একেবারে ভোর-ভোর উঠে পড়েছিল তারাপদ। উঠে দেখল, কিকিরা আরও আগে-আগে উঠে পড়ে বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন।
চোখমুখ ধুয়ে নিয়ে তারাপদ বাইরে গেল। কিকিরার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল।
কিকিরা বললেন, “কেমন ঘুম হল হে?”
“নতুন জায়গা, মাঝরাত পর্যন্ত ঘুমোতে পারিনি। পরে কখন..”
“হয় ওরকম। তা কেমন দেখছ তারাবাবু?”।
খারাপ লাগার কথা নয়, ভালই লাগছিল তারাপদর। একেবারে ভোরের দিক। সবে সূর্য উঠেছে। আকাশময় রোদ ছড়িয়ে পড়েনি, আলো হয়ে রয়েছে অবশ্য, মাটিতেও রোদ নেই সর্বত্র, ভোরের ভাবটুকু মাখানো আছে ছোট-ছোট গাছপালায়, বাগানে, মাঠে। এখন যদিও আষাঢ়, তবু কোথাও মেঘ দেখা যাচ্ছিল না আকাশে। গরমকালের সকাল। দেখতে-দেখতে রোদ অবশ্য চড়ে যাবে। তবে আপাতত বাতাস ঠাণ্ডা, চারপাশ বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছিল।
তারাপদ বলল, “জায়গাটা বেশ তো! পাহাড়ি ধরনের।”
“সামনেই নদী, সুবর্ণরেখা।”
“কই?”
“ফটকের বাইরে গিয়ে খানিকটা এগুলেই দেখতে পাবে।”
“আপনি দেখেছেন?”
“আমার তো একটা সারকেল হয়ে গেল। আলো ফোঁটার আগেই উঠে পড়েছি।”
“উঠে সারকেল দিচ্ছিলেন?” তারাপদ হেসে বলল।
কিকিরা মাথা নাড়লেন।
“স্টেশন থেকে কতটা দূর, কিকিরা?”
“খুব বেশি নয়। বাজার-স্টেশন তো গায়ে-গায়ে। এই বাড়িটা ধরো হাঁটাপথে বিশ-পঁচিশ মিনিট। সামান্য বেশিও হতে পারে।”
“বাড়িটা বেশ নিরিবিলি জায়গায়। কাছাকাছি আর বাড়িও দেখছি না।”
“আছে। ওই তোমার ওদিকে দুটো বাড়ি আছে। ছোট। একটা শুরু হওয়ার পর আর শেষ করা হয়নি, সিকি-ফিনিশড। আর-একটা আছে, কটেজ ধরনের। খুবই ছোট।”
“তা হলেও ফাঁকা। নিরিবিলি।”
“তা তো হবেই। ঘাটশিলায় কে আর এদিকে ঘিঞ্জির মধ্যে বাড়ি করতে চাইবে?”
কিকিরা আর তারাপদ হাঁটতে লাগলেন। পায়চারি করার মতন ধীরে-ধীরে।
তারাপদ বলল, “এই বাড়িটা আপনি দেখেছেন ভাল করে?”
“না। তবে আইডিয়া পেয়েছি। হাফ বাংলো টাইপের বাড়ি। সামনে টানা বারান্দা, ডান পাশে বসার ঘর। বাঁ পাশে একটা ভেতর-ঘর। অন্দরমহল পেছন দিকে। গোটা দুই ঘর থাকতে পারে। রান্না, খাওয়ার ঘর পেছন দিকে। পেছনের বারান্দা ঘেরা রয়েছে জাফরি দিয়ে।”
“আবার কী! ভালই। গাছপালাও তো যথেষ্ট।”
“যথেষ্ট মানে? এ একেবারে জঙ্গল। বড় বড় গাছই চার পাঁচটা, ঝোপঝাড়, জঙ্গলা বাগান।… নো ক্লিনিং, নো গার্ডেনিং, বুঝলে।” কিকিরা হেসে-হেসে বললেন।
তারাপদ অস্বীকার করতে পারল না। বাড়ির সামনে পাশে গাছপালা যেন বড় বেশি। বাগান নিয়েও কেউ মাথা ঘামাত না। জঙ্গল হয়ে আছে।
“লালাবাবু এখনও ঘুমোচ্ছেন নাকি?” তারাপদ বলল।
“বোধ হয়।”
“স্যার, ওই যে বসার ঘর। এখানেই তো ঘটনাটা ঘটেছে।”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “হ্যাঁ।”
“ঘরটা আমরা কখন দেখব?”
