কিকিরা বললেন, “আপনাদের লম্বু বা নাইডু কেমন লোক?”
“সুবিধের মানুষ নয়।”
“আর মতিলাল?”
“মতিকে আপনি মালিকের মোসাহেব বলতে পারেন। সব সময় মালিকের কাছে থাকে। মালিক যা বলেন মতিও তাই বলে, জল উঁচু তো জল উঁচু জল নিচু তো জল নিচু।”
কিকিরা মনে হল, আপাতত আর হরিশবাবুকে ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। বেশি কচলালে লেবু তেতো হয়ে যায়, হরিশকে বেশি ঘাঁটালে সে অন্যরকম সন্দেহ করতে পারে।
.
তারাপদ আর চন্দন এসেছিল সময় মতন। কিকিরা খানিকটা সময় কাটিয়ে শেষে একসময় ধীরে ধীরে কৃষ্ণমূর্তির তাঁবুতে গিয়ে হাজির।
কৃষ্ণমূর্তি সবেই তাঁর খেলা দেখালো শেষ করে তাঁবুতে ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এই খেলাটা দেখাবার আগে কৃষ্ণমূর্তি কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলে না। বোধ হয় মনকে সংযত, স্থির রাখার চেষ্টা করেন। খেলা দেখানো হয়ে গেলে তিনি সোজা নিজের তাঁবুতে ফিরে আসেন। প্রচণ্ড মানসিক চাপের পর যেন ক্লান্তি লাগে বড়। দুর্বল মনে হয় নিজেকে। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সামলে নেওয়ার পর জল খান, চা খান। পোশাক-টোশাক খুলে ফেলেন। তারপর বিশ্রাম করেন।
কিকিরা আগেভাগেই সেটা জেনে নিয়েছিলেন। কৃষ্ণমূর্তি যখন বিশ্রাম করছেন–কিকিরা তামর দুই শাগরেদ নিয়ে তার তাঁবুতে ঢুকলেন।
তাঁবুতে ঢুকেই দুহাতে তাল বাজাবার মতন করে বললেন, কিকিরা, “অদ্ভুত স্যার। ওয়ান্ডারফুল। আজ আপনি টেক্কা দিয়ে দিলেন। কী খেলাই দেখালেন সাহেব। আমরা একেবারে দমবন্ধ হয়ে দেখলাম।”
কৃষ্ণমূর্তি এ-সময় কিকিরাকে এখানে দেখবেন ভাবেননি। বললেন, “আপনি! আপনারা?”
“আপনাকে সেলাম জানাতে এলাম সাহেব!”
“সেলাম!”
“আজকের খেলা বেস্ট।”
“রোজই দেখাই রায়বাবু!”
“তা তো দেখান। আমরাও দেখেছি। তবু সাহেবগুড, বেটার, বেস্ট আছে। আজ আরও ভাল লাগল। বেস্ট। নাকি হে তারাপদ?”
তারাপদরা যথারীতি ঘাড় নাড়ল।
কিকিরা বললেন, দেখুন মৃর্তিসাহেব। আমার এক চেনা ওস্তাদজি আছেন। রহিম খাঁ। তিনি বলেন, বেটা গানা তো রোজই গা, মাগর এক-কেদিন সুর আপনাই খেলা করে। …খুব দামি কথা। খেলা আপনি রোজই দেখান। এক-একদিন সেই খেলা আপনাকে ভর করে।”
কৃষ্ণমূর্তি হাসলেন। খুশি হলেন।
কিকিরা নিজেই এক প্যাকেট সিগারেট এগিয়ে দিলেন কৃষ্ণমূর্তিকে। কিনে আনিয়েছেন আগেই। দামি সিগারেট। “আপনার জন্যে এনেছি। রাখুন।”
কৃষ্ণমূর্তি হাসলেন। কিকিরার উদ্দেশ্য যেন বুঝতে পারছিলেন। বললেন, “ঠিক আছে, দিন। আপনারাও নিন।”
“আপনি নিন আগে। আমরা তো আছি।”
“চা খাবেন?”
