“বাঃ!… তুমি লেখাপড়া করেনি?”
“স্কুল ফাইনাল। চারবার। মাথা মোটা দাদু। কাশী খুব বুদ্ধিমান। বেরেন আছে।”
কিকিরা আপাতত আর কথা বাড়ালেন না। বললেন, “শোনো হে কুশিবাবা! আজ আমি যেখান থেকে উঠলাম তোমার ট্যাক্সিতে, তার কাছেই আমার বাড়ি। একদিন সকালবেলায় চলে এসো, গল্প করব। এখন আমাদের নামিয়ে দাও, এসে গিয়েছি।”
সামান্য এগিয়ে ট্যাক্সি দাঁড়াল।
ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়লেন কিকিরা।
দশ-বিশ পা এগিয়ে কিকিরা বললেন, “তারাপদ, তুমি অবাক হচ্ছ?
চুপ করে থাকল তারাপদ।
কিকিরা বললেন, “এরকম অনেক পাবে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। যাক গে, আজ একটা ভাল ছেলের সঙ্গে আলাপ হল।
বড় রাস্তা থেকে একটু গলির মধ্যে রত্নেশ্বরের বাড়ি। কিকিরা গলিতে ঢুকলেন।
তারাপদ বলল, “আপনি একটা কথা আমায় বলেননি। ঘাটশিলার বাড়িতে তখন কারা ছিলেন রত্নেশ্বরের সঙ্গে? তাঁর ফ্যামিলি!”
কিকিরা বললেন, “রত্নেশ্বরের একটি মেয়ে বিয়ে হয়ে গেছে। সে দুরে থাকে, কানপুরে। বাবাকে দেখতে এসেছিল। ফিরে গেছে আবার। রত্নেশ্বরের স্ত্রী মারা গিয়েছেন। ভদ্রলোককে দেখাশোনা করে ছোট ভাই যজ্ঞেশ্বরের স্ত্রী। যজ্ঞেশ্বরের বড় মেয়ে থাকে আসানসোলে। স্কুলে পড়ায়। ছেলে কলেজে পড়ে। ছোট মেয়ে ফুটফুটি হল রত্নেশ্বরের প্রাণ। উনি যখনই ঘাটশিলায় যান, ভাইয়ের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে সঙ্গে যায়। এবারে ছেলে যায়নি। ফুটফুটি আর তার মা সঙ্গে ছিল।”
“অন্য কেউ?”
“কাজের লোকজন। কলকাতার বাড়ি থেকে দু’জন সঙ্গে গিয়েছিল। একজন রান্নার লোক, মেয়ে। আর অন্যজন ফাই-ফরমায়েশ খাটার। কমলা আর গুরুচরণ।”
“আর কেউ না?”
“না। তবে কলকাতা থেকে একজন যেত মাঝে-মাঝে। কর্মচারী ধীরুবাবু। ঘটনার দিন ধীরুবাবু ছিলেন না।
কথা শেষ হওয়ার আগেই রত্নেশ্বরের বাড়িতে পৌঁছে গেল তারাপদরা।
বাড়িটা পুরনো। অন্তত শ’… বছরের তো হবেই। সেকালের ছাঁদছিরি থেকেই বোঝা যায় সেটা। পাঁচিল-ঘেরা বাড়ি। সামনে সদর। সদর পেরুলেই ফাঁকা জমি খানিকটা। গাছপালা কয়েকটা। সামনে বারান্দা। বারান্দায় বড় বড় তিন-চারটে ফুলের টব। দুটো টবে পাতাবাহার, ঝাঁকড়া হয়ে রয়েছে। সামনে বারান্দা। ডান পাশেও বারান্দা। বারান্দার গায়ে-গায়ে ঘর। সামনের বারান্দার বড় ঘরের দরজা খোলাই ছিল। বাড়িটা দোতলা।
বারান্দায় মাত্র একটা বাতিই জ্বলছিল।
সামনের ঘরটা বসার ঘর। কিকিরাদের পায়ের শব্দে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। “আসুন রায়বাবু?” বলে তারাপদর দিকে তাকালেন।
কিকিরা বললেন, “একটু দেরি হয়ে গেল। চলুন!”
