কিকিরা বললেন, “আমারও তাই। ট্রাম থেকে নেমেই ঝড়ে আটকে গেলাম। একটা দোকানে মাথা বাঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম এতক্ষণ। নাও ওপরে চলো। চলো চাঁদু।”
সময়টা আষাঢ়। কালবৈশাখীর ঝড় ওঠার কথা নয় এখন, বৃষ্টি নেমে যাওয়া উচিত ছিল; কিন্তু দু-একদিন ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হলেও বর্ষা নামেনি আজও, উলটে আজ সন্ধের মুখে জোর ঝড় উঠল হঠাৎ, ঠিক যেন কালবৈশাখী। ঝড় উঠলেও বৃষ্টি হল না এদিকে। তবে হতে পারে আকাশে মেঘ ডাকছে, দু-এক ঝলক বাদলা বাতাসও দিচ্ছিল। দূরে কোথাও হয়ত বৃষ্টি নেমেছে।
ঘরে এসে কিকিরা চা করতে বললেন বগলাকে। তারপর জোব্বা জামার পকেট থেকে দু-একটা ছোট মতন খেলনা আর লুডো খেলার বোর্ডের মতন একটা বোর্ড বার করে রেখে দিলেন। বোর্ডের সঙ্গে কৌটোও ছিল। প্লাস্টিকের চৌকোনা কৌটো। গুটি আর ছক্কা ছিল কৌটোর মধ্যে।
“চাঁদু, তুমি বাড়ি থেকে ফিরবে কবে?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“পঁচিশ, ছাব্বিশ। পঁচিশ শনিবার পড়েছে। রবিবার বিকেলে ফিরলেই হবে।” চন্দন বলল।
“বাড়িতে মা বাবা…!”
“মা বাবা ভালই আছেন। আমার মাসি-মেসোমশাই এসেছেন লন্ডন থেকে। খানিক হইচই হবে বাড়িতে, তাই আর কী!”
“কী করেন মেসোমশাই?”
“মেসোমশাই কেমিক্যালের লোক। রিসার্চের কাজকর্ম করেন। মাসি চাকরি করেন ব্যাঙ্কে। মাসতুতো ভাই ইঞ্জিনিয়ার…।”
“বাঃ, বেশ! তা তুমি দিন সাতেকের মধ্যেই ফিরছ!”
“না ফিরে উপায় আছে! হাসপাতাল–!”
তারাপদ ততক্ষণে কিকিরার নামিয়ে রাখা খেলনাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছে। বলল, “এগুলো কী, স্যার? আপনি কি বাচ্চা হয়ে যাচ্ছেন নাকি? খেলনা কিসের?”
কিকিরা মজার মুখ করে হাসলেন। বললেন, “সেই গানটা শুনেছ?”
“কোন গান?”
“পুরনো গান। এককালে ঘরে-ঘরে গাইত। খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে…’। শোনোনি? কোথা থেকেই বা শুনবে! তোমরা তখন জন্মাওনি।”
“আপনি নিশ্চয় জন্মেছিলেন–?” তারাপদ মজা করে বলল।
“শিশু। চাইল্ড!” বলে কিকিরা ডান হাত মাটির দিকে নামিয়ে তখনকার বয়েসটা বোঝাবার চেষ্টা করলেন।
“ও! তা এখন কি খেলা করতে ইচ্ছে হল?”
“হল মানে, ধরে নিয়ে গেল খেলার জন্যে। বলল, পনেরো হাজার পর্যন্ত দিতে পারে। রাহা খরচ আলাদা। ফিজ দশ হাজার আপাতত। অবশ্য যদি কাজের কাজ হয়। নয়ত এই কাজটা হাতে নেওয়ার জন্যে মাত্র পাঁচ হাজার। তিন হাজার টাকা আগাম দিয়েছে।”
তারাপদরা কিছুই বুঝল না। তবে কিকিরার স্বভাবই এই রকম। গোড়ায় কিছু ভাঙেন না, রহস্য করেন। একটু একটু করে কৌতূহল বাড়ান। তারপর ধীরে ধীরে আসল কথাটা বলেন।
তারাপদ আর চন্দন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। যেন বলতে চাইল, ব্যাপারটা কী?
