কিকিরা ইশারা করলেন। তারাপদ সরে গেল দরজার কাছে। অনিলকে নজর করতে লাগল।
কিকিরা তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে অনিলের কিট ব্যাগটা দেখলেন। বন্ধ। চেন টানা। তালা লাগানো। সুটকেসও তালা বন্ধ। কিট ব্যাগ আর সুটকেসের পাশে একটা ছোট সরু কৌটো পড়ে ছিল। কৌটোটা তুলে নিলেন কিকিরা। দেখলেন। নস্যির ডিবে মনে হল। মুখটা খুললেন। গন্ধ পাওয়া গেল। নস্যি। কালো রঙের ডিবেটা বোধ হয় হাড়ের। ডিবের পাশে খোদাই করা ইংরিজি “N” অক্ষর লেখা। তার তলায় বাঁকাভাবে আরও দুটো খুদে ইংরিজি অক্ষর-জি সি। দেখে মনে হয়, কেউ কাঁচা হাতে নরুন বা ওইরকম কিছু দিয়ে ডিবের গায়ে অক্ষর গুলো লিখেছে।
“অনিল কি নস্যি নয়, তারাপদ? দেখেছ নিতে?” কিকিরা হঠাৎ বললেন।
“কই না!”
কিকিরা পকেটে পুরে নিলেন কৌটোটা। পোরার আগে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন আবার। একটু ঘাটাঘাটি করলেন জায়গাটা। জুতোর বাক্স আর পুরনো কাগজের আড়ালে পেস্ট বোর্ডের ছোট একটা বাক্স। খুবই ছোট। ওপরে লেখা আছে “ভেনাস চক’। কোম্পানির ছাপ। মানে কি আছে বাক্সটায়। কিকিরা আড়চোখে দরজার দিকে একবার সাবধানে তাকালেন। তারাপদ বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে, দেখছে অনিল আসছে কিনা।
বাক্সটার ওপর দিকের ঢাকা আলগা ছিল। কিকিরার লড়াতাড়ি ভেতরটা দেখে নিলেন। দেখে অবাক হয়ে গেলেন। চক বা খড়ি রাখার বাক্সর মধ্যে কয়েকটা ছোট-ছোট টিউব। একটা টিউব তুলে নিলেন কিকিরা। দেখলেন। গায়ে লেখা আছে সোয়ান কালার। মানে রং। ছবি আঁকার রং। গায়ে ছোট-ছোট হরফে আরও কিছু চোখের সামনে না ভাল করে ধরলে পড়া যাবে না।
কিকিরা বুঝতে পারলেন না, এত–প্রায় ছ-আটটা রঙের টিউব রাখার মানেটা কী? অনিল কি ছবি আঁকে? কই, তা তো জানা ছিল না। আশ্চর্য। ছবি আঁকার অন্য কোনো চিহ্ন তো কোথাও চোখে পড়ছে না।
তারাপদ শব্দ করল।
কিকিরা বুঝতে পারলেন অনিল আসছে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের অজান্তেই যেন একটা টিউব পকেটে ভরে ফেললেন।
অনিল যখন ঘরে লে–কিকিরা জানলার কাছে সরে গিয়েছেন।
“আপনার জল।” অনিল জলের বোতল রেখে একটা গ্লাস নিয়ে এল। কাচের গ্লাস। ঘরেই ছিল। গ্লাস ধুয়ে জল ঢেলে এগিয়ে দিল।
কিকিরা জলের গ্লাস নিতে নিতে বললেন, “জানলাটা খুলে দেখছিলাম। কোন দিক ওটা?”
“পশ্চিম হবে। খেয়াল করিনি।”
জল খেলেন কিকিরা। আরামের নিশ্বাস ফেললেন। “আজ খানিকটা গরম-গরম লাগছে তাই না।”
অনিল কোনো কথা বলল না।
কিকিরা আরও দু-একটা সাধারণ কথা বললেন।
তারাপদ বুঝতে পারছিল এখানে আর অপেক্ষা করার মানে হয় না। কিকিরার পক্ষে এখন সরে যাওয়াই ভাল। বলল, “চলুন সার, আমাকে একবার ভবানীপুর যেতে হবে। আপনাকে বাসে তুলে দিয়ে আমি মিনি ধরব।”
কিকিরা বললেন, “, চলো।” বলে অনিলের দিকে তাকালেন। “তুমি তো বেরোচ্ছিলে, যাবে নাকি?”
