কিকিরা চুরুটটা ধরিয়ে নিলেন আবার। চোখ বুজে চুরুট টানতে টানতে হঠাৎ বললেন, “তুমি না বলেছিলে কৃষ্ণমূর্তি তোমাকে তাঁর নিজের খেলা শেখাবার চেষ্টা করেছিলেন।”
অনিল মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। খেলা শেখানোর নাম করে তিনি আমাকে জখম করতে চেয়েছিলেন। বার কয়েক দেখার পর আমি আর খেলাটা শিখতে রাজি হইনি।”
“এ ছাড়া আর কোনোভাবে..”
“হ্যাঁ। আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, গাড়ি নিয়ে যারা খেলা দেখায় তারা যেন যার গাড়ির ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে হয়। নিজেরাই দেখভাল করে গাড়ির। নয়ত বিপদ হতে পারে। নিজের খেলা দেখাবার গাড়ি হবে নিজের পোষা কুকুরের মতন। কুকুর তবু পশু। গাড়ি যন্ত্র। কোথাও একটু গড়বড় থাকলেই খেলোয়াড় শেষ। ভুল আমরা করি না। ছোট একটা ভুল মানেই লাইফ রিস্ক। …আমার খেলা দেখাবার মোটর সাইকেল আমি কাউকে ছুঁতে দিতাম না। নিজেই চেক করতাম রোজ। কৃষ্ণমূর্তিও তাঁর মোটর বাইক ভাল করে দেখে নেন রোজ। কিন্তু আজকাল আমি মাঝে-মাঝে দেখতাম, আমার বাইকে কেউ লুকিয়ে হাত লাগিয়েছে। এমন একটা গোলমাল করে রেখেছে ভেতরে, যাতে ওই অবস্থায় খেলা দেখাতে গেলে আমি মরব।”
তারাপদ খানিকটা অবাক হয়ে চন্দনকে বলল, “মূর্তি তো পাকা শয়তান। বাইক খারাপ করে রেখে দিতেন।”
অনিল বলল, “এ-সব খেলা অঙ্কের মতন। সব মাপা, হিসেব করা। হাত-পায়ের রিফ্লেক্স, চোখ, মন–সব একই সঙ্গে কাজ করবে। যে-কোনো ছোটখাট ভুল মানেই বিপদ।”
কিকিরা বগলাকে ডেকে চা দিতে বললেন। তারপর অনিলের দিকে তাকালেন। বললেন, “তোমার কখনও অ্যাসিডেন্ট হয়েছে?”
“দু’বার। তবে ছোট অ্যাসিডেন্ট।… এবার একটা বড় অ্যাসিডেন্ট হত। এই কদিন আগেই খেলা দেখাতে যাওয়ার আগে বাইক চেক করতে গিয়ে দেখি, কে যেন আমার বাইকের ব্রেক হালকা করে দিয়েছে! মানে, ঢিলে করে দিয়েছে। সামনের চাকার বাতাস কম। ওই বাইক নিয়ে খেলা দেখাতে যাওয়া মানে মৃত্যু।”
“এটা কবে ঘটেছিল?”
“সার্কাস ছেড়ে পালিয়ে আসার আগের দিন।”
চন্দন আর তারাপদ একই সঙ্গে আঁতকে ওঠার শব্দ করল।
কিকিরা বললেন, “লোকটা দেখছি ভয়ঙ্কর। কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না অনিল, কৃষ্ণমূর্তি এরকম শত্রুতা তোমার সঙ্গে কেন করছিলেন। ওঁর উদ্দেশ্য কী? তোমায় জখম করে, মেরে ফেলে ওঁর কী লাভ? কে কত বড় খেলোয়াড় তা নিয়ে রেষারেষি থাকতে পারে। তা বলে। সেই রেষারেষি এত দূর গড়াতে পারে বলে আমি ভাবতে পারি না।”
অনিল কোনো কথা বলল না। তারাপদ আর চন্দন নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কী যেন বলাবলি করল।
কিকিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অনিলকে বললেন, “অন্য কোন কারণ আছে বলে তোমার মনে হয় না?”
“আমি জানি না।”
“ভাল করে ভেবে বলছ?”
“হ্যাঁ।”
“কৃষ্ণমূর্তি কি পাগল?”
“পাগল বলবেন না, বলুন ক্রিমিন্যাল..” তারাপদ বলল।
অনিল বলল, “একটা কথা স্যার। আমি শুনেছিবছর চারেক আগে জনি নামের এক ট্রাপিজ খেলোয়াড়কে উনি শেষ করে দিগেছিলেন।”
চমক খেলেন যেন কিকিরা। “কেমন করে?”
