কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “মনে হয় বাড়াবাড়ি। তবে বাড়াবাড়ি নয়।”
“কেন?”
“হিটলারের আমলের নাজি জার্মানির হোমরাচোমরাদের কাছে এই বাটারফ্লাই ট্রে-র অন্য মানে ছিল, কদর ছিল, আর দাম ছিল। দাম মানে টাকার দাম নয়। অন্য কোনো দাম। কী দাম আমি জানি না। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের অমন মাথাওয়ালারাও সেটা ধরতে পারেনি। আমি তো কোন ছার!”
“আপনি কি বলতে চাইছেন–পুরনো কোনো নাজি”
“জানি না। এখনও কোন-কোনো নাজি নাকি এদেশে-ওদেশে লুকিয়ে নাম ভাঁড়িয়ে বেঁচে আছে। তারা মাঝেমধ্যে ধরাও পড়েছে। কাগজেই পড়ি। সেরকম বুড়ো কোনো নাজি-র এরকম জিনিস দরকার হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে সিক্রেট কোনো নাজি অগানিজেশান এ-সব খুঁজে বেড়াচ্ছে। হয়ত তাদের দরকার। যেন দরকার আমি বলতে পারব না।”
চন্দন বলল, “এমনও তো হতে পারে, জিনিসটার ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে।”
“হতে পারে। হাজারবার হতে পারে।…তবে আমার অত জেনে কী লাভ! আমি ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা পেলে মল্লিকের দেনা শোধ করে দিতাম। মল্লিক আমায় কম কথা শোনায় না। অপমান, অপদস্ত করে। অথচ ওর জন্যে আমি কম কিছু করিনি।”
কিকিরা বললেন, “মল্লিকবাবু তো আপনার বন্ধু।”
কৃষ্ণমুর্তি করুণ মুখে হাসলেন যেন। বললেন, “ওর অসময়ে বন্ধু ছিলাম। এখন নয়। আর বনারাই তো সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক হয়ে ওঠে। মল্লিককে অনেক বেশি লোভে পেয়েছিল।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। কথাটা যেন মেনে নিলেন।
.
রাত হয়েছিল খানিকটা।
অনিল ঘরেই ছিল। আচমকা কিকিরাদের দেখতে পেয়ে চমকে উঠল। ভয় পেল। “আপনারা?”
কিকিরার পেছনে তারাপদ আর চন্দন। কৃষ্ণমূর্তি নেই।
কিকিরা বললেন, “তোমার কাছেই এলাম।”
অনিল তাকিয়ে থাকল।
কিকিরা ভাল করে অনিলকে দেখতে দেখতে বললেন, “অনিল, তুমি আজ আর আমাদরে ঠকাবার চেষ্টা করবে না। মিথ্যে কথাও বলবে না। আমরা সব জানি। প্রমাণ পেয়েছি। তুমি মূর্তিসাহেবের বাটারফ্লাই ট্রের কী করেছ? কোথায় সেটা?”
অনিল বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। ভয় পেয়েছিল প্রচণ্ড। তবু বলল, “কী বলছেন আপনারা?”
কিকিরা বললেন, “তুমি জানো কী বলছি! ট্রে কোথায়! চন্দন, তুমি ওই ব্যাগ আর সুটকেসটা দেখো তো?”
চন্দন এগিয়ে যাচ্ছিল, অনিল এসে সামনে দাঁড়াল। “আমার ঘরে এসে আপনারা আমার জিনিসে হাত দেবেন! কী ভেবেছেন আপনারা?”
কিকিরা বললেন, “দরকার পড়লে দেব। তুমি কি ঝামেলা বাধাতে চাও। যদি চাও, আমরা চলে যাচ্ছি, তবে নিচে দুজন পুলিস আছে। গিয়ে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি।” পুলিসের কথাটা ভয় দেখানোর জন্য বললেন।
পুলিসের নামে অনিল থতমত খেয়ে গেল।
“পুলিস কেন?”
“তোমার কাছে ট্রে আছে কিনা দেখবে!”
“আছে।”
“দেখি।”
অনিল মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।
“কী হল?”
