কিকিরা বললেন, “এ আবার কেমন কথা হে! দোকানের সামনে একটা লোক বসে থাকতেই পারে। হয়ত কোনো কাজ কাচ্ছিল। তুমি তাকে চেনোও না। তা হলে ভয় কিসের?”
প্রায় তোতলানোর মতন করে অনিল বলল, “লোকটাকে গুণ্ডার মতন দেখতে। দেখলে মালম্যান বলে মনে হয়। মাথার চুল ছোট-ছোট করে ছাঁটা। হাতে লোহার বালা। লোকটা বসেবসে গলিতে যারা আসছে-যাচ্ছে। তাদের দেখছিল। আমার মনে হল, সে ওয়াচ করছে।”
“তোমাকে দেখেছে সে?”।
“না। আমি তাকে দেখেছি। ও আমাকে দেখতে পেত। কিন্তু একটা রিকশার আড়াল পড়ে যাওয়ায় সে আমাকে দেখতে পায়নি। ওকে দেখেই আবার আমি বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লাম।”
“তা হলে তুমি কেমন করে বুঝলে লোকটা অনেকক্ষণ ধরে দোকানের সামনে বসে ছিল।”
অনিল থতমত খেয়ে বলল, “আগেও আমি তাকে দেখেছি। বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে। তখন কিছু মনে হয়নি। বেরোবার সময় আবার দেখতে পেয়ে–সন্দেহ হল।”
চন্দন বলল, “তোমাদের নিজের বাড়িতে তুমি থাকো না। লুকিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে থাকছু। তোমার আস্তানা সে জানবে কেমন করে?”
অনিল সেকথার কোনো জবাব দিল না। এমন ভাব করল, যেন সেও জানে না কেমন করে লোকটা এই গলিতে ঢুকে পড়ল।
কিকিরা বললেন, “তুমি তো দেখছি সব ব্যাপারে ভয় পাচ্ছ। একটা লোককে দেখতে ষণ্ডাগুণ্ডার মতন হতেই পারে। সে আর বিচিত্র কী। কলকাতার অলিতে-গলিতে আজকাল গুণ্ডা মাকা লোক দেখা যায়। এরকম কাউকে দেখা গেলেই তোমার মনে হবে লোকটা তোমাকে ওয়াচ করছে-এ আবার কেমন কথা!”
অনিল বলল, “লোকটাকে দেখে আমার ভাল লাগেনি।”
তারাপদ বলল, দোকানে জিজ্ঞেস করেছ, লোকটা কে?”
“না।”
“কেন! তাতেও ভয়!” তারাপদ ঠাট্টা করে বলল।
অনিল অস্বস্তি বোধ করছিল। কিকিরা কথা ঘুরিয়ে নিলেন। নিয়ে সার্কাসের চাকরি কাজকর্ম নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন অনিলের সঙ্গে। তারাপদরা বসে বসে শুনছিল।
কিকিরা গোড়ার দিকে এমন সব কথা বলছিলেন যা খানিকটা মামুলি। সার্কাসের খেলা, খেলোয়াড়, থাকা-খাওয়া, মোটামুটি আয়, বছরে ক মাস সাকার্স চলে, ক’ মাস বসে থাকতে হয়, ইত্যাদি।
কথাগুলো যেন গল্পগাছার মতন বলতে বলতে একসময় হঠাৎ কিকিরা অন্য কথায় এসে গেলেন। অনিলকে বললেন, “কৃষ্ণমূর্তি তোমাকে শাসিয়ে যে কাগজগুলো রেখে যেতেন, তার দু-একটা তোমার কাছে আছে?
মাথা নাড়ল অনিল। না।
“একটাও রাখোনি?”
“না।”
“কথাটা অন্য কাউকে বলেছিলে? দেখিয়েছিলে কাগজ?”
“না।”
“কেন?”
“আমার ভয় করত।”
কিকিরা অনিলকে দেখতে-দেখতে বললেন, “তুমি সার্কাসের খেলোয়াড়। খেলা যা দেখাও তাতেও ভীষণ সাহস দরকার হয়। আর সামান্য ব্যাপারে তোমার সাহস হল না? কী করত তোমার কৃষ্ণমূর্তি, সার্কাসের মধ্যে খুন করতেন?”
