কৃষ্ণমূর্তি ক্রমশ যেন বিরক্ত, ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছিলেন। বললেন, “নেমকহারাম, বদমাশ। শয়তান।”
কিকিরারা কৃষ্ণমূর্তিকে লক্ষ করছিলেন। মূর্তিসাহেব বেশ উত্তেজিত, মুখ কঠিন হয়ে উঠেছে। চোখের দৃষ্টি রুক্ষ।
“কার কথা বলছেন? ছোকরা বদমাশ?” কিকিরা বোকার মতন ভান করে বললেন।
“বহুত নেমকহারাম। চোর।… আমি ওর পাত্তা লাগাচ্ছি বাবু। দু-একমাস ওই চোট্টা লুকিয়ে থাকবে। বরাবর পারবে না। আমি ওকে হাতে পাঁব।”
চন্দন আর তারাপদ চোখে-চোখে কী যেন কথা বলল। কিকিরা তারাপদদের দিকে তাকালেন না। কৃষ্ণমূর্তিকেই লক্ষ করছিলেন। শেষে বললেন, খানিকটা সহজ গলায়, “আপনি তো এখানে থাকছেন না। সার্কাসের সঙ্গে চলে যাবেন। তারপর মধুপুরে গিয়ে থেকে যাবেন বাড়িতে।”
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “আমি থাকি না থাকি আমার লোক থাকবে কলকাতায়। ওকে আমি ছেড়ে দেব না রায়বাবু।”
কিকিরা যেন মুখ ফসকে বলছেন, এমনভাবে বললেন, “ছোকরা কি আপনার ভয়ে পালিয়ে গেছে?”
কৃষ্ণমূর্তি সরাসরি সেকথার জবাব দিলেন না। বললেন, “চোর, চোট্টা, নেমকহারামরা কাকে ভয় পায়!”
“কী চুরি করেছে, স্যার?” বলেই কিকিরা নিজের অসাবধানতার জন্য যেন জিভ কাটলেন। “যাক গে। আপনাদের কথায় আমার মতন থার্ড পার্সনের থাকা কেন? মুখ ফসকে বলে ফেলেছি সাহেব। মাফ করবেন।”
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “মালিক আপনাকে কী বলেছেন?”
“উনি তো বললেন, উনি কিছুই জানেন না, ছোকরা কেন পালিয়েছে।”
“জানেন না? …না বলেননি?”
“তা হবে।”
“আচ্ছা! এবার।”
“হ্যাঁ স্যার, এবার আমরা যাই।… আপনাকে একটু বিরক্ত করলাম।”
কৃষ্ণমূর্তি ঘাড় নাড়লেন। ঠিক আছে।”
কিকিরা উঠে পড়লেন। উঠতে বললেন তারাপদদের।
তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসার সময় কিকিরার কী খেয়াল হল, এগিয়ে গিয়ে কৃষ্ণমূর্তিকে বললেন, নিচু গলায়, “একদিন আসুন না আমাদের ওখানে।”
কৃষ্ণমূর্তি যেন বুঝতে পারলেন না। তাকিয়ে থাকলেন। কিকিরা বললেন, “আপনার তো রাত্তিরের দিকে খেলা। দুপুর দুপুর একদিন চলে আসুন।”
“আপনাদের অফিসে? কোথায় অফিস?”।
“অফিসে কী যায়-আসে সাহেব! আপনি যাব বললে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আমরাই করব। আসুন একদিন। না হয় একটু খেয়েদেয়েই আসবেন। নেমন্তন্ন জানিয়ে যাচ্ছি।”
“দেখি।”
“আপনি আসুন। হয়ত আপনাকে একটু-আধটু সাহায্য করতে পারব স্যার।”
কৃষ্ণমূর্তি তাকিয়ে থাকলেন সামান্যক্ষণ। তারপর বললেন, “আপনি কে?”
কিকিরা হাসলেন। জবাব দিলেন না।
.
০৮.
