে চেপে বসলেন, উনি ওই বসার ঘরটাকে একই সঙ্গে বসা আর অফিসঘর মতন করে ফেললেন। আমি তখন তাঁকে বলেছিলাম, ঘরটা সাফ করে দিই–আপনার সুবিধে হবে। উনি বারণ করলেন। বললেন, এখন থাক, পরে দরকার পড়লে দেখা যাবে। কাজেই জিনিসগুলো পড়েই ছিল। …আর আপনি যে তীরগুলোর কথা জিজ্ঞেস করছেন, ওগুলো আমার।
আমি এককালে ভাল তীরন্দাজ ছিলাম। ওগুলো আমার প্রাইজ। কালা, লালা, পিলা…!”
“মানে? আপনি তীরন্দাজ ছিলেন?” তারাপদর চোখের পাতা পড়ছিল।
“হ্যাঁ। সে অনেক পুরনো কথা। পরে সে গল্প শুনবেন। এখন যা বলছিলাম–ওই কালা, লালা, পিলা মানে কালো, লাল, হলুদ পালক দেওয়া তীর। এগুলো হল র্যাংকিং, ওয়ান টু থ্রির মতন। আমি পেয়েছিলাম একসময়, একই বছরে নয়, পরপর তিন বছর।”
“কে, মানে কারা দিত প্রাইজ?”
নটুমহারাজ একটু হেসে বললেন, “এসব দেহাতি কম্পিটিশান। রাঁচির দিকে একটা মেলায় আদিবাসীরা তখন তীর খেলার কায়দা দেখাত। কম্পিটিশান হত। আমি নেমে যেতাম। এই আর কী!”
কিকিরা কিছুক্ষণ নটুমহারাজের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শেষে বললেন, “তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু মহারাজ, আপনি হঠাৎ তীরের কথা তুলছেন। কেন?”
নটুমহারাজ বললেন, “আমার সন্দেহ হচ্ছে। আপনাকে তবে বলি, রত্নেশ্বরবাবুকে ওই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে আমি ভেবেছিলাম, হয়ত তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে পড়ে গিয়েছেন, মাথা ঘুরে গিয়েছে, ফেইন্ট হয়ে গিয়েছেন। টেবিলে বরফজলের কুঁজো ছিল। কাচের কুঁজো। জল নিয়ে মুখেচোখে দিতে লাগলাম। লোক ডাকাডাকি করলাম। তখন আমার কিছুই খেয়াল হয়নি। লক্ষও করিনি। ..পরের দিন ঘরটা ভাল করে নজর করতে এসে চোখে পড়ল, ক’টা ছেঁড়া হলুদ পালক মাটিতে পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে কেমন সন্দেহ হল। ঘরের দেওয়ালের দিকে তাকালাম। দেখি, বোর্ডের মধ্যে রাখা হলুদ পালক গোঁজা তীরটা নেই।
