কাল রাত্রেই, এখানে আসার পর ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। লালাবাবুই পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য নিছক পরিচয়ই। কথাবার্তা বলার সুযোগ বা সময় তখন ছিল না।
নটুমহারাজ মানুষটিকে দেখলে মহারাজ বলে মনে হয় না। গেরুয়ার কোনো চিহ্ন নেই বেশবাসে। সাদা ধুতি, গায়ে ফতুয়া, একটা পাতলা চাদর–এই হল তাঁর বেশ। পায়ে মামুলি চটি। মাথার চুল বড় বড়, মেয়েদের মতন; চুলগুলো ঝুঁটি করে মাথার ওপর বেঁধে রাখেন। গোঁফ-দাড়ির জন্য মুখটা ভাল করে দেখা যায় না। নাক, চোখ, কপালই যা চোখে পড়ে।
মহারাজের চেহারাটি রোগা। তবে পোক্ত। মাথায় বেশ লম্বা। গায়ের রং তামাটে।
কিকিরা তারাপদকে ইশারায় এগুতে বলে কুয়াতলার দিকে পা বাড়ালেন।
নটুমহারাজও এগিয়ে এলেন।
কিকিরা দু’হাত তুলে নমস্কার করলেন মহারাজকে। “নমস্কার মহারাজ!”
এগিয়ে এসে নটুমহারাজও নমস্কার জানালেন দুজনকেই।
“এর মধ্যেই উঠে পড়েছেন?” নটুমহারাজ বললেন।
“অনেকক্ষণ। আমি আগেই উঠেছি, তারাপদ একটু আগে উঠল!… ভোরে-ভোরে পায়চারি করছিলাম খানিকটা। বড় ভাল লাগছিল। ফ্রেশ বাতাস, ফাঁকা জায়গা, পায়ের তলায় ঘাস–এসব আর আমাদের কলকাতায় কোথায় পাব বলুন? আপনি বোধ হয় ভোরে ভোরেই ওঠেন?”
“অভ্যেস বরাবরের। স্নান করে নিচ্ছিলাম।”
“এত তাড়াতাড়ি?”
নটুমহারাজ মাথা নোয়ালেন। “সকালেই কুয়াতলায় দাঁড়িয়ে স্নান সেরে ফেলি। এখন গরমকাল। আরাম পাই। শরীর ঠাণ্ডা থাকে। বিকেলেও একবার সারতে হয়। এখানে দুপুরটায় গরম পড়ে। সন্ধের পর আর অতটা গরম থাকে না।”
“বৃষ্টি কেমন হচ্ছে মহারাজ?”
“গত হপ্তায় দিন দুই ভালই হয়েছিল। সবেই বর্ষা পড়ল।”
“কলকাতায় এখনো বর্ষা নামল না। কবে নামবে কে জানে।”
“লালাবাবু ওঠেননি!”
“দেখতে তো পেলাম না।”
“চা খেয়েছেন?”
“না।”
“আমি দেখছি! গুরুচরণ..”
“আরে না না, আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না।”
কিকিরাদের সঙ্গে কলকাতা থেকে গুরুচরণও এসেছে। রান্নাবান্না, চা, জলখাবার তারই করার কথা। গতকাল রাত্রে এখানে এসে পৌঁছবার পর অবশ্য কলকাতার বাড়ি থেকে আনা খাবারদাবার খেতে হয়েছে। না আনলেও চলত, এখানে স্টেশনের কাছে আশেপাশে খাবারের দোকান কম নেই।
নটুমহারাজ বললেন, “তা এক কাজ করুন না। আমার ডেরায় গিয়ে বসবেন চলুন। দশ-পনেরো মিনিট। সেখানেই না হয় এক পেয়ালা চা খাবেন…”
কিকিরা বললেন, “আপনি এখন স্নান করবেন। তারপর জপতপ…”
নটুমহারাজ মাথা নাড়লেন। “স্নান করতে মিনিট দশ পনেরো। জপতপ আমার নেই রায়মশাই। সন্ধেবেলায় নিজের মনে একটু গানটান গাই, দু-চার পাতা পড়ি। চলুন আপনারা, বসবেন সামান্য। সংকোচ করবেন না।”
কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন। “চলো তারাপদ।”
অল্প একটু এগিয়ে টুমহারাজের ডেরা। বারান্দায় কাঠের চেয়ার, একটা চৌকিও পড়ে ছিল। একপাশে ভাঙা দড়ির খাটিয়াও পড়ে আছে একটা।
নটুমহারাজ বললেন, “বসুন। আমি স্নানটা সেরে আসি। দেরি হবে না। চা আমি নিজেই করব।”
“আপনার লোক?”
