বাড়ি খুঁজতে কষ্ট হল না কিকিরাদের। চন্দনের কাছ থেকে ভাল করে জেনে এসেছে তারাপদ। চন্দনের আর আসা হল না আজ। রবিবার হলেও অন্য কাজে আটকে গেছে।
কিকিরা তারাপদকে বললেন, “এই বাড়িটা মনে হচ্ছে! তাই না?”
তারাপদ বলল, “হ্যাঁ। চাঁদু বলেছিল বাড়ির উলটো দিকে একটা ভাঙা টিউবওয়েল আছে। “
“চলো তবে।”
সদর বলে বিশেষ কিছু নেই বাড়িটার। হাট করে ভোলাই ছিল। নিচে এপাশে-ওপাশে ভাড়াটে। যে যার নিজের মতন ব্যস্ত। ওরই মধে কোনও ঘরে টেলিভিশন খোলা রয়েছে মনে হল। জোর শব্দ আসছিল।
দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় কিকিরা বললেন, “পেন্সে হয়?”
তারাপদ বলল, “দেখা যাক। থাকতেও পারে।”
দোতলার সিঁড়ির শেষ মাথায় এক বুড়োর সঙ্গে দেখা। হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। যাচ্ছিল কোথাও।
কিকিরা তাকে অনিলের কথা জিজ্ঞেস করলেন। বর্ণনা দিলেন অনিলের চেহারার।
বুড়ো ডান দিকটা দেখিয়ে দিল। বাড়িটার দোতলায় সামান্য ফাঁকা জায়গা। খোলা ছাদ।
দোতলাতেও ভাড়াটেদের হই-হল্লা। কোথাও যেন কিছু একটা হয়েছে। পোড়া গন্ধ আসছিল।
আচমকা অনিলকে দেখা গেল।
অনিল যেন কোথাও বেরাচ্ছিল, হঠাৎ কিকিরাদের দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বেশ অবাক। “আপনারা?”
“তোমার কাছেই এলাম।”
অনিল ইতস্তত করছিল।
“কোথাও বেরোচ্ছ?”
“না, কাছেই। হোটেলে যাচ্ছিলাম।”
“হোটেলে?”
“কাছেই একটা হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে। ওখান থেকেই রাতের খাবার নিয়ে আসি।”
এই ভর সন্ধেবেলায় রাতের খাবার! কিকিরা অবাকই হলেন। বললেন না সেকথা। “ও!…তা খানিকটা দেরি হয়ে গেলে খাবার–”
“পাব। আসুন।”
অনিল ডাকল কিকিরাদের।
দু-চারটে খুপরি মতন ঘর পেরিয়ে একেবারে শেষের একটা ঘরের কাছে এসে দাঁড়ায় অনিল। ঘরের দরজা বন্ধ। তালা ঝুলছিল।
অনিল তালা খুলতে লাগল।
তারাপদ বলল, “কী হয়েছে? হল্লা শুনছিলাম।”
“স্টোভের আগুন ধরে গিয়েছিল। নিভে গিয়েছে। কিছু হয়নি।”
ঘরের দরজা খুলে বাতি জ্বালল অনিল।
ঘরটা খুবই ছোট। চিলে কুঠরি বললেও বলা যায়। একটি মাত্র ছোট জানলা। ঘরের মধ্যে একটা ক্যাম্প খাট। বিছানা পাতা রয়েছে। এলোমেলো। ঘরের একপাশে দড়ি ঝুলছে। দড়ির ওপর অনিলের জামাপ্যান্ট ঝোলানো। একটা তোয়ালেও। ঘরের এককোণে বড় কিট ব্যাগ, সুটকেস একটা। আশেপাশে সিগারেটের দোমড়ানো প্যাকেট, টুকরো-টাকরা সিগারেট ছড়ানো। এক প্যাকেট তাস পড়ে রয়েছে বিছানার ওপর প্যাকিং বাক্সর মতন একটা কাগজের বড় বাক্স। তার ওপর দু পাঁচটা খুচরো জিনিস রেখেছে অনিল। ব্রাশ, টুথপেস্ট, আয়না। পুরনো খবরের কাগজ দিন কয়েকের।
কিকিরা বললেন, “হাতে সময় ছিল; চলে এলাম। … কেমন আছ? নতুন কোনো ঝঞ্জাট হয়নি তো?”
