কিকিরা আর তারাপদ যখন মল্লিকবাবুর তাঁবুতে এলেন, ভদ্রলোক কিসের হিসেব নিয়ে চেঁচামেচি করছিলেন। ওঁর পরনে ঢোলা পাজামা, গায়ে গরম শার্ট। শার্টের হাত গুটিয়ে নিয়েছেন।
কিকিরাদের দেখে মল্লিকবাবু চেঁচামেচি থামিয়ে সামনের লোকটিকে চলে যেতে বললেন।
কিকিরাদের সঙ্গে হরিশবাবুও ছিলেন।
মল্লিকবাবু খাতির করেই ডাকলেন কিকিরাদের। “আসুন!” বলে সামনের দুটো চেয়ার দেখালেন। একটা কাঠের, অন্যটা ফোল্ডিং। হরিশবাবুকে বললেন, “হরিশ, দো কুরশি আনাও।” মল্লিকবাবু এইভাবেই কথা বলেন, বাংলার সঙ্গে হিন্দি-উর্দু মেশানো থাকে। সার্কাসে নানান জায়গার লোক। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা, মেলামেশা করতে করতে শব্দগুলো নিজের থেকেই মুখে এসে গেছে। তা ছাড়া মল্লিকবাবু নিজে পূর্ণিয়ায় মানুষ হয়েছেন।
হরিশবাবু গেলেন চেয়ারের কথা বলতে।
কিকিরা কাঠের চেয়ারটায় বসতে গিয়ে সামলে নিলেন। তারাপদকে বললেন বসতে। হাজার হোক তারাপদ হল কোম্পানির মালিক, কিকিরা তো কর্মচারী। যদিও কোম্পানির ব্যাপারে তিনি ওদের অভিভাবক। তুমি-টুমি করেই কথা বলেন।
তারাপদ বসল না। লজ্জা করছিল।
মল্লিকবাবু বললেন, “বসুন। …লোকগুলো আমার দেমাক খারাপ করে দেয়। চোর-চোট্টার দল। “
কিকিরা হেসে বললেন, “হিসেব নিচ্ছিলেন। ম্যানেজার কোথায়?”
“ম্যানিজার বোখার করে পড়ে আছে। …ঝামেলা আমার।”
“তা তো বটেই। আপনি আর কতদিক সামলাবেন!”
“রায়বাবু, সার্কাসের মালিক হল গাধা…।” কানাইবাবু গাধা বলেন না, বলেন গাধা। দ’-এর ওপর ঝোঁক থাকে বেশি। গাধা বলাটাও তাঁর মুদ্রাদোষ।
কিকিরা হাসলেন। “কী বলেন?”
“সাচ বলি। সার্কাসের যেতনা ঝামেলা সব মালিকের ঘাড়ে।”
হরিশবাবু ফিরে এলেন। একটা ছোকরা গোটা দুয়েক ফোল্ডিং চেয়ার এনে রাখল। কানাই চা আনার হুকুম করলেন। রায়বাবুরা আগের দিন কফি না খেয়ে চা খেয়েছিলেন। মনে আছে তাঁর।
তারাপদরা বসল। বাইরে শেষ শীতের রোদ। ভেতরেও সামান্য রোদ এসেছে তাঁবুর দরজা দিয়ে।
দু-পাঁচটা সাদামাঠা কথার পর কিকিরা বললেন, “আপনার সঙ্গে এবার ব্যবসার কথা বলি মল্লিকবাবু। আমাদের কোম্পানি–তার আগে বলি আমার মালিকের একজন এসেছে…” বলে তারাপদকে দেখালেন। “অন্যজন আসতে পারেনি। কাজে আটকে গিয়েছে। তাতে কোনও ক্ষতি নেই। আমরাই কথা বলব।”
“বলুন।”
“আমরা চারটে জায়গা সিলেক্ট করেছি।” বলে তারাপদকে বললেন, “কাগজটা দেখাও।”
আগে থেকেই সব তৈরি ছিল। তারাপদ পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে কিকিরাকে এগিয়ে দিল।
“নিন দেখুন…” কিকিরা আবার কাগজটা মল্লিকবাবুকে দিলেন।
কানাইবাবু কাগজ দেখতে-দেখতে বললেন, “টিটাগড়, ব্যারাকপুর, চন্দননগর, তমলুক…”
কিকিরা বললেন, “এই জায়গাগুলোয় আমাদের লোকজন আছে। এখানে কাজ করেছি। আপনি দেখুন।”
কানাইবাবু পান চিবোতে চিবোতে হরিশবাবুর দিকে তাকালেন। বললেন, “টিটাগড় আচ্ছা?”
