“না। তবে ও আমার কাছে শুনেছিল।”
“ট্রে দেখে মল্লিকবাবুর অবস্থা কেমন হল?”
“অবাক হয়ে গেল। সে সভাবতেই পারেনি এমন জিনিস হতে পারে!”
তারাপদ বলল, “সেই ভদ্রলোক যিনি এই ট্রে কিনতে চেয়েছিলেন–আপনি তার কাছে যাননি। দেখা করেননি?”
“গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক ছিলেন না। হপ্তা দুয়েকের জন্যে দিল্লি গিয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হল, ওই ভদ্রলোক মিল ম্যান হয়ে কাজ করছেন। কোনো জামান ভদ্রলোক হালে এখানে এসেছেন। ঘোরাফেরা করছেন। চলে যাবেন আবার জার্মানিতে। তাঁর হয়ে এই ভদ্রলোক কাগজে বিজ্ঞাপনটা দিয়েছিলেন।”
কিকিরা বললেন, “কথাটা আপনি মল্লিকবাবুকে বলেছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“তারপরই আপনার বাক্স থেকে ট্রে-টা চুরি যায়।”
“দিন দুই পর।”
“চুরির কথাটা আপনি মল্লিকবাবুকে বলেননি?”
“বলেছিলাম।”
“কী বললেন উনি?”
“খানিকটা চেঁচামেচি করল। লাফাল।”
“তখন থেকেই অনিল বেপাত্তা।”
“হ্যাঁ।”
“অনিলকে আপনি ট্রের কথা বলেননি? দেখাননি তাকে?”
“কথাটা আগে বলেছিলাম। ট্রে দেখানো হয়নি।”
“চুরির কথাটা সার্কাসের কে-কে জানে? সকলেই শুনছে নাকি?”
“আমি কাউকে বলিনি। মল্লিক যদি বলে থাকে।”
কিকিরা মনে-মনে ভাবলেন কী যেন। তারপর বললেন, “মুর্তিসাহেব, আমি আপনাকে একটা জিনিস দেখাব। আপনি কি বলতে পারবেন ওটা কী?”
কিকিরা উঠলেন। ঘরের এককোণ থেকে সেই রঙের টিউব আর প্লাটিনামের নিল নিয়ে এসে কৃষ্ণমূর্তির হাতে দিলেন।
কৃষ্ণমূর্তি চমকে উঠলেন। অবাক হয়ে তিনি একবার কিকিরা দিকে তাকাচ্ছিলেন, আর একবার সেই সরু উঁচটা দেখছিলেন। কথা বলতে পারছিলেন না। ভীষণ চঞ্চল যেন। বিহ্বল।
“এ আপনি কোথায় পেলেন রায়বাবু?”
“কোথায় সে?”
“জিনিসটা কী মুর্তিসাহেব?”
কৃষ্ণমূর্তি নিজের কপালে চড় মারলেন। মাথা ঝাঁকাতে লাগলেন জোরে-জোরে। তারপর বললেন, “এ-জিনিস আপনি পেলেন! কেমন করে ফেলেন! পাওয়ার কথা নয় রায়বাবু। এরকম তিনটে সরু জিনিস বাটারফ্লাইয়ের মাঝখানটায় ছিল পিঠের দিকে। শিরদাঁড়ার মতন জায়গাটায়। আর তার পাশ থেকে আরও সরু-সরু এই একই জিনিস প্রজাপতির পাখনায় ছড়িয়ে গিয়েছিল। ওর আর নিচের পাখনায়।”
“সবসমেত ক’টা ছিল?”
“পিঠে তিন। পাখনার দুপাশে দুটো করে, মোট চারটে।”
“মানে সাতটা।”
“হ্যাঁ।“
“এগুলো তা হলে প্রজাপতির মধ্যেই ছিল?”
“কাচের তলায় রায়বাবু! ভেতরে। ছাঁচের মধ্যে।”
“এগুলো কি রঙিন ছিল?”