অনিল সামান্য চুপ করে থেকে বলল, “আমার সাহস হয়নি। কৃষ্ণমূর্তি বড় ডেঞ্জারাস লোক। আপনারা জানেন না। তিনি সবই পারেন।
“কী পারেন?” কিকিরা বললেন। “তুমি দু বছর সার্কাসে খেলা দেখাচ্ছ বলছ। এই দু বছরে তিনি এমন কোন কাজ কি করেছেন যা দেখে তোমার ভয় হগেছে? তিনি কি কাউকে খুন করেছেন?”
“খু-ন! না।”
“তবে?”
অনিল ইতস্তত করে বলল, “খুন না করুন, মারধোর করতে গিয়েছেন, খারাপ ব্যবহার করেছেন। অপমানও করেছেন। দু-একজনকে তাড়িয়েও দিয়েছেন। ওঁর অনেক ক্ষমতা। মালিকের ডান হাত।”
কিকিরা মাথার চুল ঘাঁটতে-ঘাঁটতে তারাপদদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর আবার অনিলের দিকে তাকালেন। বললেন, “তুমি কি মনে করো প্রফেশন্যাল জেলাসির জন্যে কৃষ্ণমূর্তি তোমার শত্রু হয়ে উঠেছিলেন।”
অনিল কোনো জবাব দিল না কথার।
অপেক্ষা করে কিকিরা বললেন, “তুমি সার্কাসে যে-টাকা পাও মাইনে হিসেবে কৃষ্ণমূর্তি নিশ্চয় তার বেশি পান?”
“অনেক বেশি।”
“কৃষ্ণমূর্তির খেলা আমরা দেখেছি। খেলাটা বেশ ভাল দেখান। লোকে পছন্দও করে। দেদার হাততালি শায়। তবু তিনি কেন তোমার খেলাটাকে নিয়ে অত মাথা ঘামাতে যাবেন?”
অনিল চুপ করে থাকল।
চন্দন বলল, “বোধ হয় নতুন খেলা বলে।”
কিকিরা কান দিলেন না কথাটায়। অনিলকেই বললেন, “তুমি কি মনে কর, খেলা ছাড়াও অন্য কোনো কারণ আছে শত্রুতার। মানে, এমন কোনো কারণ আছে যাতে কৃষ্ণমূর্তি তোমার শত্রুতা করবেন?”
অনিল খানিকটা থতমত খেয়ে গেল। পরে বলল, “জানি না। আর কী কারণ থাকবে?”
“ভাল করে ভেবে দেখেছ অন্য কোনো কারণ নেই।”
মুখ নিচু করে মাথা নাড়ল অনিল।
কিকিরা নিজের জামার পকেট হাতড়াতে-হাতড়াতে হঠাৎ বললেন, “তোমাদের সার্কাসের দলে তোমার কোনো বন্ধু নেই?”
“আছে।”
“কে-কে? নাম বলো।”
অনিল বলল, “হরিশবাবু ভালমানুষ। নাইডু বলে একজন আছে–সাইকেলের খেলা দেখায় তার সঙ্গেও আমার ভাব। ট্রাপিজের রমাকান্ত, সেও ভাল। আরও দু-একজন আছে।”
“কারও কাছে তুমি কৃষ্ণমূর্তির কথা বলোনি?”
“স্পষ্ট করে বলিনি।”
“কী বলেছ তবে?”
“ওই–ওই ওঁর মেজাজের কথা, খারাপ ব্যবহারের কথা। আমায় পছন্দ করেন না–এ-সমস্ত কথা বলেছি।”
“তা তারা কী বলেছে?”
“কী বলবে! ওঁকে তো সবাই চেনে। বলেছে–ওঁকে এড়িয়ে থাকতে।”
“তুমি তাই থাকতে বোধ হয়।”
“আর কী করব।”
“সার্কাসে কৃষ্ণমূর্তির দলের লোক আছে? মানে ওঁর সঙ্গে ঘোরে-ফেরে?”
“আছে। রামু, সদাশিব, কাপুর, আরও দু-একজন। এর মধ্যে রামু হল কৃষ্ণমূর্তির ডান হাত। রামু জিমনাস্টিকের খেলা দেখায়, লিলি বলে একটা মেয়ের সঙ্গে ভল্ট-এর খেলাও দেখায়। সদাশিব ট্রাপিজের দলে আছে। কাপুর হল সার্কাসের সবচেয়ে ভাল জোকার। খেলাও জানে।”
