“কেন?”
“ও আগাগোড়া মিথ্যে কথা বলছে। তারাপদকেই জিজ্ঞেস করো–”
চন্দন আজ আর অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হল না। সে সবই শুনেছে কিকিরা আর তারাপদর মুখে। শুনে তার খারাপ লেগেছে।
কিকিরা বললেন, “কয়েকটা জিনিস তুমি খেয়াল করে দেখো। প্রথম হল, অনিল যেভাবে কৃষ্ণমূর্তিকে ভিলেন সাজাতে চেয়েছে আমাদের কাছে–মূর্তিসাহেব তেমন লোক নন। সার্কাসের হরিশবাবু তার সাক্ষী। এমনকী আমি আদিনাথকেও ঠারেঠোরে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, মূর্তিকে কেউ শয়তান, খুনে, বদমাশ ভাবে না। তিনি অহঙ্কারী, মাঝে-মাঝে চেঁচামেচি করেন, রাফ হয়ে ওঠেন–এই একমাত্র তাঁর দোষ। আবার লোকটা বেশ ভাল বলেও শুনলাম। কাজেই অনিল আগাগোড়া কৃষ্ণমূর্তিকে যেভাবে দেখাতে চেয়েছে সেটা ঠিক নয়। নিজের কোনো উদ্দেশ্য মেটাবার জন্যে মূর্তির নামে অত কথা বলেছে।”
চন্দন বলল, “মূর্তিরও কিন্তু প্রচণ্ড রাগ দেখলাম অনিলের ওপর।”
“হ্যাঁ। সৈকথায় পরে আসছি।” কিকিরা এতক্ষণ পরে চুরুটটা ধরিয়ে নিলেন। চুরুট ধরিয়ে বললেন, “অনিল যে মিথ্যে কথা বলে যাচ্ছে তার আর একটা প্রমাণ, অনিল সার্কাসের লোকের সঙ্গে লুকিয়ে যোগাযোগ রেখেছে। যার সঙ্গে রেখেছে তার নাম নাইডু বা লঘু। সাইকেলের খেলা দেখায়। নস্যিখোর। তার নস্যির ডিবে অনিলের ঘরে পাওয়া গেছে। অথচ অনিল আমাদের কাছেও বলেছে, দিদি ছাড়া তারক কাছে কেউ আসে না। অথচ তার কাছে সার্কাসের লম্বু আসে। কেন আসে?”
বগলাচরণ চা নিয়ে এল।
কিকিরা তাঁর চা নিয়ে একটু সোজা হয়ে বসলেন। বগলা চলে গেল।
সামান্য থেমে কিকিরা বললেন, “তোমাদের কি মনে আছে, দ্বিতীয় দিন ও যখন একলা-একলা আসে তখন বলেছিল, ইলেকট্রিকের দোকানে একটা ঘণ্ডাগুণ্ডা লোক বসে থাকায় ও ভয় পেয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে পারছিল না। লোকটাকে নাকি ও দোকানে বসে থাকতে দেখেছিল সারাবেলা, তার ঘরের জানলা দিয়ে। পরে বিকেলে যখন রাস্তায় নামল-তখনো লোকটাকে দেখে সে আর এগোতে ভরসা পায়নি। মনে আছে কথাটা?”
তারাপদ আর চন্দন ঘাড় নাড়ল।
কিকিরা বললেন, “এটাও মিথে কথা। আমি সেদিন অনিলের ঘরের জানলা খুলে বাইরে দেখছিলাম। ওটা পশ্চিম দিকের জানলা। ওখান থেকে গলির মুখের ইলেকট্রিকের দোকান দেখা যায় না।”
চন্দন বলল, “ছেলেটা পর-পর এত মিথ্যে কথা বলল কেন?”