“ট্রেটা আমি ভেঙে ফেলেছি। শুধু কাচের টুকরো ছাড়া আর কিছু নেই।”
“কোথায় সেটা?”
“আমর কিট ব্যাগে।”
“তা হলে তুমিই ট্রে চুরি করেছিলে?”
অনিল মাথা আরও নিচু করল।
“কে তোমায় চুরি করতে বলেছিল?”
“মালিক।”
“তোমায় কি টাকা দেবে বলেছিল?”
“হ্যাঁ। টাকা ছাড়াও বিক্রির ভাগ দেবেন বলেছিলেন।”
“তুমি বলছ, ট্রেটা তুমি ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেছ!”
“হ্যাঁ। আপনারা দেখতে পারেন। কাঁচ ছাড়া আর কিছু পাবেন না।”
“মল্লিককে জানিয়েছ কথাটা?”
“জানিয়েছি।”
“লম্বুকে দিয়ে?”
“হ্যাঁ। “
“শুনে তোমার মালিক কী বলেছে?”
“বলেছেন, তিনি কিছু জানেন না। আমার ব্যবস্থা যেন আমি নিজেই করি। আর সার্কাসে ফিরে না যাই।”
কিকিরা নিজের মনে মাথা নাড়তে লাগলেন।
অনেকক্ষণ পর কিকিরা বললেন, “অনিল, তোমায় একটা খারাপ খবর দি। খুবই খারাপ খবর। কৃষ্ণমূর্তিসাহেব আজ খেলা দেখাবার সময় গোলাল করে ফেলেছিলেন। বিশ্রী অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলেছেন। অবস্থা খুব খারাপ। হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে তাঁকে। কোনো হুঁশ নেই। নাকমুখ দিয়ে অনর্গল রক্ত পড়ছে। উনি বাঁচবেন কিনা জানি না।..আজ তাঁর মন বড় চঞ্চল ছিল। ডিস্টার্বড ছিলেন। ভুল করে ফেলেছিলেন কোথাও।…কৃষ্ণমূর্তি যদি মারা যান, এর দায় কিন্তু তোমার আর তোমার মালিকের।”
অনিল যেন কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। পাথরের মতন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
কিকিরা বললেন, “একটা ভাল মানুষকে তোমরা আজ শেষ করলে। এর শাস্তি তুমি পাবে। তুমি না ক্রিশ্চান!”
অনিলের হঠাৎ কী হল, কাঁদতে লাগল ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে।
২.৪ হলুদ পালক বাঁধা তীর
০১.
সিঁড়িতেই দেখা। তারাপদরা নেমে যাচ্ছিল, কিকিরা উঠে আসছিলেন। সিঁড়িতে যেটুকু আলো তার চেয়েও বেশি অন্ধকার। দু-চারটে ইঁদুরও এই ভাঙাচোরা অন্ধকার সিঁড়িতে দিব্যি ছুটোছুটি করে বেড়ায় রাত্রের দিকে।
মুখোমুখি হতেই তারাপদ বিরক্তির গলায় বলল, “বাঃ, বেশ তো আপনি। আমরা দু’দিন হল আসছি আর ফিরে যাচ্ছি। কোথায় যান আপনি, কিকিরা?”
কিকিরা বললেন, “কে তোমাদের ফিরে যেতে বলেছে? আগের দিন আমার রাত হয়েছিল ফিরতে। কাল আমি ফিরে এসে শুনলাম, তোমরা একটু আগেই চলে গিয়েছ। কেন, বগলা তোমাদের বলেনি–আজ আমি না-ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে?”
“বলেছিল। কিন্তু কত আর অপেক্ষা করব! চাঁদু কাল সকালের গাড়িতেই বাড়ি যাচ্ছে, ছুটি ম্যানেজ করেছে দিন সাতেকের। ওর কিছু কাজ আছে, তাড়াতাড়ি কোয়ার্টারে ফিরতে হবে।.. আমরা আরও আগে চলে যেতাম; নেহাত ঝড় উঠল বলে খানিকটা বসে গেলাম।”
