তারাপদ বলল, “আপনার সন্দেহ হচ্ছে?”
“সন্দেহ .. তা হচ্ছে বইকি! জিনিসগুলো তো মনে হল কাগজের আড়ালে লুকিয়ে রাখা।”
“কেন?”
“বলতে পারছি না।”
“হয়ত এমনি রেখে দিয়েছে।”
“একেবারে অকারণে। অকারণে একটা পেস্টবোর্ডের বাক্সর মধ্যে কয়েকটা রঙের টিউব রেখে দেবে।… আমি তো বাবা বুঝছি না।”
তারাপদ ঠাট্টার গলায় বলল, “স্যার, এটা কি আপনার কোনও ক্লু?”
কিকিরা কিছুই বললেন না। সিগারেট চাইলেন তারাপদর কাছে।
এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে ছিল দুজনে।
সিগারেট ধরানোনা হয়ে গেলে কিকিরা বললেন, “কাল তো তোমার অফিস। আমি সারাদিন বাড়িতেই থাকব। বিকেলে বেরোব। সার্কাসেই যাব। তুমি সোজা সার্কাসে চলে যাবে। পারলে চাঁদুকে নিয়ে যেয়ো।”
তারাপদ বলল, “যেতে-যেতে সন্ধে হবে।”
“তা হোক।”
.
০৭.
সার্কাসের তাঁবুর বাইরে হরিশবাবুকে নিয়ে অনেকক্ষণ ঘোঘারাঘুরি করে শেষে এক জায়গায় বসলেন কিকিরা। গতকাল রবিবার বলে যত ভিড় জমেছিল আজ অতটা ভিড় নেই। কিছু লোকজন তো থাকবেই।
হরিশকে নানা কথায় ভোলাতে-ভোলাতে শেষপর্যন্ত কিকিরা তাঁকে বশ করে ফেলেছিলেন। আবার এক দফা চা, সিগারেট খাওয়ানোর পর কিকিরা বললেন, “আচ্ছা, ওই খেলোয়াড়টির আর কোনও খবর পেলেন না?”
“কার? অনিলের?”
“হ্যাঁ।”
“না। কোনো খবর নেই।”
কিকিরা বললেন, “ছেলেটির খেলা দেখার বড় শখ ছিল আমার। ও থাকলে–বোধ হয় ব্যবসাটা জামানো যেত। কী বলেন? আমি নিজের ইন্টারেস্টে বলছি মশাই।”
হরিশ মাথান নাড়লেন। “খেলাটা ভালই হত। লোকে নিয়েছিল।”
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “আচ্ছা হরিশবাবু, ছেলেটি কেন পালাল বলতে পারেন?”
হরিশ বললেন, “কী জানি। কী যে হল–?”
কিকিরা চারপাশ দেখে নিলেন। এখানে কেউ নেই। একটু আড়ালে এবং আচ্ছাদনের তলায় তাঁরা বসে আছেন দুজনে। কিকিরা সাবধানে বললেন, “আপনি কিছু জানেন না?”
“আমি?”
“তা হলে মশাই আপনাকে বলি। একটা গুজব আমার কানে এসেছে। বলব আপনাকে?”
কিকিরা সতর্ক হয়ে বললেন, “আপনারা যতই বাইরে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করুন হরিশবাবু, গুজবটা কিন্তু শোন যাচ্ছে। সার্কাসে এত লোক। কে কখন বাইরে যাচ্ছে কার সঙ্গে কথা বলছে তা তো আপনাদের জানার উপায় নেই। তা ছাড়া আজ দশ-বারো দিন ধরে খেলাটা বন্ধ। গুজব তো রটবেই।”
“কিসের গুজব? কী বলছে বাইরে?”
“বলব?”
“বলুন।”
“সেই ছোকরাকে নাকি কেউ প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল সার্কাসের মধ্যে। “
হরিশবাবু থতমত খেয়ে গেলেন। কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক পলক। তারপর তোতলানোর মতন করে বললেন, “ককই।” আমি কিছু জানি না। এরকম গুজব কে রটাল!”
