চন্দনের ভাল লাগছিল না। মায়াদির কথায় সে আগ বাড়িয়ে অনিলকে ধরে এনেছিল কিকিরার কাছে। মায়াদি তো তাকে কিকিরার কথা বলেননি। তিনি জানেনই না কিকিরাকে। চন্দন নিজেই গরজ দেখাল। ভাবল, মায়াদির একটা উপকার করা যাক। অনিলও প্রথমে গা করেনি কিকিরার কাছে আসতে। মায়াদি জোর করলেন, কান্নাকাটি করলেন। ভাইয়ের জীবন নিয়ে তিনি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। …যা হওয়ার তা তো হয়ে গিয়েছে–এখন কী করা যায়! অনিল ছোকরাকে আর পছন্দ হচ্ছিল না চন্দনের।
কিকিরা বললেন, “তারা, সেদিন তো অনিলকে বলে এলুম একবার আসতে। সে কিন্তু এল না।”
“কেন বলুন তো?”
“তাই ভাবছি। আমি ভেবেছিলাম সে আসবে।… কেন ভেবেছিলাম জানো? অনিল যখন চকের বাক্স খুলে দখেছে–ওর মধ্যে থেকে একটা টিউব গায়েব হয়ে গিয়েছে–ও আমাকে সন্দেহ করবে। করতে পারে। আর সন্দেহ করলে আসা উচিত। তাই না?”
“হয়ত সন্দেহ করেনি বা চকের বাক্সটা খুলে দেখেনি।”
“হতে পারে। আবার এমনও তো হবে পারে–এখন সে বুঝতে পেরেছে। আমরা নিতান্তই ভদ্রতা রক্ষা করতে সেদিন তার কাছে যাইনি। কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়েছিলাম। আর রঙের একটা টিউবও নিয়ে এসেছি চুরি করে। এখন তার সন্দেহ হয়েছে। ভয়ে সে আসতে পারছে না। ভাবছে, যদি ফেঁসে যায়!”
তারাপদ মাথা নাড়ল।
চন্দন বড় করে নিশ্বাস ফেলে বলল, “কিকিরা, আমি কি অনিলের কাছে যাব?”
“এখন নয়। তার আগে কৃষ্ণমূর্তিকে নিয়ে কী করি বলো তো? ওঁকে বেশি দরকার। মূর্তির কাছ থেকে কথা বার করতে না পারলে–আমি ধরতেই পারছি না কিছু।”
“আপনি ওঁকে নিয়ে বসুন তা হলে কোথাও।”
“বসার জায়গা বলতে আমার এই বাড়ি। তাতে আমরা ধরা পড়ে যাব ঠিকই। কিন্তু কৃষ্ণমূর্তি হয়ত সত্যি কথাটা বলতে পারেন। জানি, এটা ঝুঁকি নেওয়া হবে। এ ছাড়া উপায় নেই।”
তারাপদ আর চন্দন নিজেদের মধ্যে কথা বলল। শেষে তারাপদ বলল, “স্যার, তাই করুন। কৃষ্ণমূর্তিকে এখানেই আনুন। তারপর যা হওয়ার হবে। আমাদের আর কী হবে! ফাঁসি তো হবে না।”
.
০৯.
তারাপদই নিয়ে এল কৃষ্ণমূর্তিকে।
চন্দন আসবে দুপুরের পর। হাসপাতাল ফেরত।
কৃষ্ণমূর্তিকে সদর খুলে দিলেন কিকিরা; হাত বাড়িয়ে সাদর অভ্যর্থনা করলেন। “আসুন মূর্তিসাহেব। গরিবের বাড়িতে আপনার পায়ের ধুলো পড়ল। আসুন।”
কৃষ্ণমূর্তিকে নিয়ে নিজের ঘরে আসতেই মূর্তি পা যেন আটকে গেল। ভীষণ অবাক হয়ে তিনি ঘরটা দেখছিলেন। কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। এরকম বিচিত্র ঘর তিনি জীবনে দেখেননি। এখানে কী আছে আর কী নেই। মুখে কথা আসছিল না মূর্তির। চোখের পলকও যেন পড়ছিল না।
কিকিরা হাসি-হাসি মুখে বললেন, “বসুন।… ওই জায়গাটায় বসুন। আরাম পাবেন। তারাপদ, চায়ের কথা বলো, আগে একটু চা হয়ে যাক। এখন তো মাত্র বেলা এগারোটা।”
কৃষ্ণমূর্তির মুখে কথা ফুটল। “এই ঘর আপনার?”
