“না-না; বাহারে কী বলব, রায়বাবু! উ বাত ঠিক নয়। অলিভার ভেগে পড়েছে।”
“ভেগে পড়েছে। কেন?”
“কেন? মালুম নেই। গাধা আছে, ইডিয়ট। বদমাশ।”
“আশ্চর্য! খেলা দেখাচ্ছিল, পালিয়ে গেল! আপনারা থানায় জানিয়েছেন?”
“জানিয়েছি। সার্কাস বহুত ঝামেলার কাম কাজ রায়বাবু। না জানালে আমাদের দোষ চাপত।”
“কোথাকার লোক ও?”
“এই কলকাত্তার। ওর অ্যাড্রেসে লোক পাঠিয়েছি। নো ট্রেস।”
কিকিরা বললেন, “কোনও অ্যাকসিডেন্ট?”
“না। হাসপাতালের রেকর্ড নেই।”
“তাজ্জব ব্যাপার।”
মল্লিকবাবু দুঃখ করে বললেন, ছোকরাকে তিনিই ধরে এনেছিলেন সার্কাসে। “নতুন খেলোয়াড়। বহুত রিস্ক ছিল। ছোকরা দু’ বছর আছে সার্কাসে। ভাল খেলা শিখেছিল। আমার সঙ্গে ট্রেজারি করল রায়বাবু। ফের যদি কোনোদিন ফিরে আসে, আমি ওকে দেখে নেব।”
কিকিরা আর কথা বাড়লেন না। বুঝতে পারলেন, অনিলের ওপর ভদ্রলোকের আস্থা ছিল, স্নেহও ছিল।
উঠে পড়লেন কিকিরা। বললেন, এখন উনি যাচ্ছেন, কাল-পরশু আবার আসবেন কথা বলতে।
তারাপদ আর হরিশবাবুকে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। সার্কাসের ছোট-ছোট তাঁবু এ-পাশে ও-পাশে। সার্কাসের মেয়েরা যে যার মতন কাজ করছে নিজেদের। বোয়াধুয়ি, কাঁচাকাচির কাজ। ধোপারা যেভাবে কাপড় শুকোয়, দড়ি টাঙিয়ে সেভাবে কিছু শাড়ি-জামা-সালোয়ার শুকোচ্ছে রোদে। কেউ বা গল্পগুজব করছে। দু-তিনজন জমাদার গোছের লোক বড়বড় ঝাঁটা নিয়ে আশপাশ সাফসুফ করছে। ও-পাশে, তফাতে কয়েকটা বাঘ-সিংহর খাঁচা, পশুগুলোকে দেখা যায় না, ঘুমিয়ে আছে বা শুয়ে-শুয়ে হাই তুলছে হয়ত। পুরুষদের তাঁবুগুলোতেও হইহল্লা নেই। যে যার মতন ঘোরাফেরা, গল্পগুজব করছে। দুটো ছোকরা নিজেদের মধ্যে বক্সিং প্র্যাকটিস করছিল মজা করে। একদিকে জনা কয়েক তাস নিয়ে বসে পড়েছে।
কিকিরা দেখছিলেন সবই, কিন্তু কাকে যেন খুঁজছিলেন।
হঠাৎ আদিনাথকে দেখতে পেয়ে গেলেন। আদিনাথের পরনে লুঙ্গি, গায়ে গরম চাদর, এক হাতে একটা কলাই করা মগ। চা খাচ্ছিলেন।
কিকিরা বললেন, “হরিশবাবু, চলুন আপনাদের ম্যাজিকবাবুর সঙ্গে আলাপ করে যাই। সেদিন ওঁর খেলা দেখলাম খানিকটা বেশ লাগল। তারাপদ, তোমার কেমন লেগেছে?”
