“আপনারটা থাকবে, তাতেই হয়ে যাবে” হাসল তারাপদ।
কিকিরা বললেন, “এক ছাতায় দুটো মাথা…! বেশ, চল।
নিচে এসে তারাপদ এগিয়ে যাচ্ছিল, কিকিরা বললেন, “দাঁড়াও! ওই দেখো- একটা ট্যাক্সি। ওই যে! গাছের তলায়। ওটাকে ধরো। যাবে মনে হচ্ছে।”
তারাপদ ট্যাক্সি ধরতে এগিয়ে গেল।
ট্যাক্সিতে উঠে তারাপদ বলল, “খেলনাগুলো নিয়েছেন দেখছি।”
প্লাস্টিকের পাতলা ব্যাগের মধ্যে খেলনাগুলো নিয়েছিলেন কিকিরা। দেখাই যাচ্ছিল। কিকিরা মাথা নাড়লেন। নিয়েছেন।
সামান্য পরে তারাপদ বলল, “স্যার, কাল রাত্তিরে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম ঘটনাটা। ধাঁধা লাগছিল। অনেক কথা শোনাও হয়নি, কাজেই বুঝতে পারছিলাম না।”
“তা ঠিকই। কাল আর সব কথা বলা হল কোথায়?”
তারাপদ বলল, “কী নাম বলছিলেন যেন! নটুমহারাজ। তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“তিনিই প্রথম, যিনি রত্নেশ্বরবাবুকে চেয়ার উলটে পড়ে থাকতে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“নটুমহারাজ লোকটি কে? সাধুসন্ন্যাসী?”
“আমি তো তাঁকে দেখিনি। খবরাখবর করেছি। তাতে জেনেছি, নটুমহারাজ গেরুয়াপরা সন্ন্যাসী নন। তাঁর কোনো আখড়া, আশ্রম নেই। নিজের সংসার বলতেও নেই কিছু। ঘাটশিলায় অনেকদিন আছেন। লোকাল লোকও বলা যায়। একা থাকেন। একটি কাজের লোক আছে।”
“নটুমহারাজের বাড়ি আছে না ঘাটশিলায়? আপনি কাল বলছিলেন, রত্নেশ্বর সেই বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন ওখানে!”
“হ্যাঁ, নটুমহারাজের বাড়ি আছে। বাড়ির সামনের দিকটা তিনি রত্নেশ্বরকে ভাড়া দিয়েছিলেন। বরাবর তাই দিতেন। চেনাশোনা হয়ে গিয়েছিল অনেকদিন থেকে। বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।”
“নিচে তিনি কোথায় থাকতেন? বাড়ির সামনের দিক ভাড়া দিতেন বলছেন তার মানে বাড়ির পেছন দিক ছিল?”
“পেছন দিকে একটা আউট হাউস মতন আছে। সেখানেই বরাবর থাকেন নটুমহারাজ।”
“আসল বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আউট হাউসে থাকেন কেন?”
“একা মানুষ। অল্পতেই হয়ে যায়। আসলে বাড়িটা ভাড়া খাটান। সেইরকমই শুনলাম। নিজেরা গিয়ে কথা বললে বুঝতে পারব।”
“ও! তা হলে সামনের দিকটা, বড় বাড়িটা, নটুমহারাজ ভাড়া খাটানোর জন্যে রেখে দিয়েছেন। অন্য ভাড়াটেরাও ভাড়া নিতে পারত তা হলে?”
“পারত। তবে রত্নেশ্বরই বেশি নিতেন। বছরে দু-তিনবার। পুজোয় আর শীতে তো বাঁধা। মাঝে-মাঝে বর্ষায়। অন্য সময় কে আর ঘাটশিলায় ঘর ভাড়া নিয়ে বেড়াতে যাবে।… তুমি কখনো ঘাটশিলায় গিয়েছ?”
“না।”
“আমি একবার গিয়েছিলাম। দশ বারো বছর আগে। তার বেশিও হতে পারে। আমার এক শিষ্য গিয়েছিল শো দেখাতে। ধরে নিয়ে গিয়েছিল। একটা রাতই ছিলাম। নো আইডিয়া স্যার। তবে জায়গাটা ভাল শুনি।”
“আমিও শুনেছি।”
“এবার চলো, ভাল করে দেখা যাবে।”
তাকাল তারাপদ। “আপনি ঘাটশিলায় যাচ্ছেন?”