অনিল বলল, “একটু পরে যাচ্ছি।”
পা বাড়িয়ে কী মনে করে কিকিরার বললেন, “অনিল, তুমি একবার সার্কাসে ফিরে গিয়ে দেখো না কী হয়! এত ভয় পাচ্ছ কেন?”
অনিল মাথা নাড়ল। না, সার্কাসে সে আর যাবে না।
“তোমার ইচ্ছে। …তা আমার ওখানে আসবে কবে?”
“যাব।”
“পরশু এসো। আমি থাকব।”
.
বড় রাস্তায় এসে কিকিরা বললেন, “তারা, ব্যাপারটা আরও প্যাঁচালো হয়ে উঠল মনে হচ্ছে।
তারাপদ মাথা চুলকে বলল, “দেখছেন কিছু?”
অন্যমনস্কভাবে কিকিরা বললেন, “অনিলের কাছে কেউ আসে না–কথাটা ঠিক নয়। ওর দিদি ছাড়াও নিশ্চয় কেউ আসে। অন্তত এসেছিল।”
“কেমন করে বুঝলেন?”
“এই নস্যির ডিবে।” নিজের পকেট দেখালেন কিকিরা। “নেশা হল সর্বনাশা। যে-লোক পান, সিগারেট, বিড়ি, নস্যির নেশা করেছে তার পক্ষে নেশা সামলানো মুশকিল। আমার মনে হয়, নস্যিখোর কেউ অনিলের কাছে আসে, বা এসেছিল। নইলে তার ডিবে ও-ঘরে পড়ে থাকত না। তা ছাড়া ডিবের ওপর নাম খোদাই আছে। “N’। N’-টা কে? আর জি. সি। জিসি তো গোল্ডেন সার্কাস!”
তারাপদ চমকে ওঠার মতন করে বলল, “কেউ কি ফেলে গেছে।”
“না না, ইচ্ছে করে ফেলে যায়নি। পকেট থেকে পড়ে গিয়েছে।”
“তা না হয় বুঝলাম–কিন্তু নস্যি নেওয়া কোন লোক অনিলের কাছে আসে জানব কেমন করে? আসার সার্কাসের লোক বলছেন আপনি! জি-সি তো অন্য কিছু হতে পারে।”
“দেখি। অনিলকেই হয়তো বলতে হবে। … আচ্ছা তারাপদ, সার্কাসে আমরা যাদের সঙ্গে দেখা করলাম তারা তো কেউ নস্যি নেয় বলে মনে হল না। নেয়?”
তারাপদ বলল, “কই, আমি তো দেখলাম না। … কিন্তু স্যার, বিড়ি, সিগারেট, নস্যি সাধারণ নেশা। এমন নেশা সার্কাসের লোকরা নিশ্চয় করে। তাতে আর কী হল?”
“না, কী আ হবে।…আচ্ছা আর-একটা কথা বলো তো। অনিল হল সার্কাসের খেলোয়াড়–সে রঙের টিউব নি কী করবে?”
“রঙের টিউব?”
“হ্যাঁ, ব্যাপারটা অদ্ভুত। সাধারণ একটা চকের বাক্সর মধ্যে বেশ কয়েকটা ছোট-ছোট রঙের টিউব।”
“আমি দেখিনি স্যার।”
“তোমার দেখার কথা নয়, তুমি বাইরে তাকিয়ে অনিলকে ওয়াচ করছিলে। আমি একটা টিউব উঠিয়ে নিয়েছি। পকেটেই আছে আমার।”
তারাপদ যেন মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝছিল না। নস্যির ডিবে, রঙের টিউব। একটার সঙ্গে অন্যটার সম্পর্ক কী?
অনেকটা হেঁটে এসে কিকিরা বললেন, “রঙের টিউবগুলো ভাল করে আমি দেখিনি। দেশি কোম্পানির, বুঝতে পারলাম। টিউবের ওপর ছাপা কাগজ জড়ানো।”