হরিশ বললেন, “মিল এরিয়া। লোক পাওয়া যাবে।”
কিকিরা বললেন, “বিজনেস ভাল হবে।”
পান চিবোতে চিবোতে গাল-গলা চুলকোতে-চুলকোতে কানাইবাবু কী যেন ভাবলেন। বললেন, “টিটাগড় ঠিক আছে। ব্যারাকপুর.” বলে মাথা নাড়তে লাগলেন। মানে ব্যারাকপুর তাঁর পছন্দ নয়। কেন নয়, তাও বললেন, গত বছরের আগের বছর গিয়েছিলেন সেখানে।
কিকিরা বললেন, “চন্দননগর?”
“হরিশবাবু?” মানে হরিশের মতামত জানতে চাইলেন মালিক।
হরিশ বললেন, “বড় জায়গা। মাঠ পাওয়া যাবে।”
“লাভ হবে।”
“হওয়ার কথা।”
কানাই মল্লিক পরের নামটা দেখতে-দেখতে বললেন, “তমলুক!”
কিকিরা তমলুক শহরের গুণগান শুরু করলেন।
তারাপদ অবাক হয়ে কিকিরার কথা শুনছিল। এমন করে কথা বলছিলেন তিনি, যেন কিকিরা তমলুক শহরের লোক।
মল্লিকবাবুর ঠিক পছন্দ হল না তমলুক। না হওয়ার কারণও বললেন। এখন শীত শেষ হয়ে এল। এখানকার পাট চুকিয়ে টিটাগড়ে গিয়ে সার্কাস নামাতে ক’দিন সময় যাবে। টিটাগড় থেকে চন্দননগর। কম করেও তিনটে হপ্তার মতন বসতে না পারলে সার্কাস পার্টির লোকসান হয়। সময় কোথায় তা হলে! আর গরম পড়ে গেলে সার্কাস চলে না। গরম ছাড়াও ঝড় বৃষ্টির ভয় আছে গরম থেকে তাই সার্কাস বন্ধ। তবে হাতে সময় থাকলে চন্দননগর থেকে কাছাকাছি কোনও জায়গায় যাওয়া যেতে পারে।
কিকিরা মেনে নিলেন কথাটা। অন্য কিছু ব্যবসার কথা হল। কিকিরা যদিও ইমপ্রেসারিও ব্যবসার কিছুই জানেন না, তবু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কথা বলে সামলে নিলেন তখনকার মতন।
ততক্ষণে চা খাওয়া হয়ে গিয়েছে।
কিকিরা এবার অন্য কথা পাড়লেন। বললেন, “আমাদের তো জোর পাবলিসিটি করতে হবে, কাগজে বিজ্ঞাপনও দেব। আপনার সার্কাসের নতুননতুন খেলার কথা বললে লোক টানবে। লোকে নতুন চায় মল্লিকবাবু!”
মল্লিকবাবু কয়েকটা খেলার কথা বললেন।
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “আপনাদের হ্যান্ডবিলে, বাইরে ছবিতে একটা খেলার নাম দেখেছি। মোটর সাইকেল জাম্প। ওটা কি বন্ধ করে দিলেন! সেদিন তো শুনছিলাম-খেলোয়াড়ের অসুখ বলে।”
মল্লিকবাবু হঠাৎ বেজায় বিরক্ত হয়ে বললেন, “আরে, ওই গাধা আমায় একদম বুদু বানিয়ে দিল। এখানে চার-ছ’দিন শো করল, তারপর পালিয়ে গেল। কাউকে কুছ বলল না রায়বাবু, রাস্কেল ভেগে গেল।”
কিকিরা ভীষণ অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, “পালিয়ে গেল! হরিশবাবু বলছিলেন, শরীর খারাপ…। আপনিও..”।
