“বাড়িতে কতদিন?”
“এই তো, দিন কয়েক মাত্র।”
“তারপর বলুন। ঘটনাটা যেখানে ঘটে- মানে, ঘাটশিলায় কী হয়েছিল?”
কিকিরা সিগারেটের টুকরোটা ছাইদানে ফেলে দিয়েছিলেন আগেই। দু হাতে মাথার বড়বড় চুলগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে বললেন, “একটু গুছিয়ে বলি, না হলে বুঝবে না। প্রথম কথা, রত্নেশ্বরবাবুর জমি থাকলেও ঘাটশিলায় তাঁর নিজের কোনো বাড়ি ছিল না। তিনি টুমহারাজের বাড়িটা ভাড়া করে নিয়েছিলেন। মাঝে-মাঝে যেতেন, দশ পনেরো দিন থাকতেন। ঘাটশিলা ওঁর খুব পছন্দসই জায়গা ছিল।”
“তবু নিজে বাড়ি করেননি?”
“না। করবকরব ভাবতেন। করেননি। জমি তো কেনাই ছিল, সময় মতন করে ফেলব ভাবতেন। পরে মনে হয়, বাড়ি পরে হবে– আগে একটা ছোট হোটেল করা যাক। ব্যবসা ভাল হবে। বিজনেসম্যান তো?”
তারাপদ বলল, “তা এবারে তিনি টুমহারাজের বাড়িতেই ছিলেন…”
“হ্যাঁ, সেই বাড়িতেই ছিলেন। হোটেল বাড়ির গোড়ার কাজকর্ম শুরু হয়েছিল। ভিত খোঁড়া সবে শেষ। এমন সময়–”
“ঘটনাটা ঘটল।”
“ইয়েস। ঘটনা ঘটল।”
“বলুন একটু ঘটনাটা।”
“একদিন সন্ধের মুখে রত্নেশ্বর বসার ঘরে বসে বসে বাড়ির নকশাটকশা দেখছিলেন। এমন সময় কে যেন এসেছিল দেখা করতে। কথাবার্তা বলে সে চলে গেল। তার সামান্য পরে নটুমহারাজ ঘরে এসে দেখেন, রত্নেশ্বর চেয়ারসমেত উলটে মেঝেতে পড়ে আছেন। ওই বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি নেই। বড় একটা টেবিল বাতি, কেরোসিনের, জ্বলছিল। অন্ধকারই বেশি ঘরে। আলো আর কতটুকু … নটুমহারাজ প্রথমটায় ধরতে পারেননি। পরে দেখলেন, রত্নেশ্বর অজ্ঞান। সাড়াশব্দ নেই। অবশ্য বেঁচে আছেন।”
“ডাক্তার?” চন্দন বলল।
“ডাক্তার সেই বাজারের কাছে। লোক পাঠিয়ে আনানো হল।”
“কাছাকাছি কেউ ছিলেন না?”
“চাঁদু, তোমরা ভাবো সব জায়গাই কলকাতা। অলিতে গলিতে ডাক্তার। ঘাটশিলার মতন জায়গায় তুমি ক’জন ডাক্তার পারে যে হাঁক মারলেই ছুটে আসবে।”
তারাপদ বলল, “তারপর?”
কিকিরা বললেন, “রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে পরের দিন অনেক মেহনত করে একটা অ্যাম্বুলেন্স ভ্যান আনানো হল জামশেদপুর থেকে। সেই অ্যাম্বুলেন্সে করে সোজা কলকাতা। সঙ্গে ডাক্তারবাবু ছিলেন। রাস্তার মধ্যে বিপদ ঘটলেও ঘটতে পারত। ঘটেনি। কলকাতায় এনে সোজা হাসপাতালে।”
চন্দন বলল, “কাজটা খুব রিস্কি হয়েছে।”
“উপায় ছিল না। তা ছাড়া ওঁরা কলকাতার মানুষ। কলকাতা ছাড়া ভরসা পান না।”
তারাপদ বলল, “কে দেখা করতে এসেছিল সেদিন ঘাটশিলায়?”
“সেটাই কেউ জানে না,” কিকিরা বললেন।
“সে কী! কেউ জানে না মানে? কেউ দেখেনি?”