“ভাল।”
“মফস্বলের লোক ম্যাজিক দেখতে পেলে বর্তে যায়। কেন জানেন, হরিশবাবু? কলকাতা শহরে বছরে দু-তিনবার করে বড় বড় ম্যাজিশিয়ানের খেলা দেখানোর প্রোগ্রাম থাকে। মশাই কী বলব, টিকিট নিয়ে মারামারি লেগে যায়। মফস্বলে এসব কোথায়…তারাপদ, তোমার মনে আছে, আমরা একবার সেই চিনে ম্যাজিশিয়ান ফুং লুং-কে জোর করে বর্ধমানে টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম, ও তো যাবেই না, বলে–আমি হংকং উইজার্ড-আমাকে তোমরা ছোট টাউনে নিয়ে যেতে চাইছ? আমার মর্যাদা থাকে না। …তা বুঝলেন হরিশবাবু, চিনে-সাহেবকে অনেক বুঝিয়ে বর্ধমানে নিয়ে গেলাম। কী বলব মশাই, তিন দিনে আমরাই এজেন্সি কমিশন হিসেবে হাজার পঁচিশ টাকা পকেটে ভরেছিলাম। ফুং লুং তারপর ঢাকায় চলে গেল। সেখানে খেলা দেখিয়ে হংকং ফিরে যাবে।”
তারাপদ জীবনে কোনোদিন ফুং লুং-এর নাম শোনেনি। বর্ধমানে যাওয়া তো দূরের কথা। কিকিরা যা পারছেন বলে যাচ্ছেন। মুখে কিছুই আটকাচ্ছে না। হঠাৎ তারাপদর মাথায় এল, কিকিরাকে একটু জব্দ করা যাক। মজা করেই। গম্ভীরভাবে তারাপদ বলল, “আপনি ফুং লুং বলছেন কেন! ওর নাম ছিল, চুং কিং চ্যান। আর আমরা ঠিক পঁচিশ হাজার পাইনি। হাজার কুড়ি হতে পারে।”
কিকিরা একটু হেসে তারাপদর দিকে তাকালেন। “চুং টুং ওর আসল নাম, বাজারে নাম হল ফুং লুং; ম্যাজিশিয়ানদের একটা করে মার্কেট-নেম থাকে। ফুং লুং নামেই লোকে তাকে জানে। আর কুড়ি-পঁচিশ হাজারের হিসেবটা তুমি ভুল করলে। আমরা হাজার পাঁচেক টাকা এক্সট্রা পাবলিসিটিতে আগেই খরচ করে ফেলেছিলাম–সেটা দিতে হল।”
তারাপদ জব্দ হয়ে হেসে ফেলতে যাচ্ছিল, কোনোরকমে সামলে নিল নিজেকে। কিকিরাকে কথায় জব্দ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
ততক্ষণে তারাপদরা আদিনাথের কাছে পৌঁছে গিয়েছে।
হরিশবাবু আলাপ করিয়ে দিলেন।
কিকিরা জোড় হাতে প্রায় স্তুতি করার মতন আদিনাথ ম্যাজিশিয়ানের প্রশংসা করে বললেন, “আপনি মশাই উঁচু দরের ম্যাজিশিয়ান। সার্কাসে বড় একটা ফার্স্ট রেট ম্যাজিশিয়ান পাওয়া যায় না। কাজচলা গোছের লোক দিয়ে ওরা চালিয়ে দেয়। আপনি সে-জাতের নন। ব্যাপারটা কী জানেন, একটা লোক কনসার্টে বেহালা বাজায়, আর একটা লোক একা গানের মজুলিশে বেহালা বাজায়। দুটোয় অনেক তফাত। প্রথমটা হল, গোলে হরিবোল। বুঝলেন না! দ্বিতীয়টা একেবারে নিজের। তা আপনাকে দেখে জাত চেনা যায়।”
আদিনাথ খুবই খুশি। এভাবে কেউ কথা বলে না। “আপনার ভাল লেগেছে।”
“ভাল কি মশাই, চমৎকার। এই তারাপদও বলছিলকী বলছিলে যেন তুমি তারাপদ?”
হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে তারাপদ বলল, “প্রায় হুং লুং-এর ক্লাস।”
“তা ঠিকই। বড় বড় ম্যাজিশিয়ানের বড় বড় লেজ। পাবলিসিটি। ছোটদের তো তা নয়। গেঁয়ো যোগীর অবস্থা…”
হরিশবাবু বললেন, “আদিনাথ মাঝে-মাঝে বলে সার্কাস ছেড়ে চলে যাবে। আমি তাকে আটকে রাখি। বলি, যাবে কোথায়? এখানে তবু ধরাবাঁধা মাইনে আছে। তোমার পরিশ্রমও কম। বাইরে গিয়ে এক-একা কতটা পারবে।”
