“আপনি আমাদের হয়ে যদি একটু দেখেন…।” কিকিরা বললেন।
কৃষ্ণমূর্তি মাথা নাড়লেন সামান্য।
আরও দু-একটা কথা বলার পর কিকিরা বলল, “সাহেব, আপনি এমন ভাল বাংলা বলেন কেমন করে? বাংলাদেশে ছিলেন?”
কৃষ্ণমূর্তি হাসলেন। বললেন, “আমি কলকাতায় পঁচিশ বছর ছিলাম। আমার মা বাঙালি। বাবা সাউথ ইন্ডিয়ান। বাবা ব্রিটিশ আমলে রয়েল নেভিতে ছিলেন। মা এখানে একটা মিশনারি স্কুলে লোয়ার ক্লাসে পড়াতেন।”
কিকিরা অবাক হলেন। তারাপদও।
কৃষ্ণমূর্তি নিজেই বললেন, “বাবু, আমি এখানে লেখাপড়া শিখেছি। ফুটবলার ছিলাম। …আমার বহুত ফ্রেন্ডস আছে এই শহরে।”
কিকিরার মনে পড়ল, অনিলের কথা। অনিল ঠিকই বলেছিল, কৃষ্ণমূর্তির অনেক বন্ধু আছে কলকাতা শহরে।
কিকিরা ঠিক বুঝতে পারলেন না, আর কীভাবে কথা চালানো যায়। আপাতত আজকের মতন এখানেই শেষ করা ভাল।
হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠে কিকিরা বললেন, “আরে, দশটা বেজে গিয়েছে। চলো তারাপদ।” বলে কৃষ্ণমূর্তির দিকে তাকালেন। “আজ চলি মূর্তিসাহেব। আমাদের কথা একটু মনে রাখবেন স্যার। কাল-পরশু আমরা আসছি আবার।”
কিকিরা আর দাঁড়ালেন না।
সার্কাসের বাইরে আসতে-আসতে হঠাৎ যেন কী মনে পড়ে গেল। পকেটে হাত দিয়ে সিগারেটের একটা টাটকা প্যাকেট বের করলেন। বড় প্যাকেট, কুড়িটা সিগারেটের। প্যাকেটটা হরিশবাবুর দিকে এগিয়ে দিলেন। “এটা আপনার জন্যে এনেছিলাম। ভুলেই যাচ্ছিলাম। নিন…।”
হরিশবাবু ইতস্তত করলেন।
“আরে নিন মশাই, আপনি না থাকলে মালিকের সঙ্গে দেখা করা কঠিন হয়ে পড়ত। নিন।“
প্যাকেটটা নিলেন হরিশবাবু। সার্কাসে তিনি পুরনো লোক। কিন্তু যখন থেকে তাঁর অঙ্গ গিয়েছে তখন থেকেই তিনি খেলোয়াড়ের মর্যাদা হারিয়েছেন। মাইনেপত্রও কম পান। দয়া করে যে তাঁকে রেখে দিয়েছে মালিক–এই না যথেষ্ট। খুবই দুঃখ হয় হরিশের। মনমরা হয়ে থাকেন। কালনার দিকে বাড়ি। বাড়িতে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে আছে। বেঁচেবর্তে আছে কোনো রকমে। মাসকাবারি ক’টা টাকা পাঠানো ছাড়া হরিশ আর কিছু করতে পারেন না সংসারের। নিজের জন্যও পারেন না। বিড়ি টানাই তাঁর অভ্যাস। সিগারেট খাবার পয়সা কোথায়! কেউ দিলে অবশ্য হাত পেতে নেন।
তাঁবুর বাইরে আসতে-আসতে কিকিরা হরিশবাবুকে বললেন, “কৃষ্ণমূর্তিসাহেব আপনাদের সার্কাসের বড় অ্যাট্রাকশান। তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“ভদ্রলোকের অনেক ক্ষমতা এই সার্কাসে?”
“ক্ষমতা আছে। মল্লিকবাবুর সঙ্গে ভাল সম্পর্ক।”
“উনি কি পার্টনার?”
“না। কে বলল?”
“এমনি জিজ্ঞেস করলাম।”
“মল্লিকবাবু একাই মালিক। তবে শুনেছি মালিকের এক বন্ধু আছেন। ধনিলাল। তাঁর টাকাও আছে সার্কাসে।”
“আচ্ছা! ধনিলাল কোথায় থাকেন?”
