কৃষ্ণমূর্তি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “একটু বুঝিয়ে না বললে বুঝতে পারবেন না। মুখে বললেও বুঝবেন না। যদি চোখে দেখতেন বুঝতে পারতেন–সে-জিনিস কী! ওরকম জিনিস দেখেননি। জীবনে দেখবেন বলেও মনে হয় না। ..রায়বাবু, আপনার হয়ত মনে আছে, আমি বলেছিলাম আমার বাবা লাস্ট ওয়ারের সময় নেভিতে ছিলেন। রয়েল। ইন্ডিয়ান নেভিতে। তিনি ছিলেন ওয়ারশিপে–মানে যুদ্ধ জাহাজের রেডিয়ো অপারেটর। লাস্ট ওয়ারে আমার বাবাকে জাহাজে করে নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। বিশেষ করে মেডিটারেনিয়ানে। আমরা বলি ভূমধ্যসাগর। বাবার জাহাজটা পাহারাদারির কাজ করত। আপনারা নিশ্চয় জানেন না, যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়–হিটলারের নাজি জার্মানরা নানা জিনিস স্মাগল করে আনত নানা জায়গা থেকে। যেমন, রেডিয়াম, ডায়মন্ড, প্লাটিনাম, আরও অনেক কিছু। প্লাটিনাম দরকার লাগত এরোপ্লেনের কলকজার কাজে, অন্য আরও পাঁচটা কাজেও লাগত। নিজেদের চাহিদা মিটাবার জন্যে চোরাই চালানের ওপর ভরসা না করে জার্মানদের উপায় ছিল না। একদিকে বেপরোয়া স্মাগলিং অন্যদিকে তাদের গুপ্তচরদের কাজকর্ম। গুপ্তচর ছড়িয়ে দিয়েছিল সর্বত্র। দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত।” বলতে বলতে একটু থামলেন কৃষ্ণমূর্তি। যেন দম নিলেন। তারপর বললেন, “এই যে বাটারফ্লাই ট্রে-এর কথা বললাম, এগুলো তৈরি হত ব্রাজিলে। আসত রিও ডি জেনিরো থেকেই বেশিরভাগটা।”
তারাপদ বলল, “ট্রেগুলো কি সোনার ছিল? হিরেটিরে থাকত?”
“না। কাচের ট্রে। ব্রাজিলিয়ান গ্লাস। কিন্তু কাচের তলায় যে রঙিন প্রজাপতির চেহারা থাকত–তার কোনো তুলনা নেই। অপূর্ব ডিজাইন। কত রং, কত কারুকাজ, কী সুন্দর! এমন বাহার, রং, সূক্ষ্ম কাজ আপনারা দেখেননি। কল্পনাও করতে পারবেন না।”
কিকিরা কিছু বলার আগেই চন্দন বলল, “প্রজাপতি আঁকা কাচের ট্রে! কী হত এগুলো?”
“কী হত–সেটাই রহস্য। জার্মানরা শয়ে শয়ে এগুলো আনাত চোরাই পথে। তাদের এমব্যাসিতে থাকত, যুদ্ধের বড় বড় কর্তাদের ঘরে থাকত।”
“কেন?”
“তা বলতে পারব না। ব্রিটিশরা একসময় এই চোরা চালান ধরতে পারল। তাদের গুপ্তচররা চোরাই পথে আসা ট্রেগুলোর হদিস পেয়ে বেশ কিছু ট্রে পাকড়াও করে নিয়ে যেতে লাগল নিজেদের দপ্তরে। নানাভাবে পরীক্ষা করল। ভাঙল টুকরো-টুকরো করে–তবু কিছু ধরতে পারল না। আজ পর্যন্ত ধরা যায়নি ওগুলো কেন আসত, কী কাজে লাগত জার্মানদের। তবে শেষপর্যন্ত মনে হয়েছিল, ওই প্রজাপতিগুলো দখেতে যতই সুন্দর হোক, শখ করে ওগুলো কেনা হত না, চোরাই পথে আনানো হত না। ওগুলো ছিল সিক্রেট মেসেজ পাঠাবার অদ্ভুত এক ব্যবস্থা। কিন্তু কী গোপন খবর আসত, কীভাবে সেই প্রজাপতির রং আর ডানার নকশা থেকে খবরটা জার্মানরা ধরত তা ব্রিটিশ গুপ্তচররা বুঝতে পারেনি। ওটা রহস্য থেকে গেছে।”
কিকিরা বললেন, “আপনার বাবার কাছে এইরকম একটা ট্রে ছিল?”
