“তা ঠিক। ঠিকই বলেন আপনি।”
কথা বলতে বলতে কিকিরা হঠাৎ মাটিতে নুয়ে পড়ে মাঠ থেকে কী যেন কুড়িয়ে নিলেন। “আপনার গলার চেইন।”
আদিনাথ অন্যমনস্কভাবে একবার গলায় হাত দিলেন। আমি চেইন পরি না।”
চেইনটা সোনার বলেই মনে হয়। চকচক করছে। সোনালি রং।
“তা হলে কার! আমি ভাবলাম আপনার…!”
“আমার নয়।”
“হরিশবাবু, আপনি তবে এটা রেখে দিন। খোঁজ করে দেখবেন কার চেইন হারিয়েছে। তাকে দিয়ে দেবেন।”
হরিশবাবু হাত বাড়ালেন। কিকিরা তাঁর হাতের মুঠোয় চেইনটা দিলেন যেন। তারপর আচমকা হাসতে লাগলেন।
হরিশবাবুর হাতে চেইন নেই, কিকিরার হাতেও নয়, মাটিতে পড়ে যায়নি। একেবারে হাওয়া যেন।
আদিনাথ বুঝতে পেরেছিলেন। অবাক হয়ে বললেন, “সে কী! আপনি এ-সব শিখলেন কোত্থেকে?”
কিকিরা হাসতে-হাসতে বললেন, “কম বয়েসে শখ হয়েছিল। শিখেছিলাম একজনের কাছে। শখ মিটে গেল। …তা শখ মিটলেও আমি মশাই ম্যাজিকের ভক্ত। এই যে তারাপদ–আমার মালিক–এরাও জানে।”
আদিনাথ বললেন, “পাকা হাত আপনার।” কিকিরা হাসতে হাসতে বললেন, “আরে না, এ তো ছেলেমানুষি খেলা। বাচ্চারাও জানে। …দু-একটা ভাল খেলা শিখেছিলাম একসময় অভ্যেস নেই, ভুলে গিয়েছি। যদি আপনি অভ্যেস করতে চান, শিখিয়ে দিতে পারি।” বলে তারাপদকে ইশারায় এগোতে বললেন, “চলি স্যার, আবার দেখা হবে।”
ডান দিক দিয়ে ঘুরে খানিকটা এগোতেই একটা তাঁবুর পাশে কৃষ্ণমূর্তিকে দেখা গেল। কৃষ্ণমূর্তির পাশে একজন মিস্ত্রি মতন লোক। দু-পাঁচটা যন্ত্রপাতি পড়ে আছে পাশে। কৃষ্ণমূর্তি তাঁর খেলা-দেখানো মোটর বাইকের কাজকর্ম দেখছিলেন।
তারাপদকে চোখের ইশারায় আসতে বলে কিকিরা কৃষ্ণমূর্তির দিকে এগিয়ে চললেন।
হরিশবাবু বললেন, “যাবেন ওদিকে?”
“চলুন। একটু আলাপ সেরে যাই।”
তারাপদ সার্কাস দেখতে এসে কৃষ্ণমূর্তিকে দেখেছে। কিন্তু তখন যেন মানুষটাকে দেখা যেত না, যেত সাজপোশাক, হেলমেট, ব্রিচেস-এর মতন জুতো। এখন কৃষ্ণমূর্তিকে স্বাভাবিক চেহারায় দেখা যাচ্ছিল।
মাথায় মাঝারি। গায়ের রং কালো। চৌকো ধাঁচের মুখ। মোটা নাক। থুতনির তলায় ফ্রেঞ্চকাট ধরনের দাড়ি। চোখ বড়বড়। চেহারাটা দেখলেই বোঝা যায়-গড়াপেটা স্বাস্থ্য। মাদ্রাজি লুঙ্গি আর লাল রঙের সোয়েটার পরে নিজের মোটর বাইরে কাজ দেখাশোনা কছিলেন কৃষ্ণমূর্তি। ভদ্রলোকের বয়েস বোধ হয় বছর চল্লিশ। দু-এক বছর বেশি হতেও পারে।
কিকিরা তারাপদদের নিয়ে কাছে আসতেই কৃষ্ণমূর্তি মুখ তুলে তাঁদের দেখলেন।
হরিশবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন কিকিরাদের।
কিকিরা কিছু বলার আগেই কৃষ্ণমূর্তি হাত বাড়িয়ে দিলেন।
হাত-মেলানো হয়ে গেলে কিকিরা বললেন, “আপনার খেলা আমি আর আমার মালিকরা দেখেছেন, মূর্তিসাহেব। বহুত আচ্ছা! স্পেলেডি, ওয়ান্ডারফুল। “
কৃষ্ণমূর্তি হাসলেন। নিতান্ত ভদ্রতার হাসি।
কিকিরা বললেন, “আমি রয়েল সার্কাসে অনেকদিন আগে এরকম খেলা দেখেছিলাম। ভাল জমাতে পারেনি। আপনি সাহেব আমাদের চার্মিনার করেছেন।”
তারাপদ খেয়াল করেনি প্রথমে। পরে কানে লাগল। চার্মিনার! সে আবার কী! কিকিরার ইংরিজির সঙ্গে তারাপদর কম পরিচয় নয়। কিন্তু চার্মিনার। কিকিরা কি বেমালুম ভুল বলে গেলেন। চামড় বলতে চার্মিনার। অবাক কাণ্ড!
