কিকিরা বললেন, “ফুটফুটি কোথায়?”
“ডাকব?”
“জেগে আছে, না, ঘুমিয়ে পড়েছে?”
“না না, এত তাড়াতাড়ি ঘুমোবে কী! ওকে বিছানায় ফেলতে ফেলতে নটা বেজে যায়। ভীষণ চঞ্চল, দুষ্টু। খানিকটা আগে ওর মায়ের সঙ্গে ফুটি খাওয়া নিয়ে চেল্লাচিল্লি করছিল।”
“তা হলে ডাকুন একবার।”
লালাবাবু চলে গেলেন।
তারাপদ অনেকক্ষণ থেকেই ঘরটা নজর করছিল। ঘর বড়। দরজা-জানলাও পোক্ত। সেকেলে বাড়ির মতনই সব। ঘরের আসবাবপত্র পুরনো ধরনের। ভারী সোফা সেটি, আর্ম চেয়ার একপাশে, কোণের দিকে অ্যাকুইরিয়াম, মাছ, জল কিছুই নেই, ফাঁকা পড়ে আছে, দরজার গা-ঘেঁষে পাতাবাহারের একটা টব। দেওয়ালে দু-তিনটি ছবি, মায় একটা বড়সড় ক্যালেন্ডার।
তারাপদ হঠাৎ বলল, “স্যার, আপনি অন্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন?”
“বলেছি। যজ্ঞেশ্বরের স্ত্রীর কাছে আলাদা খবর পেলাম না কিছুই। মহিলা যেন মরে আছেন। কথা বলবেন কী, কাঁদেন শুধু।”
“যজ্ঞেশ্বর?”
“সে কেমন হতভম্ব হয়ে রয়েছে। ভিতুই হয়ত। তবে সে মনে করে না– দাদাকে কেউ খুন করতে গিয়েছিল।”
“আর সেই খুড়তুতো ভাই?”
“নিমাই। বেলেঘাটার কারখানা দেখত। এই বাড়িতেই থাকত এতদিন, এখন বেলেঘাটাতেই থাকে।”
“ও না এ-বাড়ির আশ্রিত ছিল?”
“আশ্রিত তো বটেই। তবে হালে অন্য জায়গায় থাকছে। কাজকর্ম দেখার সুবিধে হবে বলে।”
“সে কী বলে?”
“খুন করার চেষ্টা বলে সে সন্দেহ করে না।”
“কেমন লোক?”
“দেখতে নিরীহ। তবে বোকা নয়।”
“বাসের কারবার যে দেখত।”
“আনন্দ। সেটা একেবারে বকেশ্বর। টকিং মুখ। অনবরত কথা বলে আর কান চুলকোয়। চেহারাটা ষণ্ডামার্কা। মুখ হলেও গোবেচারা নয়।… তা সেও খুনটুনের ব্যাপার বলে মনে করে না।”
“তা হলে?”
“তা হলে আর কী! আমি জনে-জনে জিজ্ঞেস করেছি। ধীরুবাবুকে, গুরুচরণকে, কমলাকে। তারা কেউ বলেনি, বাড়ির কর্তাকে কেউ খুন করার চেষ্টা করেছিল।”
“শুধু লালাবাবু সন্দেহ করেছেন?”
“লালাবাবু আর নটুমহারাজ। এঁরা দুজনই অন্য সন্দেহ করছেন। তবে লালাবাবুর প্রথমটায় সন্দেহ হয়নি, নটুমহারাজই মাথায় ঢুকিয়েছেন। নটুমহারাজকে আমি দেখিনি। কথাবার্তাই বা বলব কেমন করে? ঘাটশিলায় না-যাওয়া পর্যন্ত ব্যাপারটা বোঝা যাবে না। চোখে দেখি, কানে শুনি–তারপর..”
এমন সময় লালাবাবু এলেন। সঙ্গে ফুটফুটি।
ফুটফুটিই বটে? দেখতে বড় সুন্দর। তবে রোগা। গায়ের রং, গড়ন, চোখমুখে যেন খুঁত নেই। গায়ে পাতলা ফ্রক। মাথার চুল বব করা। বয়েস যে সাতটাত হবে– তা বোঝা যায়।
কিকিরার সঙ্গে ফুটফুটির বেশ আলাপ। এসেই ফুটফুটি বলল, “কী এনেছ? আমার ফটাফট আননি?”
কিকিরা পকেট থেকে খেলনাগুলো বার করে কাছে ডাকলেন। “এই যাঃ! ফটাফট তো ভুলে গিয়েছি পিসিমণি!”