পরের দিন আর সার্কাসে যাননি কিকিরা। যাওয়ার কথাও ছিল না।
তারাপদ আর চন্দন এল সন্ধের মুখে। তার আগেই শেষ শীতের এক পশলা খামখেয়ালি বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে রাস্তাঘাটও হয়ত ভেজেনি।
তারাপদরা এসে দেখল কিকিরা এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন। ভদ্রলোককে আগে কখনও দেখেনি তারাপদরা। তবে কিকিরার সঙ্গে এত লোকের চেনাজানা যে, সকলকে দেখা বা চেনার উপায় নেই।
তারাপদরা আসার পর-পরই ভদ্রলোক চলে গেলেন।
তারাপদ বলল, “কে স্যার? আগে তো দেখিনি।”
“ কিকিরা বললেন, “আমার এক পুরনো বন্ধু। ওল্ড ফ্রেন্ড।”
“আগে কখনো দেখিনি।”
“এদিকে আসে কই যে দেখবে। আমি একটা কাজে ওর কাছে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম কাজটা সেরে একবার আসতে দয়া করে। তাই এসেছিল। ওরা হল কাজের লোক বুঝলে তারাবাব, সময় কোথায় আসার। আমার মতন বেকার আর ক’টা পাবে। আমার হল হাউস ইটিং অ্যান্ড ফরেস্ট ব্যাফেলো ড্রাইভিং।”
চন্দন আর তারাপদ হাঁ হয়ে গেল। “কী বললেন স্যার!”
চন্দরা হো হো করে হেসে উঠল। মেজাজ খুশি থাকলে কিকিরা চমৎকার-চমৎকার ইংলিশ বলেন।
হাসি সামলাতে সময় গেল খানিকটা। তারপর চন্দন বলল, “অনেকদিন পরে আপনার মেজাজ শরিফ দেখছি।”
কিকিরা বললেন, “না। শরিফ একেবারেই নয়। তবে হ্যাঁ, একটু ভাল।”
“কিছু হয়েছে?”
“আশার আলোনা কী বলে যেন–তাই দেখছে পাচ্ছি।”
তারাপদরা জায়গামতন বসে পড়েছিল।
তারাপদ বলল, “আশার আলোটা কেমন একটু শুনি?”
মাথা হেলিয়ে কিকিরা বললেন, “শুনবে বাবা, তোমাদের শোনাব না তো কাকে শোনাব! তার আগে বলো তো, কৃষ্ণমূর্তি কোথায় এনে বসাই। “
“মানে?”
“বাঃ! কাল তে তাঁকে নেমন্তন্ন করে এলাম।”
চন্দন বলল, “আপনি বলছিলেন বটে। কিন্তু কাজটা কি ভাল করলেন?”
কিকিরা মাথার চুল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন, “খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই কাজটা করলাম। না করে উপায় ছিল না।”
“আমরা তো এবার ধরা পড়ে যাব, স্যার। সত্যি যদি একটা অফিস ঘর থাকত, তা হলে না হয় কৃষ্ণমূর্তিকে অফিসে বসিয়ে তারপর কোনো হোটেলে নিয়ে গিয়ে খাওয়ানো যেত। আপনি ওঁকে বসাবেন কোথায়? আমাদের মতলব, পেশা সবই তো তিনি জেনে যাবেন। হয়ত ওঁর মনে সন্দেহও হয়েছে।”
তারাপদ বলল, “কৃষণমূর্তি না আপনাকে জিজ্ঞেস করেছেন সেদিন–আপনি কে? আমরা অবশ্য আপনার শেষের কথা কিছু শুনিনি তখন–তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম। আপনি ওঁর সঙ্গে কথা বলে পরে বাইরে এলেন। তারপর নিজেই সব বললেন।”
কিকিরা চুরুশ হাতড়াতে লাগলেন। বললেন, “চাঁদু, আমি একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি। কৃষ্ণমূর্তি বা অনিল এরা যদি না নিজের থেকে সব কথা বলে–আমরা আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারব না। জানতেও পারব না। ওদের দু জনের একজনকে দিয়ে কথাটা বলাতে হবে। অনিলকে আর আমি বিশ্বাস করি না।”