“পূর্ণিয়ায়।”
“সার্কাসে আসেন না?”
“দু-একবার আসতে দেখেছি।”
কিকিরা তারাপদকে ডাকলেন। রাস্তার কাছাকাছি এসে গেছেন। হঠাৎ বললেন, “হরিশবাবু, মূর্তিসাহেবকে তো ধরে এলাম। জানি না, উনি কী পরামর্শ দেবেন মল্লিকবাবুকে। …তা মূর্তিসাহেব মানুষটি কেমন?”
হরিশ যেন সামান্য অবাক হলেন। বললেন, “খারাপ কেন হবে। ভাল লোক। তবে কিনা একটু মাথা গরম। বড় কড়া কড়া কথা বলেন। আবার সার্কাসের কারও কিছু হলে দেখেনও। খারাপ লোক নন কৃষ্ণমূর্তি।”
কিকিরা তারাপদকে ইশারায় কিছু যেন বোঝাবার চেষ্টা করলেন।
“চলি হরিশবাবু। আবার আসব।”
.
রাস্তায় এসে কিকিরা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। তারপর বললেন, “তারাপদ, কৃষ্ণমূর্তিকে কেমন দেখলে?”
তারাপদ কী বলবে! বলল, “কিছু বুঝতে পারলাম না। এমনিতে তো ভালই লাগল।”
কিকিরা বললেন, “আমারও খারাপ লাগেনি।” বলে এদিক-ওদিক তাকালেন। “একটা ট্যাক্সি ধরো তো!”
ট্যাক্স পাওয়া গেল।
গাড়িতে উঠে কিকিরা বললেন, “তারাপদ, আমি একেবারে ধাঁধায় পড়ে গিয়েছি।”
ট্যাক্সি চলতে শুরু করেছিল।
তারাপদ বলল, “কেন?”
“না, না। ব্যাপারটা কেমন লাগছে হে! অনিল যা বলেছে তার সঙ্গে দেখছি সব মিলছে না। অনিল কী মিথ্যে কথা বলছে?”
“কেন? মিথ্যে বলবে কেন?”
“সেটাই তো ধরতে পারছি না।”
.
০৬.
বাড়িটা যে কত পুরনো বোঝা মুশকিল। গলির মধ্যে আলোও জোরালো নয়। আসলে এটা গলির গলি। তবে কানাগলি বা বাই লেন নয়। সন্ধের মুখে লোকজনও অত নেই।
কিকিরা তারাপদকে ইশারায় মুখের একটা দোকান দেখালেন। দোকানটা অবশ্য বন্ধ। আজ রবিবার। দোকানের মাথায় হাত দুয়েকের এক সাইনবোর্ড। একেবারে আনাড়ি লোককে দিয়ে লেখানো সাইনবোর্ড। কাঁচা লেখা। বিটি অটো ইলেকট্রিক হয়ত নাম ছিল। সাইনবোর্ডের অর্ধেকটাই মোছা।
তারাপদ বুঝতে পারল কিকিরা কী বোঝাতে চাইছেন। অনিল সেদিন এই দোকানটার কথা বলেছিল। এখানেই সে ষণ্ডামার্কা একটা লোককে দেখে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরোতে পারছিল না।
কিকিরা গলি এবং পাড়াটা ভাল করে দেখতে লাগলেন। কলকাতা শহরের এইসব এলাকায় এমন গলি আছে যা দেখে বেশ বোঝা যায়, পাঁচমেশালি লোকের বসবাস এখানে। বাঙালি পাড়া বলতে যা বোঝায় তা নয় মোটেই, তবে বাঙালিও আছে। বেশির ভাগই অবাঙালি। হিন্দুস্থানী, দু-পাঁচটা বোধ হয় কেরলের লোক, মামুলি কিছু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, এমনকী নেপালিও চোখে পড়ে।
পাড়াটার চেহারা দেখে বোঝা যাগ–বেশ পুরনো। ঘরবাড়িগুলোও সে-আমলের। বেশির ভাগ বাড়িই ইট-বেরোনো, জানলার পাল্লা নড়বড়ে, রংচং নেই। এরই মধ্যে আবার এক জায়গায় বস্তি ধরনের দু-তিনটে ঘর পাশাপাশি।
