“আপনি এখনও বলতে পারেন।”
“চা-টা অন্তত খেয়ে নিন। ..মূর্তিসাহেব আমি ম্যাজিশিয়ান হলেও কুকিং এক্সপার্ট। আপনার জন্যে নিজের হাতে দু-তিনটে খাবারও করেছি। দেখুন, মুখে কেমন লাগে।”
বগলা চা নিয়ে এল।
.
চা খাওয়া শেষ হল।
কিকিরা তাঁর কথা বলতে লাগলেন। কিছুই লুকোলেন না। যা ঘটেছে। অর্থাৎ চন্দন, হাসপাতালের সিস্টার মায়া, অনিল, অনিলের পালিয়ে আসা, লুকিয়ে থাকা, কৃষ্ণমূর্তির বিরুদ্ধে তার অভিযোগ, ভয় দেখান, শাসানো, মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া ইত্যাদি সবই বললেন একেএক।
কৃষ্ণমূর্তি একমনে শুনছিলেন সেসব কথা। মুখের ভাবভঙ্গি পালটে যাচ্ছিল মাঝে-মাঝে। কখনও রাগে মুখ কেমন শক্ত হয়ে উঠছিল, নাকমুখ কুঁচকে যাচ্ছিল ঘৃণায়, কখনও বিড়বিড় করে কিছু বলছিলেন, গালমন্দ করছিলেন অনিলকে।
কিকিরার কথা শেষ হওয়ার পর সকলেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। কৃষ্ণমূর্তি এমন ভাবে বসেছিলেন যেন রাগে, বিরক্তিতে, ঘৃণায় তাঁর সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে।
খানিকক্ষণ পরে কিকিরা বললেন, “প্রথমেই আমার কেমন খকটা লেগেছিল, মূর্তিসাহেব। আমি নাক গলাতে চাইনি। চাঁদু–মানে চন্দনই বেশি গা। দেখাল। অবশ্য তার দোষ নেই। অনিলের দিদি ময়ার কথা শুনেই সে ভেবেছিল ছোকরার সত্যিই কোনো বিপদ হতে পারে।”
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “বুঝতে পারছি। ওই ছেলেটি …চন্দন–ডাক্তার বললেন না?”
“হ্যাঁ। এখন হাসপাতালে ডাক্তার হয়ে আছে। চাঁদুই প্রথম অনিলকে দেখে।”
“সেই চোর, বদমাশ, স্কাউড্রেলটা এখন কোথায়?”
“কলকাতাতেই লুকিয়ে আছে।..বলব আপনাকে। তার আগে আপনার তরফ থেকে কিছু শুনতে চাই। আপনি স্যার আমাদের বিশ্বাস করতে পারেন। আর এটাও নিশ্চয় বিশ্বাস করবেন আপনার সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র খারাপ ধারণা থাকলে–এত কথা বলতাম না। আপনাকে নিজের বাড়িতে ডেকেও আনতাম না। শুধু আপনার মুখ থেকে আসল ব্যাপারটা জানার জন্যে আপনাকে এখানে এনেছি। সার্কাসের তাঁবুতে সব কথা হয় না মূর্তিসাহেব। সময়ও হয় না।”
কৃষ্ণমূর্তি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। ভাবলেন। তারপর বললেন, “অনিল কোথায় আপনি জানেন?”
“জানি। তারাপদও জানে।” বলে তারাপদকে দেখালেন।
“আমায় সেখানে নিয়ে যাবেন?”