“আলবাত ছিল। আলাদা-আলাদা রং। তবে রংটা তলার দিকে ছিল না।…আমি বুঝতে পারছি না, এগুলো কে বার করল। কাচের ট্রে না ভেঙে ওই ট্রের একটা জিনিসও বার করা সম্ভব নয়। মাই গড, অনিল কি ট্রে ভেঙে ফেলেছে? হায় হায়! রায়বাবু আমি–আমি, আমার সব চলে গেল। আমি এখন কী করব?” কৃষ্ণমূর্তি পাগলের মত ছটফট করছিলেন। গলা বন্ধ হয়ে এল তাঁর। কেঁদে ফেললেন যেন।
তারাপদ চন্দন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। কিকিরাও কেমন হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
হঠাৎ কৃষ্ণমীর্তি বললেন, “সে কোথায়? জোচ্চর, বদমাশ, শয়তান–সেই নেমকহারামটা কোথায়? আমি তাকে খুন করব। আমার এত বড় সর্বনাশ সে করল। কোথায় সে?”
কিকিরা নরম গলায় বললেন, “আপনি শান্ত হোন। আমরা আপনাকে অনিলের কাছে নিয়ে যাব। মূর্তিসাহেব, একটু ধৈর্য ধরুন। এখন তার কাছে যাওয়ার সময় নয়।…নিন, চলুন–এবার হাতমুখ ধুয়ে দুটো খেয়ে নিন।.আমাকে বিশ্বাস করুন, আজই আমরা (অনিলের কাছে যাব। রাত্তিরে।”
“রাত্তিরে?”
“তখন যাওয়াই ভাল। সে থাকবে। এখন গেলে যদি তাকে না পাই! তা ছাড়া আপনি এখন কোনো কথাই কাউকে বলবেন না। আভাস দেবেন না। রাত্তিরে আপনার খেলা শেষ হলে–আমরা সার্কাস থেকেই অনিলের কাছে চলে যাব।”
খাওয়াদাওয়া শেষ হতে-হতে দুপুর গড়াল।
কিকিরারর বসার ঘরে চারজনে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল।
পান চিবোতে-চিবোতে কিকিরা বলেলেন, “একটা কথা আপনাকে তখন বলা হয়নি, স্যর।..সার্কাসের লম্বু মানে নাইডুর সঙ্গে অনিলের যোগাযোগ আছে বলে আমার মনে হয়। N’ লেখা একটা নস্যির ডিবে আমি অনিলের ঘরে পেয়েছি। শুধু “N’ নয়, তলায় আবার ছোট করে “G.C.’ লেখা ছিল। বোধ হয় ওটা গোল্ডেন সার্কাস।…আমার ধারণা, অনিল সার্কাস ছেড়ে পালিয়ে পাওয়ার পর–আপনাদের সার্কাসে কী হচ্ছে না হচ্ছে–তার খবরাখবর সে অনিলকে দিয়ে আসে।”
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “নাইডুকে আজকাল খুব মল্লিকের কাছে যেতে-আসতে বসে থাকতে দেখছি। “
“এখন তো আমার মনে হচ্ছে, মল্লিকবাবুই আসল লোক। ভদ্রলোক অনিলকে দিয়ে আপনার জিনিস চুরি করিয়েছেন। কিন্তু কেন? উনি কি ঠিক করেছিলেন নিজেই সেই বিজ্ঞাপনের ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে টাকাটা নিয়ে আসবেন?”
কৃষ্ণমূর্তি মাথা নাড়লেন। বললেন, “না। মল্লিকের ধারণা প্রজাপতির ওই বাহার আর রঙের তলায় হীরে-চুরি গোছের পাথর-টাথর লুকননা আছে। বিক্রি করলে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার কেন, লাখ দেড়-দুই টাকা সে কামাতে পারে। মূর্খ, ইডিয়েট। ওর মধ্যে হীরেটিরে নেই। এমন অসামান্য জিনিস আপনারা জীবনে দেখেননি।”
তারাপদ বলল, “জিনিসটা নিশ্চয় খুবই সুন্দর। কিন্তু একটা কথা মূর্তিসাহেব। আপনি বলছেন, এক জার্মান ভদ্রলোক কলকাতায় বেড়াতে বা কোনো কাজে এসে ওইরকম একটা ট্রে কিনতে চেয়েছেন। দাম দিয়েছেন তিরিশ হাজারেরও বেশি। এটা একটু বাড়াবাড়ি হল না কী?”।