“হ্যাঁ। যুদ্ধের শেষে বাবা এইরকম একটা ট্রে হাতে পেয়েছিলেন। সেটা তিনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। বাবার মুখেই আমি বাটারফ্লাই ট্রে-এর কথা শুনেছি।”
“আপনার বাবা মারা যাওয়ার পর—”
“বাবা বেশিদিন বাঁচেননি। পঞ্চাশ পেরোবার আগেই মারা যান। আমাও মাও বছর কয়েক পরে মারা যান।”
কিকিরা বললেন, “এই ট্রে আপনার কাছে ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“নিজের কাছেই রাখতেন সব সময়?”
“না। আমি সার্কাসের সঙ্গে ঘুরে বেড়াই। ও-জিনিস নিজের কাছে রাখব কেমন করে!”
“তা হলে?”
“এবার আমার কাছে ছিল। মধুপুরে বোনের কাছেই বরাবর থাকত ওটা। এই মাসখানেক আমার কাছে ছিল। মধুপুর থেকে নিয়ে এসেছিলাম।”
“কেন?”
“কেন!.. গত ডিসেম্বরে আমি খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখি। ইংরিজি কাগজে। পারসোন্যাল কলমে। কলকাতার এক ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন, তিনি ব্রাজিলিয়ান বাটারফ্লাই ট্রে খোঁজ করছেন। তিরিশ হাজার টাকা কিংবা তার কিছু বেশি তিনি দিতে পারেন ট্রে-এর জন্যে।”
“ও! আপনি ওটা বিক্রি করতে চাইছিলেন।”
“হ্যাঁ। টাকার আমার খুব দরকার রায়বাবু। অন্তত হাজার চল্লিশ।”
“এত টাকা দরকার?”
কৃষ্ণমূর্তি চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। অন্যমনস্কভাবে সিগারেট ধরালেন আরও একটা। তারপর বিষণ্ণ গলায় বললেন, “আপনাদের কাছে কোনো কথাই যখন লুকোলাম না, তখন আর-একটা কথাও লুকোব না। … বছর চারেক আগে আমি মল্লিকের কাছ থেকে তিরিশ হাজার টাকা ধার করেছিলাম। আমার বোনের জন্যে। তারা বড় অসুবিধেয় পড়েছিল। আমার ভগ্নীপতির পা চলে যায়। তার চিকিৎসা ছাড়াও মধুপুরের বাড়িটা ছেড়ে দিতে হত টাকাটা না পেলে। মল্লিকের কাছ থেকে টাকাটা নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম শোধ করে দেব ধীরে-ধীরে। পারিনি। বরং সেই টাকার সুদ গুনতে হয়েছে আমাকে। এখন বোধ হয় হাজার পঁয়ত্রিশ মল্লিককে দিতে হবে। হালে সে বড় তাগাদা দিচ্ছিল। টাকাটা নাকি সে তার বন্ধু আর পার্টনার ধনিলালের কাছ থেকে নিয়ে আমায় দিয়েছিল।”
কিকিরা বুঝতে পারলেন।
“আমি মল্লিককে বলেছিলাম-”এবার টাকাটা আমি দিয়ে দেব। ব্যবস্থা করছি। মল্লিককে আমি ট্রে-টা দেখিয়েছিলাম। কাগজের লেখাটাও।”
কিকিরা যেন এবার অনেকটা পরিষ্কারভাবে ঘটনাটা বুঝতে পারছিলেন। বললেন, “মল্লিকবাবুকে আগে কখনো ট্রে দেখাননি?”