“যাব। যাব বলেই আপনাকে ডেকেছি। কিন্তু তার আগে আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই সত্যি কী ঘটেছে?”।
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “বেশ, আপনাদের আমি বলছি। যা-যা ঘটেছেবলব। তবে ছোট করে।”
“তাই বলুন।”
কৃষ্ণমূর্তি তাঁর কথা শুরু করলেন। “অনিল কীভাবে সার্কাসে এসে পড়েছিল সেকথা আপনাদের বলেছে। মিথ্যে বলেনি। মল্লিক তাকে এনেছিল। আমি প্রথমটায় তাকে নজর করতে চাইনি। সার্কাসে এরকম মামুলি খেলোয়াড় দু-চারটে আসে। চলেও যায়। ভেবেছিলাম, মল্লিকের শখ হয়েছে। এনেছে, ছোঁক দু-চার মাস পরে নিজেই চলে যাবে সাকার্স ছেড়ে।…দেখলাম, সে গেল না। বরং তার মন পড়ে গেল সার্কাসে। যত্ন। করে খেলা শিখতে লাগল। হরদম প্র্যাকটিস করত। তখন আমিও তার দিকে ঝুঁকে পড়লাম। ওকে নানা ব্যাপারে সাহায্য করতে লাগলাম। খেলার ব্যাপারেও। ছোকরাকে আমি পছন্দই করেছিলাম রায়বাবু। ভাল লাগত। ভালবাসতাম।”
কিকিরা বললেন, “অনিল নিজেও তা বলেছে। গোড়ায়, আপনি তাকে পছন্দ করলেও পরে–”
“মিথ্যে বলেছে। পরেও আমি তাকে ভালবাসতাম। আমি কোনোদিনই নিজে তাকে আমার খেলা শেখাতে চাইনি। সেই বরং আমায় বলত খেলাটা তাকে রপ্ত করিয়ে দিতে। অনিল যদি বলে থাকে আমি তাকে খেলা শেখাবার নাম করে জখম করার চেষ্টা করতাম–তবে সে আগাগোড়া বানিয়ে বলেছে, মিথ্যে বলেছে।”
“আপনি কি তার খেলা দেখানোর বাইকটায় গণ্ডগোল করে রেখে দিতেন?”
“না। আমি জানি তাতে কী বিপদ হতে পারে।”
“ওকে শাসানোর জন্যে আপনি কাগজ গুঁজে রেখে দিয়ে যেতেন ওর তাঁবুতে।”
“না। কখনও নয়।”
“কাগজ থেকে অক্ষর কেটে-কেটে শাসানোর কথাগুলো লেখা থাকত বলে ও বলেছে।”
“বানানো কথা–।”
“আমারও তাই মনে হয়েছিল। কাগজের অক্ষর কেটে-কেটে কেউ চিঠি লেখে না। মানে নর্মাল প্রসেস নয়। টাইপ করে লিখতে পারে হাতের লেখায় যেন ধরা পড়ে না যায়।”
“সে আপনারা জানেন। আমি তাকে চিঠি লিখে কখনও শাসাইনি।”
“শেষের দিকে আপনার সঙ্গে নাকি সম্পর্ক ভাল ছিল না?”
“ভাল ছিল নাকেন? আমি ওকে কী করেছিলাম? ও যদি নিজে আমাকে এড়িয়ে চলে, আমি কী করব!”
এমন চন্দন এসে হাজির হল।
কিকিরা বললেন, “সেকি! তোমার তো দুপুরে আসার কথা।”
চন্দন আগেই কৃষ্ণমূর্তিকে দেখে নিয়েছে। হেসেছে সামান্য। চন্দন বলল, “কাজ শেষ না করেই চলে এসেছি বলবেন না। আজ একটু তাড়াতাড়ি হয়ে গেল।”
“ভালই হয়েছে। বসো। “
চন্দন বসল।
কিকিরা কৃষ্ণমূর্তির দিকে তাকালেন। বললেন, “যা বলছিলেন, স্যার। অনিল নিজেই আপনাকে এড়িয়ে যাচ্ছিল। কারণটা কী?”
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “কারণটা আপনারা জানেন না। আমিও বুঝতে পারিনি। বুঝলাম সেদিন, যেদিন দেখলাম, আমার ট্রাঙ্ক থেকে একটা দামি জিনিস চুরি গিয়েছে। আর অনিলও পালিয়েছে সার্কাস ছেড়ে।”
“কিকিরা বললেন, “কী জিনিস?”
“বাটারফ্লাই ট্রে।”
কিকিরা, তারাপদ চন্ন–তিনজনেই অবাক। বাটারফ্লাই ট্রে? মানে, একটা ট্রে! না অন্য কিছু?
কিকিরা অবাক হয়ে বললেন, “সেটা কী জিনিস মূর্তিসাহেব?”