“একজন মাত্র দেখেছিল,” কিকিরা বললেন, “একটা বাচ্চা মেয়ে। ডাকনাম, ফুটফুটি। রত্নেশ্বরবাবুর ভাইঝি। যজ্ঞেশ্বরের ছোট মেয়ে। সে তখন বড় বারান্দার একপাশে এসে লুকিয়ে বসে ছিল।”
“কেন?”
“তার মা তাকে জোর করে এক গ্লাস দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছিল বলে পালিয়ে এসেছিল।”
“মেয়েটির বয়েস কত?”
“বছর ছয়-সাত!”
“সে বলতে পারছে না কাকে দেখেছে?”
“লোকটা যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল সেই সময় সে দেখেছে। তাও আবছা অন্ধকারে। ওই সময় কৃষ্ণপক্ষ চলছিল। বারান্দায় মাত্র হেরিকেন ছিল একটা।”
“কেমন দেখতে ছিল লোকটা?”
“ভূতের মতন। ফুটফুটি বলছে, ভূত!.. আর কিছু বলতে পারছে না। আমি তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে জানবার চেষ্টা করছি রোজই। পারছি না।”
তারাপদ খেলনাগুলোর দিকে তাকাল। “এগুলো কি ফুটফুটির জন্যে?”
কিকিরা হাসলেন।
চন্দন আর বসতে পারছিল না। উঠে পড়ল। তারাপদও।
.
০২.
পরের দিন খানিকটা বিকেল-বিকেলই এল তারাপদ। শনিবার। তার অফিস ছুটি হয় দুটো নাগাদ। অফিস থেকে সরাসরি আসেনি, হোটেলে নিজের আস্তানায় গিয়েছিল, খানিকটা জিরিয়ে স্নান সেরে জামাপ্যান্ট বদলে যখন বেরুচ্ছে- বৃষ্টি এসে গেল। সকাল থেকেই মেঘলা ছিল, বাতাসে গন্ধ ছিল সোঁদা-সোঁদা, তবু বৃষ্টি আসেনি। এল বিকেলের দিকে।
জোর বৃষ্টি নয়। খানিকক্ষণ ঝিরঝিরে বৃষ্টি হল; তারপরই বন্ধ। এবারে কবে যে ঠিক-ঠিক বর্ষা নামবে কে জানে!
কিকিরার বাড়ি আসতে-আসতে প্রায় ছটা। গরমের দিন, আকাশ মেঘলা– তবু আলো মরে যায়নি।
আগের দিন আর বসে থাকার উপায় ছিল না তারাপদদের। চন্দনের কাজ ছিল কয়েকটা, রাত্রের আগেই সেরে রাখতে হবে–সকালেই তার ট্রেন। কাল আসছি, বাকি সব শুনব বলে উঠে পড়েছিল তারাপদ।
চন্দন যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল, কিকিরা আমি তো থাকছি না। সাতদিন ধরে আমার পেট ফুলবে। তবু একটা ওয়ার্নিং দিয়ে যাই। ভাল করে না বুঝে হাত বাড়াবেন না। হাসপাতালের কেস নিয়ে অনেক সময় গণ্ডগোল হয়।
কিকিরা মাথা নেড়েছিলেন।
তারাপদ এসে দেখল, কিকিরা বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বসে আছেন।
“বেরুচ্ছেন নাকি?”
“তোমার জন্যে বসে আছি। চাঁদু চলে গিয়েছে?”
“সকালেই যাওয়ার কথা।”
“চলুন। যাবেন কোথায়?”
“রত্নেশ্বরের বাড়িতে।”
“সেটা কোথায়?”
“এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাও? হরিশ মুখার্জি..”
“ও! খেয়াল ছিল না। চলুন।”
“ছাতা কোথায়?”।
তারাপদ হাসল। “নেব ভেবেছিলাম। তারপর দেখলাম বৃষ্টি থেমে গেল।”
কিকিরা হেসে-হেসে বললেন, “কী দেখলে সেটা বড় কথা নয়, কী হতে পারে সেটাও দেখবে। এখন বর্ষাকাল। এক পশলা হয়ে গেছে বলে আর যে হবে না– তুমি জানলে কেমন করে? ভগবান নাকি।”