“পিসিমণি বলবে না।”
“মাসিমণি?”
“না।”
“তা হলে মণি।”
“ফুটফুটি বলবে।” বলতে বলতে এগিয়ে এসে খেলনাগুলো নিল।
ফুটফুটি যখন খেলনা দেখছে, ভেতর থেকে চা এল।
কিকিরা এবার একটা চকোলেটের প্যাকেট বার করে ফুটফুটিকে দিলেন। বললেন, “ম্যাজিক দেখবে?”
“দেখব!”
কিকিরা বললেন, “আমি ওপরের দিকে হাত তুলব–আর একটা করে টফি চলে আসবে।”
“কই দেখি?”
কিকিরা হাত তোলেন মাথার ওপর, আর একটা করে টফি বার করেন মুঠো থেকে।
ফুটফুটি খেলনা ভুলে ম্যাজিক দেখছে। যত অবাক, তত খুশি।
কিকিরা হাতের চার-পাঁচটা টফি ওর ছোট্ট-ছোট্ট হাতে গুঁজে দিলেন।
“কে তোমায় টফি দিল?” ফুটফুটি জিজ্ঞেস করল।
“ভূত!”
“যাঃ!” ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল ফুটফুটি।
“কেন?”
“ভূত আবার টফি দেয় নাকি?”
“চাইলেই দেয়। সেদিন তুমি যে-ভূতটাকে দেখেছিলে তার কাছেও টফি ছিল।”
“মিথ্যে কথা।”
“কেন! ভূতটার কাছে তুমি কি টফি চেয়েছিলে?”
“বাব্বা! আমার বুঝি ভয় করে না। সে দৌড়ে চলে গেল।”
“বড় ভূত নাকি?”
“অ্যাত্ত বড়।” বলে ফুটফুটি ওপর দিকে হাত তুলে বোঝাবার চেষ্টা করল ভূতটা কত লম্বা ছিল।
কিকিরা বললেন, “ভূতের মুখটা কেমন দেখতে ছিল?”
“বিচ্ছিরি।”
কিকিরা তারাপদর দিকে আড়চোখে তাকালেন একবার। তারপর ফুটফুটিকে বললেন, “কী পরে ছিল মনে আছে? ভূতরা ধুতি পরলে একরকম, প্যান্ট পরলে আর-একরকম।”
ফুটফুটি যেন মনে করবার চেষ্টা করল। তারপর বলল, “প্যান্ট।”
“ঠিক বলছ?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি একলাই দেখলে? আর কেউ ছিল না কাছে?”
“না।”
কিকিরা বললেন, “আচ্ছা, তুমি যাও!”
ফুটফুটি চলে গেল।
চায়ের কাপ তুলে নিতে-নিতে কিকিরা এবার বললেন, “লালাবাবু, ঘাটশিলায় না যাওয়া পর্যন্ত কিছুই আন্দাজ করতে পারছি না। আর দেরি করা উচিত নয় আমাদের। শুক্রবারই চলুন।”
.
০৩.
ঘাটশিলায় নটুমহারাজের বাড়িটি দেখতে-দেখতে কিকিরা বললেন, “কেমন দেখছ তারাবাবু?”
তারাপদর ভালই লাগছিল। আগের দিন রাত্রের দিকে তারা এসেছে। একেবারে নতুন জায়গা বলে তারাপদ ঠিক ধারণাও করতে পারেনি স্টেশন থেকে কত দূর, বা এটা স্টেশনের কোন দিকে পড়েছে।
নটুমহারাজের বাড়িতেই তাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সেই বাড়ি–যেখানে রত্নেশ্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন হঠাৎ, কিংবা তাঁকে খুন করার চেষ্টা হয়। তা এই বাড়িতে সব ব্যবস্থাই আছে। রত্নেশ্বর ঘাটশিলায় এসে বরাবর এই বাড়িতে উঠতেন বলে বাড়িটাকে মোটামুটি গুছিয়ে রেখেছিলেন। শোওয়াবসা-খাওয়া–কোনো কিছুরই ভাবনা-চিন্তা করতে হত না। সবই ছিল, গোছানো থাকত। আর এবার, যেহেতু রত্নেশ্বর অনেকদিন থাকবেন, একটানা না পারলেও প্রায়ই থাকবেন, হোটেল তৈরির কাজকর্ম দেখবেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে, নটুমহারাজের বাড়িটা আপাতত বছরখানেকের জন্য ভাড়া নেওয়া ছিল। সেই ভাড়া এখনো নেওয়া রয়েছে।