“না না, চা নয়। অনেকবার খেয়ে ফেলেছি। আমার আবার ব্যাড লিভার। আর এরাও এইমাত্র চা খেয়েছে। ম্যাজিশিয়ান আদিনাথ খাইয়েছেন।”
কৃষ্ণমূর্তি নিজেই কথাটা তুললেন। বললেন, “রায়বাবু, আমি মালিকের সঙ্গে কথা বলেছি। মালিক বলছেন, দু’জায়গায় যেতে পারেন। টিটাগড় আর…”।
“চন্দননগর। “
“আর হবে না। শীত চলে গেলে সার্কাস সিজন খতম হয়ে যায়।”
“শীতের পর কোথায় যান আপনারা?”
“নর্থ বিহারে দু-এক জায়গায় ঘুরি। তারপর আমরা বেকার।”
“এত জিনিসপত্র,বাঘ, সিংহ, তাঁবু…”
“মালিকের দেশে চলে যায়। আবার দেওয়ালির পর… “
“ও! আপনি কি কলকাতাতেই থাকেন তখন?”
“না। আমি মধুপুরে থাকি। আমার বোনের ফ্যামিলি থাকে মধুপুরে।”
তারাপদ আর চন্দন কোনো কথা বলছিল না। শুনছিল। কৃষ্ণমূর্তিকে ওপর-ওপর বেশ ভদ্র মনে হয়।
নতুন প্যাকেটের সিগারেট বিলি করে কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “রায়বাবু, আপনি কাল মালিকের সঙ্গে কথা বলে নিন।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। বলবেন। তারপর হঠাৎ বললেন, “মূর্তিসাহেব, একটা কথা বলি। আমরা ব্যবসাদার লোক। বেড়াল যেমন মাছের গন্ধ শুঁকতে চায়, আমরাও দু পয়সা বেশি রোজগারের কথা ভাবি। শুনেছি, আপনি আগে বড় সার্কাসে ছিলেন। গোল্ডেন সার্কাস বড় নয়। বাইরেও এরা বেশি খেলা দেখায় না। ব্যবস্থা করতে পারে না। তা যেখানেই দেখাক, খেলা নিয়ে কথা। খেলা যত ভাল থাকবে তত লোক আসবে দেখতে। দু-চারটে ভাল খেলা নিয়ে মিয়ে ব্যবসা করা যায় না। যায়?”
“না,” মাথা নাড়লেন কৃষ্ণমূর্তি।
“আপনাদের সার্কাসে আপনি টপ। ট্রাপিজ চলনসই। জন্তু জানোয়ারের খেলা মামুলি। শুনলাম আপনারা।”
বাধা দিয়ে কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “এবছর একটা নতুন খেলা চালাবার চেষ্টা করেছিলাম। আটকে গেলাম। কামানের মুখ থেকে একটা মেয়েকে ছুঁড়ে দেওয়া? খেলা দেখেছেন?”
তারাপদ আর চন্দন মুখ চাওয়াচাওনি করল। কিকিরা বললেন, “দেখিনি। তবে এরকম খেলার কথা শুনেছি। কিবা কাগজে পড়েছি।”
“আমরা অ্যারেঞ্জ করতে পারলাম না। আটকে গেলাম।”
“আচ্ছা, আপনাদের তো আরও একটা মোটরবাইকের খেলা ছিল। দেখানো হচ্ছে না। মল্লিকসাব বলছিলেন, খেলোয়াড় ছোকরা পালিয়ে গেছে।”
কৃষ্ণমূর্তি চুপ। কয়েক পলক দেখলেন কিকিরাকে।
“সত্যি পালিয়ে গেছে? বাইরে আমরা খোঁজ নিচ্ছিলাম। খেলাটা নাকি মন্দ হত না।”
আপনারা দেখেছেন?”
“না, না সাহেব। আমরা আসার আগেই খেলাটা বাদ হয়ে গেছে।”
“ও।”
“ছোকরা কি সত্যি পালিয়ে গেছে, স্যার?”
মাথা নাড়লেন কৃষ্ণমূর্তি।
“হঠাৎ পালাল?”
“হ্যাঁ।”
“অদ্ভুত ব্যাপার! হয়েছিল কী?”
“সমালিক কী বলল?”
“উনি কিছু বলতে পারলেন না। বললেন, কী হয়েছিল জানেন না। তবে বাড়িতে খোঁজ করেছিলেন। হাসপাতালেও খোঁজ নিয়েছেন। থানায়”