“ঘর বলতে পারেন, জাদুঘরও বলতে পারেন, কিকিরা তামাশা করে বললেন।
তারাপদ মজার গলায় বলল, “ওল? কিউরিয়োসিটি শপও বলতে পারেন। চোরাবাজারের হরেক জিনিস এখানে পাবেন, মায় বাগবাজারের টপ্পা গাইয়ে, অমুকের গাঁজার কলকে, থিয়েটারের ফুলুট…।” বলে হাসতে হাসতে সে চায়ের কথা বলতে গেল।
কৃষ্ণমূর্তি বসলেন। তাকিয়ে-তাকিয়ে তখনও এই অদ্ভুত ঘরটি দেখছিলেন। শেষে বললেন, “রায়বাবু, আপনি কে?”।
কিকিরা হাসিমুখেই বললেন, “আমি কিকিরা। কিঙ্করকিশোর রায়। ছোট করে কিকিরা।”
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “আর?…আমি সেদিনও আপনাকে কথাটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। আপনি জবাব দেননি।”
কিকিরা বললেন, “আমি সামান্য লোক। নিন একটা সিগারেট খান ততক্ষণে।” কিকিরা পকেট থেকে ভাল সিগারেট বার করে এগিয়ে দিলেন।
“আগে একটু জল খাওয়ান।” এমনভাবে বললেন কৃষ্ণমূর্তি যেন কিকিরার কাছে এসে তাঁর গলা শুকিয়ে গেছে।
“বলছি।” কিকিরা দরজার কাছে গিয়ে বগলাকে জল আনতে বললেন।
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “আপনি আমায় অবাক করেছেন। তবে একটা কথা–আপনারা যে কোনো ইম্প্রেসারিও কোম্পানির লোক নন–সেটা আমি আন্দাজ করেছিলাম।”
“কেমন করে?”
কৃষ্ণমূর্তি এবার একটু হাসলেন। বললেন, “রায়বাবু, আমি সার্কাসে অনেককাল আছি। এ লাইনের কথা জানি। মানুষও কম দেখিনি। খেলার তাঁবু কেমন করে পড়ে আমি জানি। আপনি ওখানে একটু গলতি করেছিলেন। পরে ভাবলাম কী জানি হয়ত আপনারা কোম্পানি খুলে সার্কাস পার্টিও বসাচ্ছেন।”
বগলাচরণ জল নিয়ে এল।
কৃষ্ণমূর্তি জলের গ্লাস নিলেন। জল খেয়ে ধীরেসুস্থে সিগারেট ধরালেন।
কিকিরা বললেন, “স্যার, তবে সত্যি কথাটা বলি। আমি হলাম ম্যাজিশিয়ান। কিকিরা দি ওয়ান্ডার। এখন অবশ্য আর খেলা দেখাই না।”
“মাঝে-মাঝে দেখান। “
“মানেটা বুঝলাম না সাহেব।”
“আদিনাথকে দেখিয়েছেন। আমি শুনেছি। হরিশবাবুও সেই ম্যাজিক দেখেছেন।”
“ও ম্যাজিক নয়, হাত সাফাই।”
“তা হল। এখন বলুন আমাকে আপনি কোন সাফাই দেখাতে চান? এত খাতির করে নেতন্তন্ন খেতে ডেকেছেন যখন-তখন বিনি মতলবে ডাকেননি। আমিও সেটা বুঝে এসেছি।”
তারাপদ ঘরে এল।
কিকিরা বললেন, “মূর্তিসাহেব, আমার কোনো বদ মতলব নেই। কীইবা থাকবে! গরিব মানুষ। নিজের মনে থাকি আর ডুগডুগি বাজাই।”
“বলুন, কেন এনেছেন এখানে?”
“বলব স্যার। কিকিরা ভদ্দরলোক। আপনি আসতে না আসতে বিরক্ত করতে সে চায় না। চা-টা খান। একটু জিরিয়ে নিন। সব কথাই বলব আপনাকে।”
