“কেমন মিস্টিরিয়াস? খুন-জখম? চুরি? ভৌতিক কাণ্ডকারখানা? ব্ল্যাকমেইল?”
কিকিরা হাত বাড়ালেন। তাঁর সেই কড়ে আঙুল সাইজের কড়া চুরুট তিনি এখন খাবেন না, একটা সিগারেট চাইলেন।
চন্দন প্যাকেট এগিয়ে দিল সিগারেটের। দেশলাইবাক্সটাও।
কিকিরা সিগারেট ধরালেন।
“আগে থেকে বলা যাবে না খুন-জখম, না, অন্য কিছু!, এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি। তবে মর-মর অবস্থা।“
“তার মানে?”
“মানে এক ভদ্রলোককে হয়ত খুন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি এখনো মারা যাননি। মারা না গেলেও অবস্থাটা খুবই খারাপ। ভদ্রলোক পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছেন। কথা বলতে পারেন না, মানুষ চিনতে পারেন না, মাঝে-মাঝে হাত-পা একটু কাঁপে বটে কিন্তু নিজের থেকে হাত-পা নাড়াবার ক্ষমতাও তাঁর নেই। ডাক্তাররা বলছেন, জোর সেরিব্রাল স্ট্রোক। স্ট্রোক হলে যেমন হয় সচরাচর সেইরকমই অবস্থা। তাঁরা সেইরকমই ভাবছেন। কিন্তু লালাবাবু আর নটুমহারাজ অন্যরকম ভাবছেন।”
চন্দন বলল, “ডাক্তাররা যা বলছেন–সেটা না-মানার কারণ কী?”
তারাপদ বলল, “ভদ্রলোক লালাবাবুর কেমন আত্মীয়?”
কিকিরা এবার সবিস্তারে ঘটনাটা বলতে লাগলেন।
“ভদ্রলোক লালাবাবুর মামাতো ভাই। মানে দাদর। আবার বন্ধুর মতন। নাম রত্নেশ্বর, লোকে রতনবাবু বলে ডাকে। রত্নেশ্বরবাবুর বয়েস পঞ্চাশের ওপর। স্বাস্থ্য খুবই মজবুত ছিল। উনি বরাবর ব্যবসাপত্র করেছেন। পয়সাঅলা লোক। হালে ভদ্রলোক একটা বাস কিনে দিঘা কলকাতায় চালাচ্ছিলেন। ট্যুরিস্ট সার্ভিস। মাস কয়েক আগে তাঁর খেয়াল হয় ঘাটশিলায় একটা হোটেল খুলবেন। জমি আগেই কেনা ছিল।… তা হোটেল বাড়ি তৈরি করার কাজে সবেই যখন হাত দিয়েছেন– তখনই ঘটনাটা ঘটল।”
“রত্নেশ্বরবাবুর স্ট্রোক হল? বা তাঁকে খুন করার চেষ্টা হল?” তারাপদ বলল।
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”
“ঘাটশিলায়।”
তারাপদ তাকিয়ে থাকল। রত্নেশ্বর থাকতেন কোথায়? কলকাতায়, না, ঘাটশিলায়? ভদ্রলোক সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কতটুকু আর জানা হয়েছে? সামান্য দু-চারটে কথা থেকে কীই বা বোঝা যায়?
তারাপদ বলল, “ওঁর বাড়ি কোথায়? ব্যবসাপত্রর জায়গা?”
কিকিরা বললেন, “বাড়ি হরিশ মুখার্জিতে। পুরনো বাড়ি। পৈতৃক। ব্যবসাও কলকাতাতে। হরেক রকম ব্যবসা। সাইকেলের সিট, ঘণ্টি, আলো এসব তৈরি করার ছোট কারখানা আছে বেহালায়। কার্বন পেপার, স্ট্যাম্প কালি, স্ট্যাম্প প্যাড তৈরি হয় বেলেঘাটায়। চীনেবাজারে একটা দোকান আছে স্টেশনারির। হালে মস্ত বাস কিনে দীঘা কলকাতায় চালাচ্ছিলেন। খুচরো আরও কিছু থাকতে পারে ছোটখাট। এজেন্সি গোছের।”
চন্দন বলল, “এতরকম ব্যবসা! জাত ব্যবসাদার নাকি?”