কিকিরা বুঝতে পারলেন হরিশবাবু ধাঁধায় পড়ে গেছেন। তাঁর চোখমুখ বলে দিচ্ছিল, তিনি যেন কিছু লুকোবারও চেষ্টা করছেন। কিকিরা বললেন, “আপনি বলছেন, গুজছ মিথ্যে? কিন্তু মশাই, গুজবটা যে মিথ্যে নয় তা আমি জানি।”
“কেমন করে জানলেন?”
“আমায় একজন বলেছেন।… হরিশবাবু, আপনি আমায় বিশ্বাস করতে পারছেন না! না পারলে আর কী করব!”
হরিশবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে বললেন, “আমাদের ভেতরের কথা বাইরে বলতে নেই, রায়বাবু! আমি আবার এদের দয়ায় আছি। বুঝতেই তো পারছেন! আমার মুখ থেকে কোনোও কথা…”
“আরে না, আপনার-আমার মধ্যেকার কথা অন্য লোকে জানবে কেন?” বলতে বলতে কিকিরা আবার একটা সিগারেট দিলেন হরিশকে।
হরিশ বললেন, “কী গুজব আপনি শুনেছেন?”
কিকিরা বললেন, “শুনেছি, কৃষ্ণমূর্তির সঙ্গে অনিল ছোকরার রেষারেষি ছিল। সেটা শেষপর্যন্ত এত বেড়ে যায় যে–”।
কিকিরাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে হরিশ বললেন, “কৃষ্ণমূর্তি গুকে খুন করার চেষ্টা করেছেন! বলেন কী! একথা যে বলেছেন সে মিথ্যে, বাজে কথা বলেছেন। বানানো কথা।”
কিকিরা অবাক হলেন না। বললেন, “আপনি জানেন?”
“জানাজানির কিছু নেই রায়বাবু। কৃষ্ণমূর্তিকে আমি এত বছর ধরে দেখছি। তিনি খানিকটা দেমাক নিয়ে থাকেন, রগচটা, মুখে যা আসে বলে ফেলেন। তবে কাউকে খুন করার মানুষ তিনি নম। আমি আপনাকে বলছি।”
“কৃষ্ণমূর্তিকে আমারও সেদিন ভাল লেগেছে। কিন্তু হরিশবাবু, বাইরে এ-গুজব রটল কেমন করে?”
“কেউ রটিয়েছে।”
“কেন?”
“কেমন করে বলব! হয়ত ইচ্ছে করেই।”
“এমন কে আছে?”
“বলতে পারব না। থাকতেও পারে।”
“আপনার কাকে মনে হয়? মানে, মূর্তির সঙ্গে একেবারেই বনে না কাদের?”
হরিশ সিগারেটের টুকরোটা প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন। বাকিটুকু শেষ করে বললেন, “আমি কাকে সন্দেহ করব। দু একজন থাকতে পারে।”
“কে-কে?”
“লম্বু। মতিলাল।”
“লম্বু কে? মতিলালই বা কে?”
“লস্তু হল নাইডু। সাইকেলের খেলা দেখায়। তার সবচেয়ে ভাল খেলা–এক চাকার লম্বা সাইকেল নিয়ে। আর মতিলাল হল জোকার-ক্লাউন।”
“কৃষ্ণমূর্তির সঙ্গে এদের ঝগড়া নাকি?”
“মেলামেশা নেই। কেউ কাউকে দেখতে পারে না।”
“অনিলের সঙ্গে এদের বোধ হয় ভাবসার আছে।”
“লম্বুর সঙ্গে বেশি।”
“আচ্ছা, একটা কথা হরিশবাবু। লম্বু কি নস্যি নেয়?”
হরিশ কেমন অবাক হয়ে গেলেন। হঠাৎ নস্যির কথা কেন। বললেন, “নস্যির কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন! হ্যাঁ, নেয়।”
কিকিরা যেন শেষমেশে একটা আলোর ঝিলিক দেখতে পেলেন। বললেন, “নাইডুর পুরো নামটা কী?
“আমরা তো বুড্ডি বলে জানি।”
কিকিরা এবার নিশ্চিন্ত। এই নাইডু বা লম্বুর সঙ্গে অনিলের নিশ্চয় যোগাযোগ আছে। নাইডু অনিলের কাছে যায়। লুকিয়ে। কিন্তু কেন? তার নস্যির কৌটো অনিলের ঘরে পড়ে থাকার আর অন্য কী মানে হয়।