কিকিরা গায়ের জামাটা খুলে ফেলেছেন। কাছাকাছি জায়গা থেকে একটা ছোট মতন তোয়ালে উঠিয়ে নিয়ে মাথা-মুখ পরিষ্কার করে নিচ্ছিলেন। ধুলোবালি উড়েছিল ঝড়ে, মুখে-মাথায় কিরকির করছে। ওই অবস্থায় একটু গানও গেয়ে নিলেন বেসুরো গলায়, “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।
তারাপদ বলল, “বাঃ, ফাইন। বিরাট নয়, অবোধ শিশু! তা স্যার এবার একটু খোলসা করে বলুন তো ব্যাপারটা?”
কিকিরার কোনো তাড়া নেই। নিজের জায়গায় বসতে-বসতে হাই তুললেন ছোট করে, আলস্য ভাঙলেন হাত তুলে। বসতে বললেন তারাপদকে।
খেলনাগুলো রেখে দিয়ে তারাপদ লুডোর বোর্ডের মতন খেলার জিনিসটা খুলে দেখছিল। একটু অবাক হল, হাসিও পেল যেন, “স্যার, এ তো নতুন দেখছি! আগে দেখিনি।”
“আগে কী দেখেছ?”
“লুডো, সাপসিঁড়ি, ঘোড়দৌড়।”
“ওটা হল ক্যাট অ্যান্ড দি মাউস। বেড়াল-ইঁদুর খেলা। ইঁদুরগুলো ভয়ে মরে বেড়াল ছানা পাচ্ছে ধরে।” কিকিরা রসিকতা করে বললেন।
তারাপদ এমন খেলা আগে দেখেনি। তবে বোর্ডের ছবি দেখে অনুমান করেছিল, লুডো, সাপসিঁড়ি, ঘোড়দৌড়ের মতনই কিছু। দান ফেলে এগুতে হবে। মাঝে-মাঝে ইঁদুর। ইঁদুরের গর্ত। … তা সে পরে দেখা যাবে, আপাতত বোঝা যাচ্ছে না কিকিরার এই বয়েসে বেড়াল-ইঁদুর খেলার শখ হল কেন?
চা নিয়ে এল বগলা।
কিকিরা চা নিলেন। চন্দনও।
তারাপদ এসে বসল একপাশে।
বগলা চলে গেল।
কিকিরা কয়েক চুমুক চা খেলেন। আরামের শব্দ করলেন। বললেন, “হাতে কাজকর্ম ছিল না অনেক দিন। মাস ছয়েক বেকার। নো মানি, নো ফান্ড। ডাল-ভাত জুটবে কোথ থেকে হে তারাবাবু। বাজারের যা হাল। একটা গন্ধ লেবুর দাম এখন দেড় টাকা, তা জানো?”
তারাপদ হেসে বলল, “আপনি জানেন?”
“জানি না! আমি তো তোমার মতন হোটেল বাবু নই, হ্যান্ড বার্নিং করে বেঁধে খেতে হয় স্যার!”
চন্দন জোরে হেসে উঠল। “আপনি হ্যান্ডকানিং করেন, না, বগলাদা করে?”
“বগলা ফিফটি আমি ফিফটি। সেদিন একটা নতুন আইটেম করেছিলাম, পারসি পকৌড়া। দুধ, ডিম, রুটির সাদা টুকরো, টম্যাটো সস, গাজর দিয়ে করতে হয়। তোমরা থাকলে খেতে পারতে।”
“কপালে ছিল না স্যার।”
“আর-একদিন করে খাওয়াব।”
“তা কেসটা এবার বলুন, তারাপদ বলল, “অনেকক্ষণ ধরে ঝোলাচ্ছেন?”
কিকিরা চা খেতে-খেতে বললেন, “লালাবাবুকে দেখেছ? আমার বন্ধু?”।
“না।” বলেই তারাপদ ভুল শুধরে নিল তাড়াতাড়ি, “সেই মণি লাল! তাঁকে দেখেছি। আলাপ হয়নি।”
চন্দন অবশ্য দেখেনি।
“লালাবাবু গত হপ্তায় এসেছিলেন। এসে বললেন, একটা ঘটনা ঘটেছে তাঁর আত্মীয়দের বাড়িতে। মিস্টিরিয়াস ব্যাপার। আমি যদি একবার দেখি…।”