বসার ঘরের আলো উজ্জ্বল নয়। টিউব লাইট ছিল কিন্তু জ্বালানো হয়নি।
কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন। “তারাপদ, ইনি লালাবাবু আমার পুরনো বন্ধু। দেখেছ হয়ত।… আর লালাবাবু, এ হল তারাপদ। আমার ডান হাত। আরও একজন আছে, চন্দন। ডাক্তার। সে অবশ্য আসতে পারল না। আজ বাড়ি চলে গিয়েছে। দিন সাতেক পরে ফিরবে।”
লালাবাবু বসতে বললেন কিকিরাদের।
তারাপদ লালাবাবুকে দেখছিল। ভদ্রলোকের সঙ্গে তার কি কোনোদিন আলাপ হয়েছে কিকিরার বাড়িতে? মনে পড়ল না। তবে এমন হতে পারে, একদিন সে যখন কিকিরার বাড়ি যাচ্ছিল, ভদ্রলোককে সিঁড়িতে দেখেছে। হয়ত উনি কিকিরার সঙ্গে গল্পগুজব সেরে ফিরে যাচ্ছিলেন। তারাপদ কৌতূহল বোধ করেনি তখন।
কিকিরা বললেন, “কেমন আছেন রত্নেশ্বরবাবু?”
“সেই একই রকম। রতনদাকে খাওয়ানোই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু চামচ করে গলানো খাবার আর লিকুইড খাইয়ে কতদিন আর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।”
“ডাক্তাররা কী বলছেন?”
“সেই একই কথা। ভগবানের ওপর ছেড়ে দিন। এইভাবেই পড়ে থাকতে-থাকতে যদি নিজের থেকেই সারভাইভ করতে পারেন খানিকটা, হয়ত পরে কোনো সময়ে দেখবেন, হাত-পাও নাড়তে পারছেন একটু-আধটু। কিছুই বলা যায় না।”
“বুঝেছি।”
“বড় কষ্ট রায়বাবু। একটা ছটফটে মানুষ ওইভাবে বিছানায় পড়ে আছে দিনের পর দিন, এ আর সহ্য হয় না।”
কিকিরা ঘাড় নাড়লেন। তিনি বুঝতে পারেন সবই। বললেন, “তা লালাবাবু, আমরা যে সামনের শুক্রবার ঘাটশিলায় যাব ভাবছি।”
“বেশ তো। আপনি তো আগেই বলছিলেন।”
“আপনি সঙ্গে যাবেন?”
“দরকার হলে নিশ্চয় যাব। কিন্তু আমি গেলে এখানে দেখাশোনা করবে কে?”
“যজ্ঞেশ্বর। আরও লোক তো আছে।”
“তা আছে। তবে কী জানেন রায়মশাই, অন্য সময়ে এখানকার ঘরবাড়ি, সংসার সামলানোয় কোনো ঝামেলা ছিল না। আগে কতবার কেউ না কেউ সামলেছে। এবারে বেশ ঝামেলা হবে। রতনদাকে সবসময় নজরে রাখা, ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ…। আমাকেই এসব করতে হয়। যজ্ঞেশ্বরটা ভিতু। নার্ভাস।”
কিকিরা বললেন, “সবই বুঝি। তবে অসুবিধে হচ্ছে, আপনি সঙ্গে না গেলে–আমরা কাজে হাত দেব কেমন করে! কাউকে চিনি না। অন্য পাঁচটা দরকার হতে পারে। আপনার যাওয়া জরুরি। …আপনি চলুন। আমাদের সব দেখিয়ে-শুনিয়ে, বুঝিয়ে না হয় ফিরে আসবেন। কলকাতা থেকে ঘাটশিলা বেশি দূর নয়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। আপনি দরকার মতন আসা-যাওয়াও করতে পারেন।”
লালাবাবু আপত্তি করলেন না।
তারাপদ লালাবাবুকে দেখছিল। চেহারায় আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। গোলগাল গড়ন, গায়ের রং ফরসা, মাথায় চুল কম, টাকই বেশি। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। নাক মোটা। চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার।