“ধরেছ ঠিক। ওঁরা জাত ব্যবসাদার। বাপ-ঠাকুদাও ব্যবসা করে গিয়েছেন।”
“এত ব্যবসা একলা সামলাতেন ভদ্রলোক?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “খোঁজখবর রাখতেন সব ব্যবসারই, তবে নিজে দেখাশোনা করা সম্ভব ছিল না। বেহালার কারখানাটা নিজে দেখতেন। বেলেঘাটার কারবার দেখত নিমাই বলে একটা লোক। সম্পর্কে খুড়তুতো ভাই। রত্নেশ্বরদের আশ্রিত। চীনে বাজারের দোকানে বসত ওঁর নিজের ছোট ভাই যজ্ঞেশ্বর।”
“বাসের ব্যবসা কে দেখত?”
“নিজেই দেখতেন রত্নেশ্বর। তবে একজন ছোকরা ম্যানেজার ছিল। নাম আনন্দ।”
তারাপদ বলল, “দাঁড়ান, একটু গুছিয়ে নিই, তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। বেহালা রত্নেশ্বর, বেলেঘাটা নিমাই, চীনেবাজার যজ্ঞেশ্বর, বাস আনন্দ। মানে এই চারজনই ছিল রত্নেশ্বরের ব্যবসার দেখাশোনার লোক। অবশ্য রত্নেশ্বরকে বাদ দিলে তিনজন।”
“হ্যাঁ।”
“গোলমাল ছিল কারও সঙ্গে?”
“বাইরে অন্তত নয়।”
“আপনি এদের দেখেছেন?”
“দেখেছি। লালাবাবু পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।”
“দেখে কি কাউকে সন্দেহ হল?”
“দু-দশ মিনিট দেখেই কি সন্দেহ হয়? আমার কি পুলিশের চোখ?”
চন্দন বলল, “সন্দেহের কথা পরে। আগে জানতে হবে হয়েছিল কী যে আপনার বন্ধু লালাবাবু সন্দেহ করছেন রত্নেশ্বরকে খুন করার চেষ্টা হয়েছে?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। বললেন, “আসল কথাটা হল তাই। তারাবাবু আসল কথাটা ছেড়ে বাকিগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে বসল। একে কী বলে জানো? বলে, ফেদার গ্যাদারিং।”
চন্দন আর তারাপদ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
“বুঝলে না?” কিকিরা হেসে-হেসে রঙ্গ করে বললেন, “হাতের মুরগিটা যদি পালিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল আর তোমার হাতে থাকল পালক। তা হলে হলটা কী? ফেদার গ্যাদারিং হল না?”
চন্দন আর তারাপদ হেসে উঠল হো-হো করে।
মুখ টিপে হাসলেন কিকিরাও। চণ্ডী বাঁড়জ্যের বইয়ে এসব লেখা ছিল।”
“সে কে?”
“ছিল একজন। তোমরা চিনবে না। মজার প্লে লিখত–তোমরা যাকে বলো নাটক। ফার্স-মাস্টার চণ্ডী।”
“ও!… তা এবার আসল কথাটা বলুন, শুনি।”
কিকিরা ঘাড় নেড়ে বললেন, “আপাতত ছোট করে শুনে নাও। বড় করে বলা যাবে না। কেননা, আমি নিজেই জানি না। কাজে হাত না লাগানো পর্যন্ত জানা যাবে না কী কী হয়েছিল!”
“ছোট করেই বলুন।”
“ঘটনাটা ঘটেছে ঘাটশিলায়। সপ্তাহ তিনেক আগে। মে মাসে।”
ঘাটশিলাতেই এখন আছেন রত্নেশ্বরবাবু?”
“না। এখন কলকাতায়। ঘাটশিলা থেকে কলকাতায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। দিন পনেরো ছিলেন হাসপাতালে। কলকাতার হাসপাতাল এক্সকিউজ মি চাঁদুবাবু ভরসা করার মতন জায়গা আর নেই। তা ছাড়া ডাক্তাররাও বললেন, হাসপাতালে পড়ে থাকার চেয়ে বাড়ি নিয়ে যান। আমরা আর কোনো উন্নতি দেখতে পাচ্ছি না। এইভাবে কতদিন পড়ে থাকবেন তাও বলতে পারব না। বাড়িতে অন্তত দেখাশোনা, যত্ন আরও ভাল হবে। পরে যদি অসুবিধে হয়–আবার নিয়ে আসবেন হাসপাতালে।… তা রত্নেশ্বরের বাড়ির ডাক্তার সিনিয়ারের সঙ্গে পরামর্শ করে বাড়িতেই এনে রেখেছেন।”