“সকালেই দেখব।”
তারাপদর কী মনে হল, বলল, “স্যার, এতদিন পরে ঘরটা দেখে কি কিছু আন্দাজ করা যাবে?”
কিকিরা মাথা দোলালেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “কথাটা ঠিকই তারাপদ! ওঁরা তো বলছেন, ঘটনাটা ঘটার পর প্রথম দু-একদিন সকলের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল–তখন কেউ আর ওই ঘরটা নিয়ে মাথা ঘামাতে বসেননি। পরে নটুমহারাজ ঘরের জানালা বন্ধ করে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেন। লালাবাবুকেই শুধু একবার ঘরটা দেখিয়েছিলেন তালা খুলে।”
তারাপদ পাকা গোয়েন্দার মতন বলল, “সার, ধরুন যদি এটা কিলিং-ই হয়, দু’দিনে কেন, দু’ঘণ্টার মধ্যেও প্রমাণ লোপাট হয়ে যাওয়ার কথা।”
“বিলকুল সহি বাত বিলকুল–!” কিকিরা মজা করে বললেন, হিন্দিতে। তারপর একটু থেমে বললেন, “তবে একটা কথা। বেড়ালেরা সব সময় ইঁদুর চোখে দেখে না, কিন্তু গন্ধ পায়। আমাদেরও নাকের পাওয়ার বাড়াতে হবে। স্মেলিং করতে হবে হে তারাবাবু! লাইক এ ক্যাট।”
“আমার নাক কিন্তু ভোঁতা,” তারাপদ বলল মজার গলায়।
“আমার নাক খাড়া ছিল। যৌবনকালে। তারপর হক্সনসাহেবের সঙ্গে পাঁচ রাউন্ড বক্সিং লড়লাম। বেটা এমন পাঁচ সাতটা পাঞ্চ দিল নাকে–যে অমন খাড়া নাকের হাড় ভেঙে সামান্য বসে গেল। নয়ত দেখতে স্মেলিং কাকে বলে!”
তারাপদ হেসে উঠল। “হক্সনসাহেবটি কে?”
“সান অব অ্যান্ডারসন, ব্রাদার অব জনসন। হক্সন আমার বন্ধু ছিল। এমনিতে বরফকলের মালিক, সোড়া-লেমনেডের কারখানাও ছিল। টেরিফিক হকি প্লেয়ার, আবার শখের ম্যাজিশিয়ান। জাপানি খেলা দেখাত। ভেরি গুড ফ্রেন্ড। “
“তবু আপনার নাকে ঘুষি মারল…তারাপদ হাসছিল।
“সে তো বেটিং লড়তে গেলে অমন হয়। না পারলে মার খাবে। মার খেলেও হাত-পা ছড়িয়ে নো চিত…!”
“নো চিতম! মানে?” তারাপদ অবাক।
“মানে, হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে থাকবে না। আবার উঠে পড়বে হে!”
তারাপদ হো-হো করে হেসে উঠল।
কিকিরা বললেন, “ধরো এই যে কেসটা আমরা হাতে নিতে যাচ্ছি–এটাতে তো হারতেই পারি, একেবারে চিত হয়ে পড়ে গেলাম। তা বলে কি বুক চাপড়ে হায় হায় করব! নো। নেভার।” বলতে বলতে কিকিরা চোখের ইশারায় কী যেন দেখালেন।
তারাপদ তাকাল। নটুমহারাজ দাঁড়িয়ে আছেন, সামান্য তফাতে। তাঁর বাড়ির কাছে, কুয়াতলার পাশেই।
এই বাড়িটার খানিকটা পেছনে লম্বা টানা ছোট মতন এক বাড়ি। কোনো বাহারি ভাব নেই, একেবারে সাদাসিধে। তবে পাকা দালান-১’সামনে বারান্দা। পেছনে দুটো ছোট-ছোট ঘর। একপাশে সরু গলি মন। বোধ হয় পেছনে এক-আধটা ঘর আছে। এইটেই এবাড়ির আউট হাউস। নটুমহারাজের আস্তানা।