“যাচ্ছি বইকি! না গেলে হয়! ঘটনা যেখানে ঘটল সেখানে না গিয়ে, না দেখে, খোঁজখবর না করে জানব কেমন করে কী হয়েছিল।…আসছে শুক্রবারেই যাব ঠিক করেছি। কদিন ছুটি নিয়ে নাও অফিস থেকে। সেভেন ডেজ…!”
তারাপদ কোনো কথা বলল না।
ট্যাক্সিঅলার হাত ভাল নয়। ছোকা ট্যাক্সিঅলা বাঙালি। বড় এলোমেলো গাড়ি চালাচ্ছিল। সামনের রাস্তা যেন শুধু তার। বেপরোয়াভাবে অন্য গাড়িকে কাটাচ্ছিল, মানুষজন মানছিল না। একবার ট্রাফিক সিগন্যালও না মেনে এগুতে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশের ধমকানি খেল।
কিকিরা সবই নজর করছিলেন। তারাপদকে ইশারায় বললেন, লাইসেন্স নেই বোধ হয়।
তারাপদ মুচকি হাসল।
পকেট থেকে চুরুট বার করে কিকিরা ড্রাইভারকে বললেন, “ও ভাই, তুমি ট্যাক্সিও চালাও?”
ড্রাইভার ছেলেটি বুঝল না।
কিকিরা তার পিঠে কাঁধের ওপরে হাত রেখে চাপ দিলেন। “তুমি ট্যাক্সিও চালাও?”
ড্রাইভার ছোরা একবার ঘাড় ঘোরাল, “কেন দাদু?”
“তোমাকে মিনিবাসেও দেখেছি।”
“মিনিবাসে?”
“দেখিনি?”
“মিনিবাস আমি চালাই না।”
“তা হলে ভুল হয়ে গেল! তোমার হাত একেবারে মিনিবাসে পাকা হাত।”
ছোকরা ড্রাইভার কিছুই বুঝতে পারছিল না। খানিকটা দোনামোনা অবস্থায় স্পিড কমিয়ে ফেলল। “আপনার কি মিনিবাসের কারবার দাদু?”
চুরুট ধরাবার চেষ্টা করছিলেন কিকিরা। বললেন, “না, আমার নিজের কোনো মিনি কারবার নেই। তিনি নিয়ে থাকি। তা আমার এক বন্ধুর মিনি আছে। বেলতলার লাইসেন্স ডিপার্টমেন্টের ঘটকবাবু। তিনি একজন ভাল ড্রাইভার খুঁজছিলেন।”
বেলতলার নামেই হোক কি লাইসেন্স ডিপার্টমেন্টের ভয়েই হোক ছোকরা চট করে নিজেকে সামলে নিল।
কিকিরা চুরুট ধরিয়ে নিয়েছেন ততক্ষণে।
“দাদু। আমার এক ভাই আছে। যমজ ভাই। সে মিনিবাস চালাতে পারে। মাঝে-মাঝে কন্ডাক্টারি করত। করতে করতে হাত বানিয়ে ফেলেছে। লাইসেন্স নেই। আপনি তাকে লাগিয়ে দিন না। লাইসেন্সও হয়ে যাবে।”
কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন।
তারাপদ চোখে-চোখে বলল, নিন, এবার বুঝুন! চালাকি করছিলেন পড়ে গেলেন।
কিকিরা কথা ঘোরাবার চেষ্টা করলেন। “তোমরা যমজ?”
“আমি আট ঘণ্টার বড়। কাশী ছোট। দাদু, কাশী বিকম পড়ে। ফুটবল খেলে।”
কিকিরা কেমন যেন লজ্জা পেলেন। ঠাট্টা করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে গিয়েছেন। “তুমি–মানে তোমার নাম তা হলে কী! ছোট হল কাশী, তুমি তবে কী নিশি না শশি?”
“কুশি।”
“কুশি! মানে কী হে!”
“মানে জানি না। বলে, ছোট-ছোট আম। কচি আম!”