“শেষ খেলার সময় জনি যখন দুলতে-দুলতে ভল্ট খেয়ে পার্টনারের হাত ধরতে গেছে–পার্টনার তার হাত ছেড়ে দিল। আর জনি পড়ল তো পড়ল–একেবারে জালের ধার ঘেঁষে। জাল থেকে লাফিয়ে নিজেকে সামলাতে পারল না। জালের বাইরে মাটিতে পড়ে গেল।”
চন্দন বলল, “মারা গেল?”
“না, মারা যায়নি। হাত-পা জখম হল। খোঁড়া পা আর ভাঙা হাত নিয়ে ট্রাপিজের খেলা দেখানো যায় না।”
তারাপদ বলল, “লোকটাকে তো পুলিশে দেওয়া উচিত ছিল।”
“কোনো প্রমাণ ছিল না। পুলিশে কেমন করে দেবে!”
কিকিরা বললেন, “এটা তা হলে সার্কাসের লোকের সন্দেহ। …সত্যি কি অন্য খেলোয়াড়টির জনির হাত ধরেনি, বা ছেড়ে দিয়েছিল? ওটা অ্যাসিডেন্টও হতে পারে। ট্রাপিজ খেলায় এরকম হয় বলে শুনেছি। সেইজন্যেই তো নিচে জাল থাকে। … যে-লোকটা হাত ছেড়ে দিয়েছিল সে কি কৃষ্ণমূর্তির শাগরেদ, মানে তাঁর লোক?”
অনিল বলল, “ওরা তো তাই বলে। আমি যা শুনেছি তাই বললাম।”
“দু’জনের মধ্যে শত্রুতা ছিল?”
“জনি কৃষ্ণমূর্তিকে কেয়ার করত না। মাঝে-মাঝে দু’জনের ঝগড়াও হত।”
“জনি এখন কোথায়?”
“সার্কাসে আর সে আসেনি। বছরখানেক বিছানায় পড়ে থাকার পর জনি কী করছে কেউ জানে না। বোধ হয় তার দেশবাড়ির কাছেই আছে কোথাও।”
“কোথাকার লোক সে?”
“ডালটনগঞ্জের।”
কিকিরা অন্যমনস্কভাবে মাথার চুল ঘাঁটতে-ঘাঁটতে কী যেন ভাবছিলেন।
বগলা চা এনে অনিলকে দিল।
তারাপদ আর চন্দন সিগারেট ধরাল। নিচু গলায় কথা বলল।
অনেকক্ষণ পরে কিকিরা বললেন, “আমার কাছে ব্যাপারটা বড় জটিল মনে হচ্ছে, চাঁদুবাবু! কৃষ্ণমূর্তির উদ্দেশ্য কী? কেন তিনি অনিলের সঙ্গে শত্রুতা করবেন? কী লাভ তাঁর! এক যদি তিনি পাগল হন, গোঁয়ার মুখ তবেই বোকার মতন এ-সব কাজ করতে পারেন। এরা দুজনেই সার্কাসে খেলা দেখায়। দুজনেই অবশ্য মোটর বাইক নিয়ে। কিন্তু আলাদা ধরনের খেলা। প্রোফেশন্যাল জেলাসি থাকার কথা কী! কী জানি!.ঠিক আছে, কাল থেকে আমি সার্কাসে ঘুরব। দেখি ব্যাপারটা। তারাবাবু তুমি আমার সঙ্গে যাবে। চাঁদুর এখন যাওয়ার দরকার নেই।”
.
০৫.
সার্কাসের মালিককে দেখলে বাঙালি বলে মনে হয় না। কিন্তু ভদ্রলোক বাঙালি। নাম, কানাইচাঁদ মল্লিক। মল্লিকবাবুর চেহারায় বেনারসি ছাপ আছে। কাশীর পাণ্ডার মতন দেখতে। নধর চেহারা, গোলগাল, মাথায় মাঝারি, চুল কম–টাক বেশি। গায়ের রং অবশ্য অতটা ফরসা নয়। ভদ্রলোক অনবরত কালো কফি খান, আর যখন কফি খান না তখন পান-জরদা। ওঁর একটা মুদ্রাদোষ আছে। দু-চারটে করে কথা বলেন আর মুখের অদ্ভুত এক ভঙ্গি করেন। হাস্যকর ভঙ্গি। গলার স্বর ভাঙা-ভাঙা।