মাথা নাড়ল অনিল। “না।”
“কাউকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছ?”
“আমি বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই থাকি।”
“তোমার কাছে কেউ এসেছিল?”
“না। দিদি এসেছিল পরশু। আর কেউ নয়।”
তারাপদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরটা দেখছিল। কিকিরা তাকে বলে দিয়েছেন। বলেছেন, তিনি অনিলের সঙ্গে কথা বলবেন যতক্ষণ পারেন, সেই সময় তারাপদর কাজ হবে সমস্ত কিছু খুঁটিয়ে দেখা।
কিকিরা ক্যাম্প খাটের ওপরই বসলেন। বসে তাসের প্যাকেটটা উঠিয়ে নিলেন। “তাস খেল নাকি?”
“হ্যাঁ।”
“একা-একা।”
“পেশেন্স খেলি। কী করব সারাদিন–”।
“তা ঠিক।” তাসগুলো একপাশে রেখে দিলেন কিকিরা। তারপর কী যেন ভাবতে-ভাবতে বললেন, “আচ্ছা, ধরো তুমি সার্কাসে ফিরে গেলে!”
অনিল সঙ্গে-সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না। কী বলছেন আপনি?”
“ফিরে গেলে তোমার কোন ক্ষতি হবে?”
অনিল চুপ করে থাকল। মাথা নাড়তে লাগল।
কিকিরা অনিলকে লক্ষ করছিলেন। বললেন, “আজ ও-বেলায় আমি সার্কাসে গিয়েছিলাম তারাপদকে সঙ্গে নিয়ে। মল্লিকবাবুর সঙ্গে কথাও হল। আমি তোমার কথা কিছু বলিনি বটে, তবে তোমায় নিয়ে কথা উঠেছিল। ভদ্রলোক তোমাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন মনে হল। তুমি এভাবে পালিয়ে আসায় ভীষণ চটে রয়েছেন।” বলে একটু থেমে অনিলকে বোঝাবার মতন করে বললেন, “আমার কিন্তু মনে হয় তুমি যদি ফিরে যাও তিনি খুশি হবেন। হয়ত গোড়ায় খানিকটা চেঁচামেচি করবেন, তারপর ঠাণ্ডা হয়ে যাবেন।”
অনিল চুপ করে থেকে কী যেন ভাবল। বলল, “আমি যেতে পারি না।”
“কেন পারো না, আমি বুঝতে পারছি না অনিল। তুমি নিশ্চয় জানোসার্কাসের লোক তোমার দিদির ঠিকানায় তোমার খোঁজ করতে গিয়েছিল?”
“জানি। দিদি বলেছে।”
“ওরা থানায় গিয়েছিল তা জানো?”
“আন্দাজ করছিলাম।”
“কৃষ্ণমূর্তির ভয়ে তুমি তোমার পেশা ছেড়ে দেবে। কী করবেন কৃষ্ণমূর্তি তোমার?”
বলব কি বলব না করে শেষে অনিল বলল, “আমায় খুন করতে পারেন। “
“কেন? তোমার কী এমন দোষ, কোন্ ক্ষতি তুমি তার করেছ যে তোমায় তিনি খুন করতে যাবেন। খুন করা কি চাট্টিখানি কথা! চাইলেই করা যায়।”
অনিল কোনো জবাব দিল না। কিকিরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বললেন, “তুমি বলেছিলে কৃষ্ণমূর্তি মল্লিকবাবুর পার্টনার। আমরা খোঁজ করে জানলাম, কথাটা ঠিক নয়। মল্লিকবাবুর পার্টনার অন্য লোক। নাম ধনিলাল বা ধনিয়ালাল।”
অনিল বলল, “আমি শুনেছি, কৃষ্ণমূর্তিও পার্টনার। বাইরে কাউকে বলেন না।”
“ও!…একটু জল খাওয়াতে পারো?”
“জল!..দাঁড়ান এনে দিচ্ছি।”
ঘরে একটা জলের বোতল ছিল প্লাস্টিকের। বোতলে জল ছিল না। অনিল বোতলটা নিয়ে বাইরে চলে গেল।