“জটা। সে এখনো আসেনি। এসে পড়বে। কাছেই থাকে।”
“আপনার এখানে থাকে না?”
“থাকে। ওর দিদির অসুখ। কদিন বাড়ি চলে যাচ্ছে সন্ধের পর। …বসুন আপনারা।” নটুমহারাজ আবার কুয়াতলার দিকে চলে গেলেন।
.
০৪.
দেখতে-দেখতে বোদ ছড়িয়ে গিয়েছিল সর্বত্র। সকালের সেই হালকা স্নিগ্ধভাব আর যেন নেই, উজ্জ্বল ঝকমকে হয়ে উঠছিল রোদ।
চা খেতে-খেতে কিকিরা বললেন, “মহারাজ, …আপনাকে বলছি বলে কিছু মনে করছেন না তো!”
“না না, বলুন।”
“বলছিলাম, রত্বেশ্বরবাবু যে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েননি, তাঁর যে সেরিব্রাল স্ট্রোক মতন হয়নি, তাঁকে কেউ খুন করার চেষ্টা করেছিল–এমন সন্দেহ আপনি কেন করছেন? কী দেখেছেন আপনি যাতে।”
কিকিরাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে নটুমহারাজ বললেন, “হাঁ, আমি সন্দেহ করছি। কেন করছি লালাবাবু আপনাকে বলেননি?”
“বলেছেন। তবে আমার মনে হয়, তিনি গুছিয়ে বলতে পারেননি। তিনি তো এখানে হাজির ছিলেন না। আপনার মুখ থেকেই শুনতে চাই।”
তারাপদ কোনো কথা বলছিল না। নটুমহারাজকে দেখছিল আর প্রত্যেকটি কথা মন দিয়ে শুনছিল।
নটুমহারাজ একটু চুপ করে থেকে বললেন, “রত্নেশ্বরবাবুকে আমি বেশ কয়েক বছর ধরেই চিনি। তিনি আমার বন্ধুর মতনই হয়ে উঠেছিলেন। নানান। গল্প করতেন, নিজের কথা বলতেন, পারিবারিক কথাও। আমি যতদূর তাঁকে জানি, তাঁকে দেখছি–তাতে বলতে পারি, তাঁর কোনো ভারী অসুখবিসুখ ছিল না। স্বাস্থ্য ভাল ছিল, পরিশ্রম করতে পারতেন, খাওয়াদাওয়া করতেন মুখের রুচি মতন, ধরাবাঁধা মানতেন না। আপনি নিশ্চয় তাঁকে দেখেননি। দেখলে বুঝতে পারতেন, শরীর যেমন বিশাল ছিল, স্বাস্থ্যও ছিল মজবুত। দোষের মধ্যে মাথা গরম মানুষ ছিলেন, চেঁচামেচি করতেন সামান্যতেই। ঠিক রগচটা মানুষ বলব না ওঁকে, বলব বলব–মাথা গরম স্বভাব। কথা বলার অভ্যেসটাই ছিল চড়া ধরনের। অন্য দোষ বলতে কিছু দেখিনি। পান-জরদা খেতেন। সিগারেট কদাচিৎ। …ওঁর কোনো অসুখ ছিল না। এমনকী হালেও হয়নি। কেননা রত্নেশ্বরবাবু আমায় বলেছিলেন, কিছুদিন আগে একবার চেক আপ করিয়েছিলেন কলকাতায়। ডাক্তাররা কোনো খুঁত পায়নি। প্রেশার হয়ত অল্পস্বল্প চড়ত কখনো।
“বয়েস কত হয়েছিল?” তারাপদ বলল।