কৃষ্ণমূর্তি নিজেও অবাক!
কিকিরা কিন্তু হাসছেন। হাসতে-হাসতে বললেন, “সাহেব, আমাদের পাড়ার ছেলে-ছোকরাদের মুখে আজকাল এইরকম শুনি।ফ্যান্টা, ফ্যান্টাকোলা, চার্মিনার, লা পাত্তা…। মাফ করবেন।”
কৃষ্ণমূর্তি এবার হেসে ফেললেন।
কিকিরা বললেন, “এই সার্কাসের আপনি এক নম্বর। সিনেমার হল হিরো। সার্কাসের হল বেস্ট প্লেয়ার। সেদিন আপনার খেলা দেখে যখন বাইরে গেলাম–পাবলিক আপনার খেলার কথা বলছিল। তাই না তারাপদ?”
তারাপদ অনেক কিছুই এখন রপ্ত করে ফেলেছে কিকিরার। মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
কৃষ্ণমূর্তি খুশি হলেন। বললেন, “রিস্কি খেলা।”
আরও দু-চারটে খোশামাদের কথা বলে কিকিরা বললেন, “আমাদের কথা আপনি হরিশবাবুর মুখে শুনলেন। …সাহেব, এবারের সিজনটা আমাদের ভাল যাচ্ছে না। আপনাদের সার্কাসটা নিয়ে সামথিং করতে চাই। মল্লিকসাহেবের সঙ্গে কথা বলছি। আপনি কী মনে করেন?”
“গুড প্রোপোজাল। মালিক কী বলল?”
“ফাইনাল কথা দেননি। ভাবছেন। ..আপনার সঙ্গে হয়ত কথা বলবেন।”
কৃষ্ণমূর্তির হাতে সিগারেটের প্যাকেট ছিল। লাইটার। চার্মিনারের প্যাকেট। সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিতে দিতে কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “আমি মালিক নয়, বাবু!”
কিকিরা সিগারেট নিলেন। তারাপদরাও নিল। সিগারেট ধরাতে লাগল ওরা।
কৃষ্ণমূর্তি মোটর বাইকের মেকানিককে কী যেন বললেন। তারপর দু-চার পা সরে এসে দাঁড়ালেন।
কিকিরা বললেন, “আপনি বললে মালিক না বলবে না, সাহেব। আমি সব খবর রাখি। আপনি এই সার্কাসের গোড়ার লোক। সিনিয়ারমোস্ট…।”
কৃষ্ণমূর্তি হরিশবাবুর দিকে তাকালেন। মানে বোঝাতে চাইলেন, হরিশবাবু তুমিই এসব কথা বলেছ?
হরিশ সিগারেট টানতে লাগলেন।
কৃষ্ণমূর্তি বললেন, “আমি পুরানা লোক বাবু। সার্কাস শুরু হওয়ার সময় থেকেই আছি। মালিককে হেল্প করেছি। হরিবাবু জানেন। মালিক মরজি করেন তো সব হয়ে যাবে।”
কৃষ্ণমূর্তির বাংলায় দোষ বিশেষ নেই। উচ্চারণগুলোও মোটামুটি ভাল। মনে হয় না লোকটা দক্ষিণের।