কিকিরা বললেন, “সেদিন না হয় দেরি করে আসার জন্যে একটা অজুহাত খাড়া করেছিল। আমি ওটা বাদ দিচ্ছি। হয়ত ওর ঘরে কেউ এসেছিল–তাই দেরি হচ্ছিল।… কিংবা ও বোঝাতে চাইছিল, ওর ওপর নজর রাখা হচ্ছে।”
তারাপদ বলল, “ও ছেলে খুব সেয়ানা, স্যার। তাই তো মনে হচ্ছে।”
কিকিরা বললেন, “আরও একটা জিনিস তোমরা জানো না। তারাপদ খানিকটা জানে। অনিলের ঘরে আমি একটা মামুলি ছোট বাক্স পাই। চক পেনসিল রাখার বাক্স। সেই বাক্সর মধ্যে চকের বদলে কয়েকটা টিউব ছিল। রঙের টিউব। ছোট সাইজের একটা টিউব আমি পকেটে পুরি নিয়ে চলে এসেছিলাম। সেই টিউবটা দেখবে?”
তারাপদ আর চন্দন কৌতূহলের চোখে চেয়ে থাকল।
কিকিরা উঠলেন। চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলেন একপাশে।
ঘরের এককোণে ঝোলানো একটা সেলফ থেকে কাগজে মোড়া কী যেন নামিয়ে নিলেন। নিয়ে এগিয়ে এসে চন্দনের হাতে দিলেন। “নাও, খুলে দেখো।”
চন্দন কাগজ খুলল। দেখল, রঙের টিউব। টিউবের গায়ে যে ছাপা কাগজ জড়ানো ছিল সেটা কেউ খুলে ফেলেছে। টিউবের একটা পাশ পুরোপুরি কাটা। সরু করে। গা দিয়ে লাল রং বেরিয়ে প্রায় জমে রয়েছে।
চন্দন কিছুই বুঝল না। তারাপদও দেখল।
কিকিরা বললেন, “অনিল সার্কাসের খেলোয়াড়। ছবি সে আঁকে না। অন্তত তার কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি। তা হলে চকের বাক্সর মধ্যে রঙের টিউব লুকিয়ে রাখার মানে?”
তারাপদ বলল, “কী মানে?”
“মানেটা বলছি।” কিক্রি নিজের জায়গায় ফিরে এসে বসলেন। পকেটে হাত ঢোকালেন। কাগজে মোড়া কী যেন বার করে কাগজটা খুলতে-খুলতে বললেন, “ওই রঙের টিউবের মধ্যে এই প্ল্যাটিনাম নির্মানে ছুঁচটা ছিল।” ছুঁচটা দেখালেন কিকিরা।
চন্দন উঠে গিয়ে ছুঁচটা হাতে নিল। দেখল। ইঞ্চি চারেক লম্বা ছুঁচ। অনেকটা ক্রুশ কাঁটার মতন সরু। ফিরে এসে তারাপদকে দিল উঁচটা।
কিকিরা বললেন, “জিনিসটা আমিই রঙের টিউব থেকে বার করেছি। কিন্তু ওটা যে কী, বুঝতে পারিনি। যে ভদ্রলোককে তোমরা একটু আগে দেখলে তিনি পাকা লোক। ওঁর দোকান আছে পার্ক স্ট্রিটে। পুরনো জিনিস বেচাকেনা করেন। কিউরিয়ো শপের মতন দোকানটা। দত্তরায় আমার পুরনো বন্ধু। তাঁকে দিয়ে এসেছিলাম দেখতে। আজ সে ফেরত দিয়ে গেল। বলল, এ একেবারে খাঁটি প্ল্যাটিনাম। সেলাইয়ের দুচের মতন সরু না হলেও সরু। পেনসিলের সিসের মতন মোটা বড় জোর। তাই না?”
হ্যাঁ, তারাপদ বলল।
“ নিডল-শেপ। কিন্তু একটা জিনিস ভাল করে নজর করলে দখতে পাবে। ওই নিড়ল এর একটু মুখে কয়েকটা দানা আছে। চারটে দানা। বালির মতন।”
তারাপদরা দেখল।
কিকিরা বললেন, “এই প্ল্যাটিনাম নিডল রঙের টিউবের মধ্যে লুকিয়ে রাখার মানেটা কী? কে রেখেছে? কেন রেখেছে?”
চন্দন বলল, “স্যার, প্ল্যাটিনাম তো ভীষণ দামি জিনিস। সোনাকেও ছাড়িয়ে যায়।”
“সে পরের কথা। এই জিনিস এখানে কেন? এভাবে কেন? আর অনিলের কাছেই বা কেন?”
এত কেন’র একটারও উত্তর তারাপদদের জানা ছিল না। তারা চুপ করে থাকল।
